ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২৬ নভেম্বর ২০২০

উঃ আগাদামা ভান্তেকে অপসারণের পর 

রাজগুরু বৌদ্ধ বিহারে বিহারাধ্যক্ষ পদ  জোর-জবরদস্তি দখল করেছিলেন উচহ্লাভান্তে

বিভাগ : এক্সক্লুসিভ প্রকাশের সময় :২ মে, ২০২০ ৩:০০ : পূর্বাহ্ণ

ধারাবাহিক প্রতিবেদন-৫  

জহির রায়হান, বান্দরবান:
উচহ্লা ভান্তের কর্তৃক অন্যে ভূমি জবর-দখল কাহিনী কমবেশি সবাই অবগত। মৃত্যুর পর এবার তার বিরুদ্ধে জোর জবরদস্তি রাজগুরু বিহার (খিয়ংওয়াক্যং) বিহারাধ্যক্ষ পদ দখলের বিষয়টি প্রকাশ্যে এলো ।
মারমা ও বড়ুয়া সম্প্রদায়ের একাধিকজন জানান, বিভিন্ন পত্রপত্রিকায় সংবাদ প্রকাশের পর যখন উচহ্লাভান্তের তন্ত্র, মন্ত্রের ব্যবসা হুমকির মুখে পড়ে। তখন তিনি শহরের বৌদ্ধধর্মালম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় প্রতিষ্ঠান রাজগুরু বিহার (খিয়ংওয়াক্যং)কে হাতিয়ার হিসেবে বেছে নেন। ১৯৯৯ সালের ১৩ই জানুয়ারী নিজস্ব শিষ্য-ভক্তদের নিয়ে জেলা পরিষদের সাবেক চেয়ারম্যান থোয়াইংচপ্রু মাস্টার গংদের সহযোগিতায় সন্ত্রাসী কায়দায় রাজগুরু বিহার থেকে বিহারাধ্যক্ষ  উঃ আগাদামা ভান্তেকে অপসারণ করে। এরপরেই উচহ্লাভান্তে জোর জবরদস্তি করে রাজগুরু বিহারের বিহারাধ্যক্ষের আসনে বসেছিল। শুধু তাই নয়, তিনি ঐসময় এঘটনার প্রতিবাদ করায়  অনেক শ্রদ্ধেয় ভিক্ষুর বিরুদ্ধে নানা অপবাদ ও অপপ্রচারে লিপ্ত ছিলেন
 মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি  অন্য ভিক্ষুদের বিরুদ্ধে নানান অপপ্রচার চালিয়ে গেছেন। এছাড়াও তিনি বোমাং রাজাকে বটবৃক্ষমূলে চন্দন জল সিঞ্চিত অনুষ্ঠান থেকে বিতারিত করেন এবং করেছিলেন অপমানও। তখন থেকেই রাজ পরিবারের পাশাপাশি বৌদ্ধ সমাজেও বিভেদ শুরু হয় বলে জানান রাজ পরিবারের সদস্যরা। এঘটনায় বান্দরবানের বড় দুইটি বিহারের মধ্যেও ফাটল সৃষ্টি হয়।
এব্যাপারে (২৬এপ্রিল) রবিবার রাজগুরু বিহার (খিয়ংওয়াক্যং) পরিচালনা কমিটির সভাপতি থোয়াইংচপ্রু মাস্টার সাথে মুঠোফোনে আলাপকালে জোর-জবরদস্তি কথাটি  এড়িয়ে গেলেও তিনি জানান, ১৯৯৯সালে উঃ আগাদামা ভান্তে স্ব-ইচ্ছায় চলে গেছেন। এরপর থেকে উচহ্লাভান্তে বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে দায়িত্ব পালন করে আসছিল।
সংশ্লিষ্টরা জানান, রাজগুরু বিহার বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে উচহ্লাভান্তে দীর্ঘ ২১বছর দায়িত্ব পালন করলেও শুধুমাত্র ১বার উক্ত বিহারে ওয়া বর্ষাবাস পালন করেন তিনি। বিষয়টি স্বীকার করেছেন সভাপতি থোয়াইংচপ্রু মাস্টার।
এব্যাপারে নাম প্রকাশের অনিচ্ছুক বোমাং রাজ পরিবারের এক সদস্য জানান, উচহ্লাভান্তেকে রাজগুরু বিহারের বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে নিয়োগ দেয়া হয়েছিল এমন কোন কাগজপত্র বা রাজার ঘোষনাপত্র তিনি দেখাতে পারেননি। তিনি ক্ষমতার অপব্যবহার করে অবৈধভাবে বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত দায়িত্বে ছিলেন। একারণে বিগত ২১বছর রাজ পরিবারের অধিকাংশ সদস্য ঐ বিহারের প্রার্থনাও করতে যায়নি।
বোমাং রাজ পরিবারের একাধিক সদস্যের সাথে আলাপ করে জানা যায়, খিয়ংওয়াক্যং (রাজগুরু বিহার)টি ১৩তম বোমাং রাজার হাতে তৈরি। রাজাই বিহারে বিহারাধ্যক্ষকে নিযুক্ত করা নিয়ম রয়েছে। সে নিয়ম মানা হয়নি এবং এখনো তা মানা হচ্ছে না। তারা আরো বলেন, উজানীপাড়া বৌদ্ধ বিহারের বিহারাধ্যক্ষকে ১৭তম বোমাং রাজা নিযুক্ত করেছেন। সে ঘোষনাপত্রে লেখা রয়েছে-“আমি ১৭তম বোমাং রাজা উচপ্রু চৌধুরী ঐব্যক্তিকে অদ্য বিহারের আমরণ বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে নিযুক্ত করিলাম”। এছাড়াও ঐসব ঘোষনাপত্রে রাজ পরিবারে সিনিয়র ৯জন সদস্যের স্বাক্ষর যুক্ত থাকার নিয়ম রয়েছে বলেও তারা জানিয়েছেন।
তবে এব্যাপারে ১৪তম বোমাং রাজা মংশৈপ্রু’র পুত্র হেডম্যান নুমংপ্রু রাজগুরু বিহারের বিহারাধ্যক্ষ আগাদামা ভান্তেকে অপসারণ বিষয়টি সরাসরি স্বীকার না’করলেও তিনি  শুনালেন ভিন্ন কথা । তিনি জানালেন, পরবর্তীতে বোমাং রাণী মৌখিকভাবে উচহ্লাভান্তেকে বিহারাধ্যক্ষ হিসেবে স্বীকৃতি দিয়েছিলেন।
তবে যে  শর্তে রাণী তাকে স্বীকৃতি দিয়েছেন, সে শর্তও নাকি উচহ্লাভান্তে রক্ষা করেনি। এতে পরে রাণী ক্ষুব্ধও হয়েছিল বলে জানালেন রাজ পরিবারের দুয়েকজন সদস্য।
স্থানীয়দের অভিযোগ উচহ্লা ভান্তে অন্য বৌদ্ধভিক্ষুদের সুনাম-সুখ্যাতি সহ্য করতে পারতেন না। তিনি অসংখ্য ভিক্ষুকে অপমান, অপদস্ত ও মানহানি মত ঘটনা ঘটিয়ে ছিল। একই কথা জানালেন বৌদ্ধ ধর্মাবলম্বী কয়েকজন সংবাদকর্মীরাও।
এর উদাহরণ পাওয়া যায় বৌদ্ধধর্মীয় পেজ অতীশ দীপষ্কর নামে লেখকের পেজে করা কিছু মন্তব্য থেকে। তিনি বলেন, উচহ্লা ভান্তে কখনও অন্যের প্রভাব-প্রতিপ্রত্তি, মান-সম্মান, সুনাম-সুখ্যাতি সহ্য করতে পারতেন না, এটি আসলে সত্যি। অন্যেকে হেয়প্রতিপন্ন করতে বিন্দুমাত্র দ্বিধা করতেন না তিনি।
অতীশ দীপষ্কর ওয়েবপেজে বৌদ্ধভিক্ষু তিনিও সিংহাক্রান্ত উচহ্লাভান্তের একটি ঘটনার উদাহরণ দিয়ে লিখেন, ২০০৪ সালে বুদ্ধগয়া আন্তর্জাতিক সাধনা কেন্দ্রে গিয়ে শ্রদ্ধেয় ড. রাষ্ট্রপাল মহাথেরকে বন্দনা করে উচহ্লাভান্তে বলেছিলেন, আপনি বার বেশী না তের বেশী বইটি লিখে সমাজের চোখ খুলে দিয়েছে। ভন্ড বনভিক্ষুকে সমাজের সামনে উন্মোচন করে দিয়েছেন। এসময় উচহ্লা ভান্তে আবদার করেন, বনভিক্ষুর বিরুদ্ধে আরো একটি বই লিখতে। তার কাছে বনভিক্ষুর বিরুদ্ধে আরো অনেক ভন্ডামির দলিল আছে। কিন্তু শ্রদ্ধেয় ড. রাষ্ট্রপাল মহাথের রাজি না’হওয়াতে তিনি (উচহ্লাভান্তে) নিরাশ হয়ে ফিরে আসেন।
আগামী ৬ষ্ঠ পর্বে পড়ুন-রাজগুরু বিহারের প্রাচীনতম গুনসম্পন্ন বুদ্ধমর্তি ও স্বর্ণ-রৌপ্য গায়েবের কাহিনী। 

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা