এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, বৃহস্পতিবার, ২২ অক্টোবর ২০২০

শিরোনাম

  •              

প্রকৃতি কণ্যা সিলেট

নয়নাভিরাম রাতারগুল

বিভাগ : কলাম প্রকাশের সময় :২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২০ ২:০২ : অপরাহ্ণ

মিলু কাশেম
অপরূপ প্রকৃতিক সৌন্দর্যের লীলাভূমি আমাদের বাংলাদেশ। নদ নদী পাহাড় পর্বত হাওর বাওর সমুদ্র সৈকত প্রবাল দ্বিপ ম্যানগ্রোভ বন জলজ বন চা বাগানসহ পর্যটনের নানা উপাদানে সজ্জিত এই দেশ।

বাংলাদেশের সিলেট অঞ্চল পর্যটকদের জন্য এক আকর্ষণীয় স্থান। সিলেটকে বলা হয় দুটি পাতা একটি কুঁড়ির দেশ। সিলেটের পাহাড় টিলা বিস্তীর্ণ সমতল ভূমিতে ছড়িয়ে অসংখ্য চা বাগান।

এছাড়া ছোট বড় পাহাড় টিলা হাওর নদী বনাঞ্চল জলজ বন প্রাকৃতিক ঝর্ণা’র অপরূপ সমারোহ নিয়ে পর্যটকদের হাতছানি দেয় সিলেট।

বাংলাদেশের উত্তর পূর্ব প্রান্তে ভারতের খাসিয়া জয়ন্তিয়া পাহাড়ের পাদদেশে সিলেটের অবস্থান। নৈসর্গিক সৌন্দর্যে ভরপুর সিলেটের পর্যটন। প্রকৃতিক সৌন্দর্য্য ছাড়াও সিলেট ভ্রমনকারীদের অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ওলীকুল শিরোমনি হযরত শাহ জালাল ও হযরত শাহ পরাণের মাজার। প্রতিদিন দেশ বিদেশ থেকে অগণিত মানুষ মাজার জিয়ারতে আসেন সিলেট। বোনাস হিসাবে উপভোগ করে যান সিলেটের অপার প্রাকৃতিক সৌন্দর্য।
সিলেট শহরের উত্তর প্রান্তে রয়েছে ভারত উপমহাদেশের সর্ব প্রথম ও সর্ববৃহৎ চা বাগান মালনীছড়া চা বাগান।

সিলেটে আসা পর্যটকদের মন জুড়ায় অপরূপ সৌন্দর্যের লীলাভূমি জাফলং, জল পাথর আর দিগন্ত ছোঁয়া সবুজ পাহাড়ের বিছনাকান্দি, বাংলাদেশের সুন্দর গ্রাম পানতুমাই, নীলনদ খ্যাত পান্না সবুজ জলের লালাখাল, পৃথিবীর সর্বাধিক বৃষ্টিপাত অঞ্চল চেরাপুঞ্জি পাহাড়ের পাদদেশের অপার সৌন্দর্যের রাণী ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, রূপসী লোভাছড়া, দেশের বৃহত্তম হাওর হাকালুকি আর দেশের একমাত্র মিঠা পানির জলজবন বা সোয়াম ফরেস্ট রাতারগুল।

গত কয়েক বছরে এই রাতারগুল জলজবন পরিণত হয়েছে সিলেট তথা দেশের অন্যতম সেরা পর্যটন আকর্ষণে।

রাতারগুলের অবস্থান সিলেট শহর থেকে উত্তর পূর্ব দিকে ২৬ কিলোমিটার দূরে সিলেট জেলার গোয়াইনঘাট থানার ফতেহপুর ইউনিয়নে। বিশ্বের কয়েকটির মধ্যে অন্যতম এবং বাংলাদেশের একমাত্র সোয়াম ফরেস্ট বা মিঠাপানির জলজবন এবং বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য এই রাতারগুল। জলজবন মানে জলে ডুবে থাকা বন।

এখানে হাজার হাজার বিভিন্ন প্রজাতির গাছ এবং উদ্ভিদ জাতিয় বন সারা বছর পানিতে ডুবে থাকে। আর এই গাছের ছায়ায় ফাঁকে ফাঁকে পর্যটকরা নৌকা দিয়ে ঘুরে অবলোকন করেন জলজবনের অপার সৌন্দর্য।

রাতারগুল সোয়াম ফরেস্টের আয়তন প্রায় ৩৩ হাজার ৪ শ’ একর। এর মধ্যে প্রায় ৫০৫ একর বনকে ১৯৭৩ সালে বন্য প্রাণীর অভয়ারণ্য হিসাবে ঘোষণা করা হয়। এছাড়া প্রায় ২০৫ হেক্টর বনভূমিকে ২০১৫ সালে বাংলাদেশ বন বিভাগ জীব বৈচিত্র্য সংরক্ষণ এলাকা
ঘোষণা করে।

চির সবুজ এই বন গোয়াইন নদীর দক্ষিণ তীরে অবস্থিত। এই বনে বেশি জন্মায় করচ গাছ। বর্ষাকালে এই বন ২৫-৩০ ফুট পানির নীচে নিমজ্জিত থাকে। বাকি সারা বছর পানির উচ্চতা প্রায় ১০ ফুট থাকে। বর্ষাকালে রাতারগুল জলজবনে অথৈ পানিতে ডুবে থাকে প্রায় ৪ মাস। আর বর্ষাকাল হচ্ছে এই বনের সৌন্দর্য উপভোগের প্রকৃত সময়। তাই রাতারগুল প্রকৃতি প্রেমীদের কাছে অত্যন্ত পরিচিত প্রিয় নাম। প্রতিদিন দেশিবিদেশি পর্যটকরা ছুটে আসেন এই জলজবনের প্রাকৃতিক সৌন্দর্য উপভোগ করতে।

রাতারগুল জলজবনে বিভিন্ন প্রজাতির গাছের পাশাপাশি রয়েছে রয়েছে সিলেটের স্থানীয় ভাষায় রাতা গাছ নামে পরিচিত মুর্তা বা পাটি গাছের অরণ্য । জানা গেছে সেই রাতা গাছের নামানুসারে মূলত এই বনের নাম রাতারগুল।

সিলেটের উত্তর পূর্ব দিকে পৃথিবীর সর্বাপেক্ষা বৃষ্টিপাত অঞ্চল ভারতের মেঘালয়ের চেরাপুঞ্জির সন্নিকটে অবস্থিত ক্রান্তীয় জলবায়ুর এই বনে প্রতিবছর ভারী বৃষ্টিপাত হয়ে থাকে। সিলেট আবহাওয়া অফিসের তথ্যমতে রাতারগুলে বার্ষিক গড় বৃষ্টিপাতের পরিমাণ
৪১৬২ মিলিমিটার। জুলাই মাস সবচেয়ে আর্দ্র তখন বৃষ্টিপাতের পরিমাণ ১২৫০ মিলিমিটার।

এই মিঠা পানির জলজবনে উদ্ভিদের দুইটি স্থর পরিলক্ষিত হয়। উপরে বৃক্ষ জাতীয় আর নীচে ঘন পাটি পাতা বা মুর্তা বনের আধিক্য বিদ্যমান।

রাতারগুল জলজবনের প্রায় ৮০ শতাংশ এলাকা উদ্ভিদের আচ্ছাদনে আবৃত। এখন পর্যন্ত এই বনে ৭০ প্রজাতির উদ্ভিদের সন্ধান পাওয়া গেছে। রাতারগুল মূলত প্রাকৃতিক বন। জলমগ্ন এই জলে আছে করচ ছাড়াও কদম হিজল বরুন গড়াই গাছ সহ বেত মুর্তা নানা প্রজাতির জল সহিষ্ণু গাছ। জলমগ্ন এই বনে সাপের আবাস বেশি আছে জোকও। তাছড়া নানা প্রজাতির বন্য প্রাণীর আবাস রয়েছে এই বনে।

নৌকা দিয়ে বনের ভেতর ঘুরতে ঘুরতে এসব প্রাণী নজর কাড়ে পর্যটকদের। রাতারগুল জলজবনের দক্ষিণ পাশে রয়েছে শিমুল বিল ও নেওয়া বিল নামে ২টি হাওর। নানা প্রজাতির মাছও মিলে এই এলাকায়। শীতকালে দেশিবিদেশি পরিযায়ী পাখির অভয়ারণ্যে পরিণত হয় রাতারগুল।

বর্ষাকালে রাতারগুলের সৌন্দর্য অপরূপ হলেও সারা বছরই পর্যটকদের ভীড় লেগে থাকে রাতারগুলে। পুরো জলজবন এলাকা এক পলকে দেখে নিতে বন বিভাগের জাতীয় উদ্যান পরিকল্পনার আওতায় গত কয়েক বছর আগে একটি সুউচ্চ টাওয়ার নির্মাণ করা হয়। পরিবেশবাদী সংগঠনগুলোর আপত্তির মুখে তখন কিছুদিন বন্ধ রাখা হলেও পরে এই টাওয়ারের নির্মাণ কাজ শেষ করে দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত করে দেয়া হয় টাওয়ারটি। বনে আগত পর্যটকরা এই টাওয়ারে উঠে অবলোকন করেন রাতারগুল জলজবনের সৌন্দর্য।

বর্ষাকালে নির্দিষ্ট ঘাট থেকে শত শত নৌকা নিয়ে রাতারগুল জলজবনে ঘুরতে আসেন পর্যটকরা। বনে প্রবেশ করলেই চোখে পড়ে সুউচ্চ টাওয়ার। তাই এক নজর পুরো বন দেখতে সবাই টাওয়ারে উঠেন। বর্ষাকালে ২০-২৫ ফুট পানিতে অবস্থিত টাওয়ারটিতে এক সাথে শত শত দর্শনার্থীদের উঠানামায় নড়ে উঠে এই টাওয়ার। তাই বর্তমানে টাওয়ারটি বিপদজনক হয়ে পড়েছে। তবুও ও ঝুকি নিয়ে প্রতিদিন শতশত পর্যটক টাওয়ারে উঠে ছবি তোলা ও আড্ডায় মেতে উঠেন। সার্বিক নিরাপত্তার কারণে বন বিভাগ আপাতত টাওয়ারের উপরে উঠে রাতারগুলের সৌন্দর্য উপভোগ করা পর্যটকদের জন্য নিষিদ্ধ করেছেন।

প্রাকৃতিক সৌন্দর্যময় এই জলজবনের সৌন্দর্য ওয়াচ টাওয়ার থেকে দেখা ও বনদস্যুদের অপতৎপরতা ঠেকাতে ২০১৫ সালে বন বিভাগ এই টাওয়ার নির্মাণ করেছিল।

রাতারগুল জলজবনকে কেন্দ্র করে আশেপাশে তৈরী হয়েছে বেশ কয়েকটি অবকাশ যাপন কেন্দ্র। সিলেট শহর থেকে খুব সহজেই যাতায়াত করা যায়। শহরতলির ধূপাগুল এলাকায় কিছু জায়গা ছাড়া রাতারগুল তিন নাম্বার ঘাট পর্যন্ত রাস্তা ভাল। সিলেট শহর থেকে এক ঘন্টার মধ্যেই পৌছা যায় ঘাটে। সিএনজি অটো রিক্সা কার মাইক্রোবাস নিয় সহজেই
যাওয়া যায় রাতারগুলে। পর্যটকদের জন্য চা নাস্তাসহ মোটামুটি খাওয়া দাওয়ার ব্যবস্থা রয়েছে ঘাট এলাকায়। ঘাট থেকে খোলা নৌকা নিয়ে যেতে হয় মূল জলজবন এলাকায়। নৌকা ভাড়া উপজেলা প্রশাসন কর্তৃক নির্ধারিত ৭৫০ টাকা। প্রতি নৌকায় ৫ জন বহন
করা হয়। প্রয়োজনে বড় নৌকাও পাওয়া যায়।

রাতারগুল মূল বনের মধ্যখানে খোলা জায়গায় রয়েছে ওয়াচ টাওয়ার। টাওয়ারে পাশে রয়েছে গাছের ছায়ায় কিছু নৌকায় ভাসমান দোকান। চা বিস্কিট ঝাল মুড়ি চানাচুর ডাব প্রভৃতি পাওয়া যায় এসব দোকানে।

বনের ভেতরের সার্বিক নিরেপত্তা পরিবেশ চমৎকার। যা পর্যটকদের সহজে আকৃষ্ট করে। তাই সিলেট ভ্রমনকালে সহজেই ঘুরে আসতে পারেন বাংলাদেশের একমাত্র মিঠাপানির জলজবন রাতারগুল। যা অবশ্যই ভালো লাগবে।
লেখক: সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও পর্যটক।

Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা