ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০

গুরু বলেছিল তার তিনবার মৃত্যু হবে, আর তিনবারেই তিনি আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বলে জীবিত হয়ে ফিরে আসবেন

মমি বানিয়ে উচহ্লাভান্তের দেহ সংরক্ষণে  আগ্রহী শিষ্য ও পরিবারের সদস্যরা

বিভাগ : এক্সক্লুসিভ প্রকাশের সময় :৩০ এপ্রিল, ২০২০ ৪:২৪ : অপরাহ্ণ

জহির রায়হান, বান্দরবান:
গুরুর শিখিয়ে যাওয়া বিদ্যা পিছু ছাড়ছে না  উচহ্লা ভান্তের  শিষ্য ও পরিবারের সদস্যদের। মৃত নাকি জীবিত, মারা গেলেও আবার পুনর্জীবিত হয়ে ফিরে আসবে আমাদের মাঝে, চারদিন ধরে সে ভাবনায় মগ্ন থাকতে থাকতে পচন ধরে ভান্তের দেহে। বিষটি ধামাচাপা দিতে তড়িগড়ি করে দেহে সরিয়ে নিতে হয়  রাউজানের খৈয়াখালিতে ঘনিষ্ঠ  ভান্তের  শিষ্যের বিহারে। সেখানেও চলে গুরুকে মৃত থেকে জীবিত করে ফিরিয়ে আনার তান্ত্রিকতার চেষ্টা। সে চেষ্টা এখনো অব্যাহত আছে বলে বিভিন্ন সূত্র নিশ্চিত করেছে। গুরু বলেছিল তার তিনবার মৃত্যু হবে, আর তিনবারেই তিনি আধ্যাত্মিক ক্ষমতা বলে জীবিত হয়ে ফিরে আসবেন।
ভান্তে জীাবত কালে শিষ্যদের মাঝে এমন ধারনার জন্মদেন, বাল্যকাল থেকে যুবককাল পর্যন্ত দুইবার মারা যাওয়ার পর পুনর্জীবিত হয়ে ফিরে এসেছিলেন তিনি। নিজেকে তিনি হিন্দু ধর্মাবলম্বীদের ভগবান রামের ছোটভাই লক্ষণ পরিচয়ও দিতেন।
 ৩১বছর ধরে উচহ্লাভান্তে এই অপপ্রচার চালিয়ে শিষ্য ও পরিবারের লোকজনের মগজ ধোলাই এমনিভাবেই করেছিলো। সে অপপ্রচার এখনো তাদের মগজে  গেঁথে আছে । যখন মনে হলো গুরুকে জীবিত করে তোলার চেষ্টা তারা ব্যর্থ হতে চলেছে। ঠিক তখনই তান্ত্রিক শিষ্য ও পরিবারের সদস্যরা গুরুর মৃতদেহ মমির বানিয়ে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের মাধ্যমে দীর্ঘমেয়াদি ধান্ধাবাজীর পথ তৈরি চেষ্টায় লিপ্ত রয়েছে বলে তথ্য পাওয়া গেছে।
কিন্তু তাদের সে তান্ত্রিক কর্মকান্ড ও চিন্তার বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় বাধা হয়ে দাঁড়িয়েছে বৌদ্ধ সমাজ ও পার্বত্য জেলা পরিষদ। এঘটনায় ক্ষুব্ধ শিষ্য ও পরিবার।
সংশ্লিষ্ট সুত্রগুলো জানান, মৃত্যু নিয়ে তান্ত্রিকতা শেষ হতে না’হতেই, এবার মরদেহ নিয়েও তান্ত্রিকতার ধান্ধাবাজীর অভিনব কৌশল নিয়েছে  উচহ্লাভান্তের তান্ত্রিক শিষ্য ও পরিবারের সদস্যরা।
রাজগুরু বিহার (খিয়ংওয়াক্যং) পরিচালনা কমিটির সভাপতি থোয়াইংচপ্রু মাস্টার বলেন, ভান্তের মরদেহ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের বিষয়ে ধর্মীয়ভাবে গ্রহণযোগ্য কিনা, আমি পুরোপুরি অবগত না।
স্থানীয় একাধিক ব্যক্তির সাথে আলাপ করে জানা যায়, শিষ্য ও পরিবার ভাবছে উচহ্লাভান্তের মরদেহ মমি বানিয়ে স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করা গেলে, সারাবছরই শিষ্য-ভক্ত-অনুরাগীরা পূজা দিবত আসবে এবং যে যার সাধ্যমত টাকাপয়সা, স্বর্ণ-অলংকারসহ নানা মূল্যবান দ্রব্যাদি দান করবেন। সারা বছরেই মোটা অংকের আয়ের সুযোগ সৃষ্টি হবে। সেই লোভলালসা কতিপয় শিষ্য ও পরিবারে সদস্যদের মধ্যে জেঁকে বসেছে।
আর সে আশা-আঙ্খাংকায় চট্টগ্রাম ম্যাক্স হাসপাতাল থেকে মরদেহ বান্দরবান না’এনে রাউজানের খৈয়াখালিতে নিয়ে রাখা হয়েছে। কিন্তু এতে পার্বত্য জেলা পরিষদ, বৌদ্ধ সমাজ ও বৌদ্ধ ভিক্ষুদের সম্মতি না’থাকায় বিপাকে পড়ে গেছে শিষ্য ও পরিবারের সদস্যরা। এঘটনায় ক্ষোভ ও অসন্তোষও প্রকাশ করেছে কতিপয় শিষ্য ও পরিবার।
কুহালং ভাঙ্গামুড়া বৌদ্ধবিহার বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত ঞানা মহাথের বলেন, প্রয়াত ভান্তের মরদেহকে অগণিত ভক্তদের পূজা-দর্শনের জন্য স্থায়ীভাবে সংরক্ষণের চিন্তাটি অপরিপক্ক চেতনাপ্রসূত । তিনি বলেন, মরদেহকে ওষুদ দিয়ে সংরক্ষণ করে রাখা যায়। কিন্তু কিছুকাল অতিবাহিত হওয়ার পর এর বিকৃতি ঘটতে থাকবে। যা শোভনীয় নয়।
বাঘমারা বৌদ্ধ বিহার বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত উ সা:মা মহাথের বলেন, বার্মায় প্রয়াত ভান্তের মরদেহ স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করলেও যা ধর্মীয় রীতি বহির্ভূত।
বৌদ্ধ ভিক্ষুরা ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, বৌদ্ধ ভিক্ষুগণ ২২৭টি বিনয় শিক্ষাপদ পালনসহ সর্বদায় ত্রিশরণ গ্রহণে থাকেন। উচহ্লাভান্তের প্রয়াণের পর ধর্মীয় রীতি পালন ব্যতিত আধ্যাত্মিক কারণ দেখিয়ে মরদেহকে অন্যত্র সরিয়ে রাখা এবং আধ্যাত্মিক আচার পালন সম্পন্ন না হওয়া পর্যন্ত নিজ বিহারে না’আনার বিষয়টি ধর্মীয় রীতির পরিপন্থী। প্রয়াতের পরিবার ও কতিপয় শিষ্যের এধরণের কার্যকলাপে বৌদ্ধ সমাজ ব্যথিত।
এদিকে জানা গেছে, উচহ্লাভান্তে মরদেহ খৈয়াখালি থেকে বান্দরবানে আনা, সামিয়ক সংরক্ষণ ও অন্ত্যোষ্টিক্রিয়ার  বিষয়ে ১৯এপ্রিল পার্বত্য জেলা পরিষদে একজরুরী বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। উক্ত বৈঠকে উপস্থিত সকলেই উদ্দেশ্যে ঘনিষ্ঠ শিষ্য ও রাজগুরু বিহার (খিয়ংওয়াক্যং) পরিচালনা কমিটির সাধারণ সম্পাদক বাচমং মারমা জানান, পরিবার পরিজন ও শিষ্যবৃন্দ উচহ্লাভান্তে মরদেহকে ঔষধপত্র দিয়ে স্থায়ীভাবে রামজাদিতে সংরক্ষণ করে রাখতে চান।
বৈঠকে উপস্থিত তুখ্যংপাড়া বিহারাধ্যক্ষ ভদন্ত ওয়া সাওয়া, বিমুক্তিসূখ বিহারাধ্যক্ষ সুন্দরান্দ ভিক্ষু, ওয়াব্রাইংপাড়া বিহারাধ্যক্ষ ইন্দাশ্রী ভিক্ষু ও পার্বত্য ভিক্ষু পরিষদের সাধারণ সম্পাদক ভদন্ত তেজপ্রিয় থেরসহ ভিক্ষুরা বলেন, বার্মায় গঁইংপঞঞাঁ (তান্ত্রিক শিক্ষা) দীক্ষাধারী ভিক্ষুদের মধ্যে প্রয়াতের মরদেহ সংরক্ষণ করে রাখতে দেখা গেছে। বুদ্ধের প্রকৃত নীতিতে অবিচল থাকা কোন ভিক্ষুর মরদেহকে বার্মায় স্থায়ীভাবে সংরক্ষণ করে রাখা হয়নি। জেনেশুনে বৌদ্ধ রীতি বিকৃতি না করতে তারা জোরালোভাবে আহবান জানান তিনি ।
এবিষয়ে বৈঠকে সভাপতি ও পার্বত্য জেলা পরিষদ চেয়ারম্যান ক্য শৈ হ্লা বলেন, আমি যতদূর জানি বার্মা ও কোন কোন দেশে কিছুৃ কিছু ভিক্ষু তান্ত্রিক বিদ্যা চর্চা করেন। তাদের শিষ্যরা গুরুকে মমি করে রাখে। সেটা বৌদ্ধ রীতি অনুযায়ী সঠিক নয়। প্রয়াতের ভান্তের পরিবার, কতিপয় শিষ্য ও সংশ্লিষ্টদের প্রচলিত বৌদ্ধ ধর্মীয় রীতি বিরোধী বাস্তববিবর্জিত কার্যকলাপে পরিষদ বিব্রত বোধ করছে। তিনি আরো বলেন, প্রয়াত ভান্তের পুন:জাগরণ (আবারো জীবিত) হয়ে উঠবে বিষয়ে নানা বিভ্রান্তিমূলক কথাবার্তা ছড়ানো হয়েছে। যা অত্যন্ত দু:খজনক।
উল্লেখ্য-৯এপ্রিল বৃহস্পতিবার দিবাগত রাতেই বান্দরবান উজানীপাড়াস্থ পিত্রালয়ে তান্ত্রিকতার কাজের জন্য তৈরিকৃত বিহারে উচহ্লাভান্তে মারা যায়। কিন্তু কতিপয় শিষ্য ও পরিবারের সদস্যরা শুক্রবার চট্টগ্রামের ম্যাক্স হাসপাতালে নিয়ে যান এবং কথিত লাইফ সাপোর্টে রাখা হয়। প্রয়াত ভান্তের পুনজীবিত হওয়ার আশায় মগ্ন থাকেন শিষ্য ও পরিবারের সদস্যরা। ১৩এপ্রিল মরদেহে পচন ধরলে বাধ্য হয়ে তাকে মৃত ঘোষনা করে অজ্ঞাত কারণে বান্দরবান না’এনে রাউজান খৈয়াখালিস্থ বৌদ্ধ বিহারের মরদেহ রাখা হয়। আগামী ৫ম পর্বে পড়ুন-উচহ্লাভান্তে কর্তৃক রাজগুরু বিহার দখলের কাহিনী। 

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা