বাঁশখালীতে সাবেক এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরী ও তার চাচা সরল ইউনিয়ন পরিষদের পলাতক চেয়ারম্যান রশিদ আহমদ চৌধুরীর অনুগত ঢাকা সিদ্ধেশ্বরী কলেজ ছাত্রলীগের সাবেক সভাপতি বাঁশখালী উপজেলা এলজিইডি অফিসের উপসহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম এখনো বহাল তবিয়তে। ২০২০ সালে বাঁশখালীতে যোগদান করা এই অফিসার সাবেক এমপির নির্দেশে সরল, শীলকূপ, কাথরিয়া, ছনুয়াসহ বেশ কয়েকটি ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা হয়ে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও ভাগবাটোয়ারা করেন বলে অভিযোগ করেছেন খোদ ঠিকাদার ও স্থানীয়রা।
৫ আগস্টের পূর্বে মুজিবুর রহমান সিআইপি স্বতন্ত্র এমপি থাকা অবস্থায় ঠিকাদারদের নিয়ে একটি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এলজিইডির প্রধান প্রকৌশলীর উপস্থিতিতে উক্ত বৈঠকে এমপি মুজিবুর রহমান সিআইপির সামনেই ভুক্তভোগীরা উপ সহকারী প্রকৌশলী মাহব্বুুল আলম নিয়ে অভিযোগ করলে তিনি অতিসত্বর উক্ত উপ সহকারী প্রকৌশলীকে বাঁশখালী থেকে বদলী করার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরবর্তীতে পটপরিবর্তনের পর তিনি সেই যাত্রায় পার পেয়ে যান।
জানা গেছে, বাঁশখালী উপজেলা এলজিইডি অফিসের উপ সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম বাঁশখালীতে যোগদানের পর থেকেই নানা অনিয়ম ও দুর্নীতিতে জড়িয়ে পড়েন। তৎকালীন এমপি মোস্তাফিজুর রহমান চৌধুরীর অনুগত হওয়ায় তার নির্দেশে কাজ না করেই উন্নয়ন কাজের বিল উত্তোলনের ছাড়পত্র দিতেন। এমপি চেয়ারম্যান, ইউপি সদস্য, টিকাদার ও রাজনৈতিক ক্যাডারদের নিয়ে উপ সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবের একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট ছিল সেই সময়। সরকার পরিবর্তনের পর তার সিন্ডিকেটে কিছুটা ভাটা পড়লেও এখনও ওই কর্মকর্তা বাঁধাহীন একছত্রভাবে সরকারী প্রকল্পে হরিলুট করছে বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। এই কর্মকর্তার দুর্নীতির তদন্ত ও বাঁশখালী থেকে তার অপসারণ চেয়ে এলজিইডি উপদেষ্টা, জেলা প্রশাসকসহ সরকারের বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন ভুক্তভোগীরা।
অভিযোগ সূত্র জানায়, বাঁশখালী উপজেলার সরল ইউনিয়নের দায়িত্বপ্রাপ্ত ছিলেন উপ সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব। উক্ত ইউনিয়নে বিভিন্ন প্রকল্পে এমপি মোস্তাফিজ, চেয়ারম্যান রশিদ আহমদের যোগসাজশে কাজ না করে বিল তুলে নেয়ার করিগর ছিলেন এই কর্মকর্তা। সরল ইউনিয়ন রাস্তাঘাটের বেহাল দশা হওয়ার মুল কারণই হচ্ছে বরাদ্দের পরও কাজ না করে বিল তুলে আত্মসাৎ করা। শুধু তাই নয়; এই রাস্তাঘাটের বেহাল দশার কারণেই গেল সংসদ নির্বাচনের দিন ক্ষীপ্ত লোকজন সরল এলাকায় তৎকালীন এমপি মোস্তাফিজকে লাঠিসোটা নিয়ে হামলা করেন।
সূত্র জানায়, সরকার পরিবর্তনের পরও উপ সহকারী প্রকৌশলী মাহবুব সরল ইউনিয়নের দায়িত্বে রয়ে গেছেন বহাল তবিয়তে। এমনকি ৩ বছরের অধিক কাল ধরে এই কর্মকর্তা বাঁশখালীতে খুটি গেড়ে বসে থাকলেও দেখার কেউ নেই। এখন রাজনৈতিক সরকার না থাকায় এক প্রকার বাঁধাহীনভাবে তার দুর্নীতি অনিয়ম ও লুটপাট চলছে বলে মনে করেন স্থানীয়রা। বাঁশখালী উপজেলা প্রকৌশলী ফাহাদ বিন মাহমুদসহ পুরানো কর্মকর্তারা এই দুর্নীতিবাজ কর্মকর্তাকে আগলে রেখে তার দুর্নীতির অংশীদার হিসেবেই মনে করছে এলাকার সচেতন মহল।
তাছাড়া দুর্নীতিবাজ পলাতক চেয়ারম্যান রশিদ ও সাবেক এমপি মোস্তাফিজের ইশারাতেই এখনো কাজ করছেন কর্মকর্তা মাহবুব। সরল ইউনিয়নে কাজ না হওয়ার পিছনে এই মাহবুব দায়ী বলে জানান এলাকাবাসী।
সূত্র আরো জানায়, সরল ইউনিয়নের পাইরাং সড়কে সাড়ে ৩ কোটি টাকা, বৈলছড়ি বাজার থেকে চুনতি বাজার সড়ক সাড়ে ৫ কোটি টাকা, শীলকূপ থেকে গন্ডামারা পযর্ন্ত সড়কে ৩ কোটি ৭৬ লাখ টাকার কাজে চরম দুর্নীতি ও লুটপাট হয়েছে এই কর্মকর্তার নেতৃত্বে। তাছাড়া আগের ঠিকাদার ফেলে চলে যাওয়ায় বর্তমানে রিটেন্ডার হয়ে উক্ত সড়কে কাজ চললেও কাজে নয়ছয় হচ্ছে বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।
একইভাবে ছনুয়া ইউনিয়নে কোটি টাকার কাজে চলছে চরম দুর্নীতি। ছনুয়া ইউনিয়নে বর্তমানে তার অধীনে সাড়ে ৬ কোটি টাকার কাজ চলমান।
একইভাবে পৌর সদরের আশকরিয়া সড়ক থেকে সরল খালাইচ্যার দোকান সড়কে ১ কোটি ৩০ লাখ টাকার শুরু হলেও এই উপ সহকারী প্রকৌশলীর কারণেই মাঝ পথে কাজ পেলে ঠিকাদার পালিয়ে যায়।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক সরকারী কর্মকর্তা জানান, উপজেলা পরিষদে তার জন্য সরকারী কোয়ার্টার বরাদ্দ থাকলেও নানা দেন দরবার ও সিন্ডিকেট নিয়ে ভাগবাটোয়ারা করার সুবিধার্থে সরকারী কোয়ার্টারের বাইরে আশকরিয়া সড়কে প্রাইভেট বাসা নিয়ে থাকেন এই কর্মকর্তা। তার বাসায় এখনো সাবেক সরকারের অনুগত লোকজনের যাতায়াত রয়ে গেছে। বাসার আশপাশের সিসিটিভি পর্যবেক্ষণ করলেই বিষয়টির সত্যতা মিলবে।
সরল ইউনিয়নের সাবেক মেম্বার জাকের আহমদ জানান, উপ সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলমকে ২০ হাজার টাকা ঘুষ না দেয়ায় একটি মসজিদের বরাদ্দ বাতিল করে দেন। তার বিরুদ্ধে ব্যাপক ঘুষ বানিজ্যের অভিযোগ থাকলেও তার বিরুদ্ধে অদৃশ্য কারণে ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছেনা।
পাইরাং এলাকার প্রবীণ ব্যক্তি বদিউল আলম জানান, ঠিকাদার ও সরকারী লোকজন মিলে নিম্মমানের সামগ্রী দিয়ে সরল ইউনিয়নের কাজ করা হচ্ছে। বিষয়টি তদন্তের জন্য আমি সরকারী বিভিন্ন দফতরে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোন প্রতিকার পাইনি।
অভিযোগ প্রসঙ্গে উপ সহকারী প্রকৌশলী মাহবুবুল আলম জানান, আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ সত্য নয়। সরকারী উন্নয়ন কাজে কোন দুর্নীতি অনিয়ম হচ্ছেনা। তবে ৩ বছরের অধিককাল বাঁশখালীতে কর্মরত থাকা এবং সরকারি কোয়ার্টার থাকা সত্বেও বাইরে প্রাইভেট বাসা নিয়ে বসবাস করা নিয়ে তিনি মন্তব্য করতে রাজি হননি।