জাতীয়

সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের যে সাজা হতে পারে, কী আছে আইনে

 

নির্বাচন কমিশনের সাবেক তিন প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) কাজী রকিবউদ্দীন আহমেদ, কে এম নূরুল হুদা ও কাজী হাবিবুল আউয়ালসহ মোট ২৪ জনের বিরুদ্ধে বিএনপি মামলা দায়ের করেছে। এই মামলায় অভিযোগ করা হয়েছে যে, এই ব্যক্তিরা ২০১৪ ও ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে প্রহসনমূলক নির্বাচন পরিচালনা করেছেন এবং এতে নির্বাচনী জালিয়াতি ও অপরাধমূলক কার্যকলাপে জড়িত ছিলেন। মামলাটি শেরেবাংলা নগর থানায় ২২ জুন দায়ের করা হয় এবং এর পর থেকে সাবেক সিইসি নূরুল হুদা ও হাবিবুল আউয়ালকে গ্রেফতার করা হয়।

এই মামলায় মোট সাতটি ধারায় অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মধ্যে অন্যতম হলো দণ্ডবিধির ১৭১(খ) ধারায় নির্বাচনী অধিকার প্রয়োগে ঘুষ লেনদেনের অভিযোগ, ১৭১(ঘ) ধারায় জালভোট প্রদান ও এতে সহায়তার অভিযোগ, ১৭১(ছ) ধারায় নির্বাচনী সম্পর্কে মিথ্যা বিবৃতি দেওয়া এবং ১৭১(জ) ধারায় অবৈধ অর্থ প্রদান। তবে, দণ্ডবিধির ১৭১ ধারাগুলোর বেশিরভাগই জামিনযোগ্য এবং এর জন্য কোনো কারাদণ্ডের বিধান নেই, বরং সর্বোচ্চ ৫০০ টাকা জরিমানা হতে পারে।

অন্যদিকে, ১২০(খ) ধারায় একটি গুরুতর অভিযোগ আনা হয়েছে, যার মতে, কোনো ব্যক্তি যদি অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে যুক্ত থাকে, তাহলে তাকে সর্বোচ্চ দুই বছরের কারাদণ্ড, যাবজ্জীবন অথবা মৃত্যুদণ্ড দেওয়া হতে পারে। তবে, এই অভিযোগটি প্রমাণিত হলে যেকোনো অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রের জন্য ছয় মাসের কারাদণ্ড বা অর্থদণ্ডও হতে পারে। এই ধারার অধীনে, যদি নির্বাচনী কমিশনাররা কোনো ষড়যন্ত্রের অংশ হয়ে থাকেন, তবে তাদের বিরুদ্ধে শাস্তি প্রদান সম্ভব।

এছাড়া, মামলার আরও কিছু গুরুত্বপূর্ণ অভিযোগ রয়েছে। ২০১৮ সালের জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপিসহ অন্যান্য দলগুলোকে ভোটের অধিকার থেকে বঞ্চিত করার অভিযোগ তোলা হয়েছে। নির্বাচনী পরিবেশ পুরোপুরি খারাপ করা হয়েছে এবং ভোটের পরিসংখ্যানেও মিথ্যাচারের অভিযোগ রয়েছে। বিএনপির মতে, নির্বাচন কমিশন ও সরকার মিলে একটি অবৈধ নির্বাচন আয়োজন করেছে, যাতে জনগণের ভোটের অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। এই অভিযোগের মধ্যে একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো, ভোট কেন্দ্রগুলোর নিয়ন্ত্রণ আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও আওয়ামী লীগের ক্যাডারদের হাতে ছিল, যার ফলে ভোটারদের ভয়ভীতি প্রদর্শন করা হয়েছে এবং নির্বাচনে স্বাধীনতার অভাব ছিল।

তবে, এই মামলায় নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগগুলো প্রাথমিকভাবে জামিনযোগ্য, এবং এটি শাস্তির জন্য কঠিন আইনি পদক্ষেপের অধীনে আসবে না। যদিও মামলার তদন্ত এখনো চলমান এবং নতুন তথ্য বেরিয়ে আসতে পারে, কিন্তু বর্তমানে অভিযোগের মধ্যে সবচেয়ে বড় শাস্তির বিধান হলো ১২০(খ) ধারার অপরাধমূলক ষড়যন্ত্রে জড়িত থাকার অভিযোগে সর্বোচ্চ ছয় মাসের সাজা হতে পারে।

এছাড়া, মামলায় আরও উল্লেখ করা হয়েছে যে, নির্বাচনের ফলাফলে হস্তক্ষেপ করার জন্য সাবেক প্রধান নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে দুর্নীতি দমন কমিশনের মামলার প্রস্তুতি চলছে। মামলাটির তদন্ত শেষে আরও ধারার অভিযোগ যুক্ত হতে পারে, যার ফলে আসামিদের বিরুদ্ধে আরও কঠোর শাস্তির সম্ভাবনা রয়েছে।

এই মামলায় সাবেক নির্বাচন কমিশনারদের বিরুদ্ধে দায়ের হওয়া অভিযোগগুলি মূলত তাদের অবৈধ কর্মকাণ্ড এবং নির্বাচন প্রক্রিয়ায় জালিয়াতির সঙ্গে সম্পর্কিত। তবে, যতটুকু প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে, তা ভিত্তি করে আইনে তাদের বিরুদ্ধে উপযুক্ত শাস্তি প্রবর্তন করা সম্ভব হচ্ছে না। তবুও, আইন প্রয়োগকারী সংস্থাগুলি সর্বোচ্চ পরিশ্রম করার অঙ্গীকার করেছে, যাতে আসামিদের শাস্তি নিশ্চিত করা যায়।

সর্বশেষ, বিএনপির এই মামলার প্রেক্ষাপটে, এটি স্পষ্ট হয়ে উঠেছে যে, বাংলাদেশের নির্বাচনী ইতিহাসে বিশেষ কিছু নির্বাচনের ফলাফল নিয়ে জনমনে বিতর্ক সৃষ্টি হয়েছে। এসব বিতর্কিত নির্বাচনের জন্য নির্বাচন কমিশনকে দোষী মনে করা হচ্ছে এবং তাদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার দাবি তোলা হচ্ছে। তবে, এই মামলা এবং মামলার তদন্তের পর পরবর্তী আইনি পদক্ষেপগুলো কী হবে, তা সময়ের সঙ্গে স্পষ্ট হবে।

 
 
 


সম্পর্কিত খবর