বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নিবাহী প্রকৌশলী অরূপ চক্রবর্তীর বিরুদ্ধে নানা দুর্নীতি ও অর্থ আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে । বিভিন্ন অনুসন্ধানে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডের কিছু কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারের মধ্যে গোপন চুক্তির মাধ্যমে সরকারি বরাদ্দের অপব্যবহার হচ্ছে। বিশেষ করে বা নদী রক্ষা প্রকল্প এবং বিভিন্ন জলবায়ু পরিবর্তন প্রতিরোধী প্রকল্পগুলিতে ব্যাপক অনিয়ম হয়েছে। স্থানীয় জনগণ এবং বিভিন্ন উন্নয়ন সংস্থার পক্ষ থেকে এসব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের অপব্যবহারের অভিযোগ উঠেছে । তাছাড়া ঠিকাদারী বিল থেকে ১০ থেকে ১৫ পাসেন্ট কমিশন নিয়ে থাকেন নিবাহী প্রকৌশলী অরূপ চক্রবর্তী। ১৭ সেপ্টেম্বর ২০২০ সালে বান্দরবানে নিবাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগ দেন অরূপ চক্রবর্তী। দীর্ঘ ৫ বছর তিনি বান্দরবানে বহাল তবিয়তে আছেন। ৫ আগস্টের পর সব পরিবর্তন হলেও এক সময়ে ছাত্রলীগ করা অরূপ চক্রবর্তী এখনো বহাল থাকায় জনমনে নানা প্রশ্ন উঠেছে।
বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী, এসও এবং বাঁধ নির্মাণে জড়িত ঠিকাদারের যৌথ দূর্ণীতি অনিয়মের কারণে গত ২৬ এপ্রিল পানির তোড়ে পেকুয়া গোঁয়াখালী রাবার ড্যাম সংলগ্ন নড়বড় বাঁধ নির্মানের ৩ সপ্তাহ পার না হতেই ভেসে যায়। কেটি টাকার এই প্রকল্পের হিসভাগই গেছে পানি উন্নয়ন পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তাদের পেটে।
এলাকাবাসী জানায়, পেকুয়া সদর ইউনিয়নটি চারদিক থেকে মাতামুহুরী নদী ও তার শাখা খাল দিয়ে বেষ্টিত। বন্যা ও সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাস থেকে লোকালয় রক্ষার জন্য এখানে রয়েছে পানি উন্নয়ন বোর্ডের বেড়িবাঁধ। এই বেড়িবাঁধগুলো দীর্ঘদিন ধরে সংস্কার না হওয়ায় ভেঙে ও নিচু হয়ে গেছে। কোথাও কোথাও বেড়িবাঁধ সরু আইলে পরিণত হয়েছে। বর্ষায় মাতামুহুরী নদীতে নেমে আসা পাহাড়ি ঢলের পানি বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে পেকুয়া সদর ইউনিয়ন প্রতিবছর বন্যাকবলিত হয়ে আসছে। পেকুয়া সদর ইউনিয়নে গত বছর বর্ষার সময় বেড়িবাঁধ ভেঙে ও উপচে স্মরণাতীত কালের ভয়াবহ বন্যা দেখা দেয়। ওই বন্যায় এলাকায় ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। এখানে সামুদ্রিক জলোচ্ছ্বাসেও লোকালয় প্লাবিত হয়। কোনো কোনো সময় বড় জোয়ারে এলাকায় লবণাক্ত পানি ঢুকে পড়ে। পেকুয়ায় টেকসই বেড়িবাঁধ নির্মাণ এলাকাসীর গণদাবি। সরেজমিন দেখা যায়, পেকুয়া উপজেলার পেকুয়া সদর ইউনিয়নের ৯নং ওয়ার্ডের বাঘগুজারা ব্রিজ থেকে নন্দীরপাড়ার ৩৬নং স্লুইসগেট এলাকা পর্যন্ত ১৪ মিটার সংস্কার কাজ চলছে। পেকুয়ার ৬৪/২বি পোল্ডার বেড়িবাঁধটি বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ডের অধীনে। বান্দরবান পানি উন্নয়ন বোর্ড সূত্র জানায়, মেসার্স আলম অ্যান্ড ব্রাদার্স নামে চট্টগ্রামের একটি ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান ১ হাজার ৪শ মিটারের এই সংস্কার কাজটির টেন্ডার পান। ইতোমধ্যে ১ কিলোমিটারের অধিক কাজ শেষ করেছেন। সংস্কার কাজ করার সময় সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের কোনো লোকজনকে প্রকল্প এলাকায় দেখা যায়নি। এমনকি পানি উন্নয়ন বোর্ডের কোনো লোকজনও নেই। আছে শুধু ভেকু মেশিনচালক ও কয়েকজন সহকারী। একটি সূত্র জানিয়েছে, পেকুয়ার কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তি ক্ষমতার প্রভাব খাটিয়ে কমিশনের ভিত্তিতে বেড়িবাঁধের সংস্কার কাজটি করে দেওয়ার দায়িত্ব নিয়েছেন। তারা ভেকু মেশিন দিয়ে পুরাতন বেড়িবাঁধ সেঁটে দিচ্ছে। বেড়িবাঁধের মাটি দিয়েই বেড়িবাঁধের সংস্কার কাজ করা হচ্ছে। বেড়িবাঁধের গোড়া থেকে মাটি কেটে উপর দিকে তুলে দিতে দেখা গেছে। বেড়িবাঁধের স্লোপ বেশি দেখানোর জন্য বাঁধের গোড়া থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি খুঁড়ে সেঁটে দেওয়া হয়েছে। এতে বেড়িবাঁধটি আরও ঝুঁকিতে পড়ে গেছে। এলাকাবাসী জানায়, বেড়িবাঁধের গোড়া থেকে ভেকু মেশিন দিয়ে মাটি কেটে নেওয়ার কারণে বর্ষায় এসব মাটি আবারও নেমে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এভাবে বেড়িবাঁধের বাইরের দিকে স্লোপ ও ভেতরের দিকের স্লোপে শুভংকরের ফাঁকি দেওয়া হয়েছে। বান্দরবান সদরের গোয়ালিয়া খোলা নদী রক্ষায় কাজও চলছে যেনতেন। বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার শীলেরতোয়া মারমা পাড়ায় মাতামুহুরি নদীর বাম তীরে ২০০ মিটার দৈর্ঘ্যে জরুরি নদীতীর প্রতিরক্ষা কাজ নিয়েও আছে অনিয়মের অভিযোগ।
মাতামুহুরী নদীর তীর রক্ষা , সাঙ্গু নদীর তীর রক্ষা ক্যান্টনমেন্ট, বান্দরবান জেলার লামা উপজেলার লামাবাজার এলাকায় মাতামুহুরী নদীর বাম তীরে প্রতিরক্ষা কাজ কাজেও চরম অনিয়মের অভিযোগ তুলেছে স্থানীয়রা।
এদিকে প্রায় ৫০ কোটি টাকা ব্যায়ে লামা লাইন জিরি নদী রক্ষা বাধের কাজ নিয়েও তৈরী হয়েছে শংকা।
স্থানীয় জনগণের দাবি, “পানি উন্নয়ন বোর্ডের কর্মকর্তা এবং ঠিকাদারদের মধ্যে আঁতাতের কারণে প্রকল্পের কাজের গুণগত মান কমছে এবং প্রকল্পের সম্পূর্ণ করতে যাওয়া অর্থ কেবলমাত্র এক শ্রেণির মানুষের মধ্যে চলে যাচ্ছে।” তারা আরও বলেন, “নদী রক্ষা প্রকল্পের কাজের জন্য যে উপকরণ ব্যবহার করা হচ্ছে, তা পরবর্তীতে প্রকল্পের স্থায়িত্বের জন্য হুমকি হয়ে দাঁড়াবে।”
নির্ভরযোগ্য সূত্র থেকে জানা গেছে, পানি উন্নয়ন বোর্ডে অনেক প্রকল্পে নিয়োগ প্রক্রিয়ায় অনিয়ম হয়েছে। এসব প্রকল্পের জন্য বরাদ্দকৃত অর্থের অনেকাংশেই ঠিকাদারদের মাধ্যমে কিছু প্রভাবশালী কর্মকর্তা এবং রাজনৈতিক দলের সদস্যদের পকেটে চলে যাচ্ছে। একাধিক প্রকল্পে ঠিকাদারদের নির্দিষ্ট অংশীদারির মাধ্যমে এই দুর্নীতি চলছে, যেখানে পুরনো চুক্তির ভিত্তিতে কাজ দেওয়ার চেষ্টা হচ্ছে।
বিভিন্ন নদী রক্ষা এবং বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পের জন্য সরবরাহকৃত সামগ্রীর মান নিয়ে স্থানীয়দের মধ্যে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিশেষভাবে, বাঁধ নির্মাণ প্রকল্পে ব্যবহৃত সিমেন্ট, রড এবং অন্যান্য নির্মাণ সামগ্রীর মান যথেষ্ট নিম্ন, যা প্রকল্পের দীর্ঘমেয়াদি কার্যকারিতার জন্য বিপজ্জনক হতে পারে।
প্রকল্পগুলোর তদারকি এবং বাস্তবায়ন থেকে যে সমস্ত দুর্নীতি সম্পর্কিত অভিযোগ উঠেছে, তা সামাজিক সংগঠনগুলো এবং উন্নয়ন সংস্থাগুলোর জন্য উদ্বেগজনক। তাদের মতে, সরকারি প্রকল্পে ব্যাপক দুর্নীতি শুধু দেশের অর্থনীতির জন্য ক্ষতিকর নয়, বরং প্রকল্পের মাধ্যমে জনগণের স্বার্থও ক্ষুণ্ণ হচ্ছে।