এই মাত্র পাওয়া :

ঢাকা, রোববার, ২৯ নভেম্বর ২০২০

বেলজিয়াম থেকে ফ্রান্স- ফরাসী পুলিশের খপ্পরে…

বিভাগ : কলাম প্রকাশের সময় :২১ নভেম্বর, ২০২০ ৩:৩৬ : অপরাহ্ণ

মিলু কাশেম

১৯৮৭ সালের কথা।আমি তখন জার্মানির লোয়ার রাইন অঞ্চলের ৮শত বছরের পুরনো ঐতিহাসিক নগরী স্যানটেন(Xanten)থাকি।কাজ করি এই অঞ্চলের বিখ্যাত এগ্রো ফার্ম ‘Firma Heben’ এ।দীর্ঘ দিনের কর্মদক্ষতায় আমি তখন এই প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপকের দায়িত্বে। একমাত্র বাঙালি হিসাবে এই শহরের প্রায় সবাই আমার পরিচিত আমাদের গ্রাহক। প্রতিবছর সামার টাইমে আমাদের ফল ফুল বাগানে কাজ করতে পূর্ব ইউরোপের বিভিন্ন দেশ পোল্যান্ড চেকোস্লোভাকিয়া হাংগেরী রোমানীয়া বুলগেরিয়া থেকে কলেজ ভার্সিটির অনেক ছাত্র ছাত্রী আসে কাজ করতে।

অনেক বেকার বাংলাদেশিদেরও আমি নিয়ে আসি কাজে। তাই সারা জার্মানিতে আমার পরিচিত লোকজন সামারের আগে থেকে আমার সাথে যোগাযোগ করেন কাজের জন্য। যে কারণে অনেক বাংলাদেশি ভারতীয় পাকিস্তানিদের সাথে আমার পরিচয় যোগাযোগ।

স্যানটেন শহরের ভৌগলিক অবস্থান নেদারল্যান্ড সীমান্তবর্তী হওয়ায় বিভিন্ন সময় আমি বাংলাদেশীরা বিপদে পড়লে তাদের নেদারল্যান্ড বেলজিয়াম ফ্রান্স ইংল্যান্ড যেতে সহযোগিতা করি। তাই অনেকেই জার্মানিতে থাকতে কারো সমস্যা হলে আমার সাথে যোগাযোগ করেন সাহায্যের জন্য। আমার পাকিস্তানী বংশোদ্ভূত জার্মান বন্ধু আজহার এ ব্যাপারে আমাকে সহযোগীতা করে। আশেপাশের দেশগুলোর সীমান্ত এলাকা তার চেনাজানা। তাই ইমিগ্রেশন ছাড়াই সীমান্তবর্র্তী গ্রামের ফাড়ি পথ দিয়ে সহজেই যাতায়াত করা যায়।

আজহার জার্মান পাসপোর্টধারী আমার বাংলাদেশী পাসপোর্ট হলেও জার্মান রেসিডেন্স ভিসাসহ বেলজিয়াম নেদারল্যান্ডস লুক্সেমবার্গ এর মাল্টিপল ভিসা আছে। তাই আমরা চলাচল করতে পারি সহজে। কিন্তু অবৈধ কাউকে নিয়ে গেলে নিরাপদের জন্য ফাঁড়িপথ ব্যাবহার করতে হয়। মাঝে মাঝে ফাড়ি পথেও বিপত্তি ঘটে যায়। সে রকম একটা ঘটনার কথা আজ বলছি।

একদিন জার্মানির আউসবোর্গ শহর থেকে আমার এক বন্ধু ফোন করে জানালেন সিলেটের দিরাই এলাকার একটা ছেলে খুব বিপদে আছে। তার এসাইলাম কেইস রিজেক্ট হয়ে গেছে। আপীলের কোন সুযোগ নেই। যে কোন সময় জার্মান পুলিশ থাকে দেশে পাঠিয়ে দিবে। ছেলেটে খুব আপসেট হয়ে পড়েছে দেশে যেতে চায় না।
ফ্রান্সের প্যারিসে তার এক বন্ধু আছে। সে বলেছে কোনভাবে আসতে পারলে সেখানে ব্যবস্থা হবে। আমাকে যে কোনভাবে ছেলেটাকে প্যারিস পৌছে দেবার ব্যবস্থা করার জন্য তিনি অনুরোধ করলেন। তারা ক’জন চাঁদা তুলে তেল খরচ দেবার কথাও বললেন। আউসবোর্গ থাকা নিরাপদ নয়। তাই তাকে আজই আমার কাছে পাঠিয়ে দিতে চাইলেন। আমি আমার বন্ধু আজহারকে বিষয়টা জানালে সে ২দিন পর শনিবার রাতে যাবার কথা বললো। আমি আমার বন্ধুকে পরদিন ছেলেটাকে দিনের ট্রেনে পাঠিয়ে দিতে বললাম।

আউসবোর্গ অনেকদূরে তাই সারাদিন লেগে যাবে। আমস্টারডাম গামী ট্রেনে ভিজেল স্টেশন নেমে টেক্সিকে ফিরমা হেভেন স্যানটেন ঠিকানা দেখালে আমার ঘরে পৌছে দেবে। সেভাবেই কোন ঝামেলা ছাড়া ছেলেটা আমার ঘরে পৌছে গেল। তার নাম কামাল, বাড়ী দিরাই।

প্রায় বছর খানেক আগে জার্মানিতে এসেছে।এর মধ্যে দ্রুত তিনবার কেইস খারিজ হয়ে গেছে। তার এক বন্ধু প্যারিসে আছে এখন তার কাছে যেতে চায়। সহজ সরল ছেলেটা হয়ত লেখা পড়াও তেমন করেনি। কথাবার্তায় তাই মনে হলো। শনিবার রাত ৮টার দিকে আমার বন্ধু আজহার তার ইগড কার নিয়ে আমার ঘরে আসলো। রাতের খাবার খেয়ে আমার বের হলাম প্যারিস অভিমূখে।

আমি আজহার সামনে বসে কামালকে পেছনের সিটে শুয়ে থাকতে বললাম। কামালের যেহেতু কোন কাগজপত্র নেই তাই আমাদেরকে সেভাবে যেতে হবে। রাতের মধ্যেই আমাদের প্যারিস পৌছতে হবে। স্যানটেন থেকে আমরা গেলাম জার্মানীর সীমান্ত শহরে ক্লিফ এ। শহরতলীর এক ফাঁড়িপথ দিয়ে আমরা সহজেই নেদারল্যান্ড ঢুকে গেলাম। গ্রামের আঁকাবাকা নীরব নিস্তব্ধ পথ পেরিয়ে কিছু সময়ের মধ্যে আমরা নাইমেগেন গামী হাইওয়েতে উঠে গেলাম।

শনিবার হাইওয়েতে বেশ ভীড়। নেদারল্যান্ড ছোট দেশ চমৎকার রাস্তাঘাট। ঘন্টা দেড়েক এর মধ্যে আমরা হল্যান্ড এর নাইমেগেন ব্রেদা প্রভৃতি ডাচ শহরে অতিক্রম করে সহজেই প্রবেশ করলাম বেলজিয়ামে। বেনেলাক্স চুক্তির কারণে বেলজিয়াম প্রবেশে কোন চেক পোস্ট নেই। কেবল ডবষষ Come To Belgium সাইন ছাড়া। বেলজিয়ামও ছোটদেশ। আলোকোজ্জ্বল চমৎকার হাইওয়ে চোখ জুড়িয়ে যায়। আমরা হাইওয়ের একটা সার্ভিস পয়েন্টে কিছু সময় বিশ্রাম নিয়ে কফি পান করে রওয়ানা হলাম ফ্রান্স বেলজিয়াম সীমান্ত অভিমুখে।

যেহেতু আমাদের সাথে একজন অবৈধ লোক তাই সাবধানে আমরা চলতে লাগলাম যাতে কোথাও কোন চেকিং এর সম্মুখিন না হই। বেলজিয় শহর আন্টভেরপন, জেন্ট অতিক্রম করে হাইওয়ে ধরে আমরা পৌছে বেলজিয়াম ফ্রান্স সীমান্তের ছোট শহর কোমিনেস Comines নর্থ এ।

এই শহরের অবস্থান একেবারে সীমান্ত বরাবর। শহরের একাংশ পড়েছে বেলজিয়াম অন্য অংশ ফ্রান্স এ। বেলজিয়ামে পড়েছে কোমিনেস নর্থ আর ফ্রান্সে কোমিনেস সাউথ। একাংশ থেকে অন্য অংশে যাবার জন্য আছে চেকপোস্ট। আবার এলাকার লোকজনের চলাচলের জন্য রয়েছে একাধিক ফাঁড়ি পথ। আমাদের সাথে অবৈধ লোক থাকায় আমরা শহরে বিভিন্ন সড়ক ঘুরে ঝামেলা ছাড়া ফ্রান্সের অংশে প্রবেশের পথ খুজতে থাকলাম। বেলজিয়ামের এই শহরে কিছু পাকিস্তানী থাকে। তাই আজহার এর আগে এখানে এসেছে। এবং একটা পথ তার চেনা যেদিকে সহজে কোমিনেস এর ফ্রান্স অংশে যাওয়া যায়। অনেক সময় ঘুরাঘুরি করে শহরের নিরিবিলি এলাকায় সেই পথটা খুজে পেলাম। জায়গাটা নীরব গ্রামের মত। বেলজিয়ামের শেষ প্রান্তে নো ম্যানস ল্যান্ড এর কাছে এক ফার্মারের বাড়ী। তার পর কয়েক মিটার নো ম্যানস ল্যান্ড। একটা স্পিড ব্যাকার তারপর একটা ছোট্র সাইন বোর্ড যাতে লেখা রিপাবলিক অব ফ্রান্স। ঠিক এপাশে আরেকটা সাইনে লেখা আছে রিপাবলিক অব বেলজিয়াম।

প্রায় মধ্যরাত তাই এলাকাটা নীরব নিস্তব্ধ। আমরা গল্প করে করে সহজে ফ্রান্সে ঢুকে ডানদিকে মোড় নেয়ার সাথে সাথে আমাদের অবাক করে সার্চ লাইট জ্বলে উঠলো। আলোতে আমাদের চোখ অন্ধকার হয়ে গেল। সাথে সাথে আমরা গাড়ী থামলাম। দেখি সামনে ফরাসী পুলিশের গাড়ী। দু’জন আর্মস পুলিশ আমাদের দিকে মেশিনগান তাক করে আছে।একজন অফিসার আমাদের গাড়ী থেকে বের হয়ে সারেন্ডার করার নির্দেশ দিল। আমি এবং আজহার গাড়ী থেকে নেমে হাত উপরে তুলে দাড়িয়ে রইলাম। আর্মস পুলিশ আমাদের কাছে এসে মেশিনগান তাক করেই রইলো। আর একজন অফিসার আমাদের সারা শরীর তল্লাশি করে এদিকে প্রবেশের কারন জানতে চাইলো। আমাদের সাথের কামাল তখনও পেছনের সিটে ঘুমের ভান করে পড়ে আছে।

আজহার বুদ্ধি করে তার সাথে কোমিনেস বেলজিয়াম অংশে থাকা পাকিস্তানীদের ঘরের ঠিকানা দেখিয়ে বললো আমরা এই ঘরে যাব রাস্তা খুঁজে পাচ্ছি না। এটা তো বেলজিয়াম অংশের ঠিকানা তোমরা তো ফ্রান্সে ঢুকে পড়েছো। তাই নাকি সরি আমরা বুঝতে পারিনি। অফিসার আমাদের কথা বিশ্বাস করে আমাদের কাগজপত্র দেখতে চাইলো। আমরা পাসপোর্ট দেখালাম। আমার যেহেতু বাংলাদেশী পাসপোর্ট আর ফ্রান্সের ভেলিড ভিসা নেই তাই অফিসার বললো আমি চাইলে তোমাদের অবৈধ প্রবেশের দায়ে ইমিগ্রশন পুলিশের হাতে দিতে পারি। কিন্তু এতরাতে আমি ঝামেলায় যেতে চাচ্ছি না। আর কখনো এরকম করবে না। এদিকেই তোমরা আবার ফেরত চলে যাও। তার আগে আমরা তোমাদের গাড়ী তল্লাশি করবো। তোমাদের কাছে কোন মাদক দ্রব্য বা অবৈধ কিছু আছে কি না।বলেই একজন টর্চ লাইট মারলে গাড়ীর পেছনের সিটে। সেখানে একজন শুয়ে আছে দেখে ফরাসী ভাষায় চিৎকার দিয়ে আবার মেশিন গান তাক করে কামালকে বেরিয়ে আসতে নির্দেশ দিলো। আমি আর আজহার ভয় পেয়ে আবার হাত উপরে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দাড়িয়ে রইলাম।

পুলিশের চিৎকার আর রনসজ্জা দেখে কামাল ভয়ে চুপসে গেলো। সে কি করবে ভেবে পাচ্ছে না। পুলিশ গাড়ীর দরজা খুলে তাকে বের করে আনলো। আমাদের দেখে সেও হাত ওপরে তুলে আত্মসমর্পণের ভঙ্গিতে দাড়িয়ে রইলো। পুলিশ তার দেহ তল্লাশি করলো তন্নতন্ন করে। তার পর পাসপোর্ট চাইলো। ফরাসীরা ফেঞ্চ ভাষা ছাড়া আর কিছুই জানে না। জানলেও বলে না। আমার বন্ধু আজহার ফ্রেঞ্চ সহ আশেপাশের ইউরোপিয়ান দেশ গুলোর ভাষা মোটামুটি সে বলতে পারে। তাই আজহার কথা বলছিলো পুলিশের সাথে। কামালের কাছে পাসপোর্ট বা অন্য কোন কাগজপত্র না পেয়ে পুলিশ জানতে চাইলো ছেলেটা কে আর আমাদের সাথে আসলো কি ভাবে। নিজেদের বাঁচাতে আমরা একটু মিথ্যার আশ্রয় নিলাম। আজহার পুলিশকে বললো আমরা তাকে চিনি না। হাইওয়ের সার্ভিস সেন্টারে সে আমাদের সাথে কমিননেস নর্থ আসার জন্য লিফট চাইলে আমরা তাকে নিয়ে আসি।

পুলিশ অফিসার বললো সে তো অবৈধ ইমিগ্রেন্ট। তার কাছে বৈধ কোন কিছু নেই। তোমরা কিভাবে কেন তাকে নিয়ে আসলে। তোমরা কি আদম পাচারকারী। এখন তো তোমাদেরকে নিয়ে আমাকে পুলিশ স্টেশন যেতে হবে। কথা শুনে আমরাও ভয় পেয়ে গেলাম। আজহার অফিসারকে বললো আমরা সরি আমাদের ভুল হয়ে গেছে। তোমরা ছেলেটাকে রেখে দাও। আমরা চলে যাই। সে যেহেতু অবৈধ আমরা তার কোন দায় নিতে পারবো না। তোমাদের যা ইচ্ছে করো।

কামাল ব্যাপারটা বুঝে আমাকে কাঁদোকাঁদো গলায় বললো ভাই আমাকে ফেলে যাবেন না। আমি তাকে সিলেটি ভাষায় আস্তে করে বললাম অফিসারের পায়ে জড়িয়ে ধরে কান্নাকাটি করতে। সে তাই করলো। অফিসার ঘাবড়ে গেল কান্না দেখে। মধ্যরাত পেরিয়ে গেছে। অফিসারের ডিউটির সময় শেষ। তাই সেও চাইছিলো না আমাদেরকে থানায় নিয়ে ঝামেলা বাড়াতে।

এক পর্যায়ে অফিসার বললো ঠিক আছে তোমরা ছেলেটাকে নিয়ে যে পথে এসেছো সে পথে আবার ফিরে যাও। ওকে যেখান থেকে তুলেছো সেখানে নামিয়ে দিও। ওর জন্য তোমাদের বিপদ। আমরা বললাম না ওকে আমরা নেব না। তোমরা নিয়ে যাও। না ওকে নিয়ে এতরাতে আমি ঝামেলা চাই না। তোমরা এনেছো তোমরা নিয়ে যাও বলে অফিসার গাড়ী ঘুরাবার নির্দেশ দিলেন। আমরা ধন্যবাদ দিয়ে আবার সীমান্ত পেরিয়ে বেলজিয়াম ফিরে আসলাম।
দ্রুত গতিতে আমরা সীমান্ত এলাকা ত্যাগ করে কোমিনেস এর শেষ প্রান্তে একটি বার এন্ড রেস্টুরেন্টের সামনে এসে দাড়ালাম।আজহার বললো সে এপথে অনেকবার যাওয়া আসা করেছে কখনো পুলিশ চোখে পড়েনি। তবে আমরা একটু আগেই সীমান্ত পারাপার করার চেষ্টা করেছি সেটা একটা কারন হতে পারে। আগে আজহার গভীর রাতে এপথে গেছে।
কামালকে নিয়ে কি করা যায় সেটা আলাপ করলাম।

সে ঘাবড়ে গিয়ে তাকে অন্য পথে হলেও যেন প্যারিস পৌছে দেই সেটা বলছে। আজহারের মাথায় একটা বুদ্ধি আসলো। কামালকে রেস্টুরেন্টে বসিয়ে খাবারের অর্ডার দিয়ে আমি আজহার আবার গেলাম সেই এলাকায় যেখানে পুলিশ আমাদের আটকে দিয়েছে। তবে এবার গাড়ী আমরা থামালাম বেলজিয়াম সীমান্তের সেই ফার্মারের বাড়ীর সামনে।
গাড়ী থামার শব্দে বাড়ীর কুকুর ঘেউ ঘেউ শুরু করলো। এক বৃদ্ধ মহিলা বাহিরের লাইট জালিয়ে আমাদের দেখলো। আবার লাইট নিভিয়ে দিল। এবার আমরা দু’জন টর্চ লাইট যেন কোন কিছু হারিয়ে গেছে বা পড়ে গেছে সেই ভঙ্গিমায় হেটে হেটে নোম্যানস ল্যান্ড পেরিয়ে ফ্রান্সের ভেতর ঢুকে গেলাম। যদি পুলিশ থাকে তবে আমরা বলবো আমাদেরকে তল্লাশির সময় আমার ঘরের চাবি হারিয়ে গেছে। তাই আমরা খুঁজতে এসেছি। না কোথাও পুলিশের গাড়ী নেই নেই কোন মানুষজন নিস্তব্ধ পুরো এলাকা। আমরা চাবি খুঁজতে খুঁজতে আমাদের যেখানে আটকানো হয়েছিলো সেই জায়গা অতিক্রম করে আরেকটু সামনে গিয়ে দ্রুত ফিরে এলাম গাড়ীতে। এবার কামালকে নিয়ে দ্রুত সীমান্ত পাড়ি দিতে হবে। রেস্টুরেন্ট থেকে কামালকে তুলে নিয়ে আবার সেই পথে অগ্রসর হলাম। খুব ধীরে ধীরে নোম্যানস ল্যান্ড পেরিয়ে ফ্রান্সে। আস্তে আস্তে সামনে অগ্রসর হয়ে সেই জায়গাটা অতিক্রম করলাম যেখানে পুলিশ আমাদের আটক করে ছিলো। সামনে এসে একটা চৌমুহনী। ডানদিকে আমরা চলে গেলাম আরেকটি ফরাসী সীমান্ত শহর ট্যুরকয়িং (ঞড়ঁৎপড়রহম) অভিমূখে। এখন পুলিশের ভয় কেটে গেছে।

রাস্তায় অনেক গাড়ীর সাথে আমাদের গাড়ী মিশে গেছে। আমরা হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চললাম ফ্রান্সের অন্যতম বড় শহর লিলে র দিকে। ভোর রাতে আমরা পৌছে গেলাম প্যারিসের আর্জেন্তাই এলাকায় আজহারের বন্ধু মাহমুদ ভাইয়ের ফ্লাটে। তিনি আমারও পরিচিত। যতবার প্যারিস এসেছি এখানেই থেকেছি। খুব বন্ধু বৎসল মানুষ মাহমুদ ভাই। আমরা আসবো সেটা তিনি জানতেন। তাই আমাদের খাবার দাবারের ব্যবস্থা করে রেখেছেন। ফ্রেশ হয়ে খাওয়া দাওয়া শেষ করে ঘুমিয়ে পড়লাম।

কামালকে পৌছে দিতে হবে প্যারিসের রিপাবলিক এলাকায়। মাহমুদ জায়গাটা চিনেন তিনি নিয়ে যাবেন সেখানে। সকাল ১০টা পর্যন্ত ঘুমোলাম। তার পর গোসল করে চা নাস্তা শেষে মাহমুদ ভাইয়ের গাড়ীতে কামালকে নিয়ে আমরা বেরুলাম। রিপাবলিক প্যারিসের বেশ ঘিঞ্জি ব্যাস্ত এলাকা। কামালের বন্ধুর সাথে ফোনে আলাপ করে লোকেশন জেনে নেয়ায় আমরা সহজেই ঠিকানা খুঁজে পেলাম। এই এলাকায় প্রচুর বাংলাদেশী থাকেন।

খুব ছোট গলি দিয়ে ঢুকতে হয়। কল্পনা করা যায় না প্যারিসের ভেতর এরকম এলাকা আছে। ছোট ছোট রুমে গাদাগাদি করে ৪/৫ জন থেকে। ট্রেনের স্লিপার কারের মত বিছানা পাতা। কামাল সব বিপদ কাটিয়ে প্যারিস পৌছে খুব খুশী। তার বন্ধু ও অন্যান্য বাংলাদেশীরা কামালকে নিরাপদে নিয়ে আসার জন্য আমাদের ধন্যবাদ দিলেন। তারা তাদের সাথে দুপুরের খাবার খেতে অনুরোধ করলো। মাহমুদ ভাই আমাদের লাঞ্চ এরেঞ্জ করেছেন তাই তাদের ধন্যবাদ দিয়ে আমরা বিদায় নিলাম।

আইফেল টাওয়ারের কাছে সীন নদীর তীরে একটু ঘুরাঘুরি করে মাহমুদের ভাইয়ের ঘরে ফিরলাম। গত রাতেই মাহমুদ ভাই আমাদের খাবার তৈরী করে রেখেছিলেন। বাসমতি চালের ভাত আর গরুর মাংস ভুনা সাথে বুটের ডাল। খুব মজা করে তৃপ্তিসহকারে খেলাম। কিছু সময় গল্পগুজব করে একটু বিশ্রাম নিয়ে আমরা বেরিয়ে পড়লাম। এখন আর কোন টেনশন নেই। আমরা ব্রাসেলস অভিমুখি হাইওয়ে ধরে এগিয়ে চলালাম। আমার বেনেলাক্স ভিসা আছে।ত াই এখন বেলজিয়ামে প্রবেশে সমস্যা নেই। সন্ধ্যার পর পর আমরা ফ্রান্স বেলজিয়াম সীমান্তের মউসকর্ন চেক পোস্টে আসলাম। শুধু গাড়ীর গতি কমিয়ে সহজেই আমরা বেলজিয়ামে প্রবেশ করলাম। রাতে বেলজিয়ামের মহাসড়ক চমৎকার আলোকোজ্জ্বল। নিয়ন আলোর ঝলকানি দেখতে দেখতে আমরা এগিয়ে চলালাম বেলজিয়াম পেরিয়ে নেদারল্যান্ডস এর ফেনলো অভিমুখে। গাড়ীতে তখোন বাজছে পংকজ উদাসের হৃদয় পাগলকরা গজলের ঝংকার।

লেখক-সাংবাদিক, সাহিত্যিক ও পর্যটক
































Print Friendly and PDF

ফেইসবুকে আমরা