কৃষিপ্রধান বাংলাদেশের অর্থনীতি ও খাদ্যনিরাপত্তার অন্যতম প্রধান ভিত্তি কৃষি। আর কৃষির উৎপাদনব্যবস্থায় ইউরিয়া সার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপকরণ। এই সারের সরবরাহ, বিতরণ ও বাজারব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা শুধু প্রশাসনিক দায়িত্ব নয়, বরং কৃষকের অধিকার রক্ষারও অপরিহার্য শর্ত। অথচ সেই গুরুত্বপূর্ণ খাতেই যদি ডিলার নিয়োগের যোগ্যতা, তদন্তের নিরপেক্ষতা এবং রাজনৈতিক প্রভাব নিয়ে প্রশ্ন ওঠে, তাহলে তা উপেক্ষা করার সুযোগ কোথায়?
২০২৫ সালের সার ডিলার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির শর্ত কাটছাঁট করে ২০২৬ সালে ইউনিয়নপ্রতি একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগের বিজ্ঞপ্তি জারি করা হয়েছিল। শর্ত শিথিল করার উদ্দেশ্য যদি হয় প্রকৃত যোগ্য উদ্যোক্তাদের সুযোগ দেওয়া, তাহলে সেটি ইতিবাচক উদ্যোগ। কিন্তু শর্ত শিথিলের সুযোগ নিয়ে যদি প্রয়োজনীয় যোগ্যতা ও অবকাঠামো ছাড়াই কেউ ডিলারশিপ পেয়ে যান, আর নিয়ম মেনে আবেদন করেও কেউ বঞ্চিত হন, তাহলে প্রশ্ন উঠবেই—এই নিয়োগপ্রক্রিয়া আসলে কাদের জন্য?
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ উঠেছে, নতুন নিয়োগে এমন ব্যক্তিরাও ইউরিয়া সারের ডিলারশিপ পেয়েছেন, যাঁদের কারও আয়কর রিটার্নের কপি নেই, কারও নিজস্ব বা প্রয়োজনীয় গোডাউন নেই, আবার কেউ অন্যের গোডাউন নামমাত্র চুক্তিতে দেখিয়ে তদন্তের ধাপ পার হয়েছেন। এমনকি গোডাউনের বাস্তব সক্ষমতা যাচাই না করে শুধু চুক্তিপত্র ও সাইনবোর্ডের ভিত্তিতে যোগ্যতা নিশ্চিত করা হয়েছে কি না, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
এসব অভিযোগ সত্য হলে বিষয়টি কেবল কয়েকজন ডিলারের যোগ্যতা নিয়ে বিতর্ক নয়; বরং সরকারি নিয়োগপ্রক্রিয়ার বিশ্বাসযোগ্যতা ও প্রশাসনিক জবাবদিহির প্রশ্ন।
শর্ত শিথিল, নাকি যোগ্যতার সংজ্ঞাই বদলে গেল?
নিয়োগবিধিতে শর্ত শিথিল করা আর যোগ্যতার প্রয়োজনীয়তা উপেক্ষা করা এক বিষয় নয়। সরকার কোনো নীতিমালা সংশোধন করলে সেই সংশোধিত শর্ত সবার জন্য সমানভাবে প্রযোজ্য হওয়ার কথা। কোনো আবেদনকারী যদি নির্ধারিত শর্ত পূরণ করতে ব্যর্থ হন, তাহলে তাঁকে কীভাবে যোগ্য বিবেচনা করা হলো, তার ব্যাখ্যা থাকা প্রয়োজন।
আয়কর রিটার্ন, আর্থিক সক্ষমতা, গুদামজাতকরণের ব্যবস্থা এবং সার সংরক্ষণ ও বিতরণের উপযুক্ত অবকাঠামো—যে শর্তগুলো সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞপ্তিতে বাধ্যতামূলক, সেগুলো পূরণ হয়েছে কি না, তা যাচাই করা নিয়োগকারী কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব। কোনো শর্ত যদি সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে আর বাধ্যতামূলক না থাকে, তাহলে সেটি না থাকার কারণে কাউকে অযোগ্য বলাও সঠিক হবে না। কিন্তু যে শর্ত বহাল রয়েছে, তা কারও ক্ষেত্রে প্রয়োগ হবে আর কারও ক্ষেত্রে হবে না—এমন বৈষম্য গ্রহণযোগ্য হতে পারে না।
এখানেই মূল প্রশ্ন: নিয়োগে কি বিধিমালা অনুসরণ করা হয়েছে, নাকি ব্যক্তিবিশেষের জন্য বিধিমালাকে সুবিধামতো ব্যাখ্যা করা হয়েছে?
তদন্ত কি সত্য যাচাইয়ের হাতিয়ার, নাকি আনুষ্ঠানিকতা?
যেকোনো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় তদন্তের উদ্দেশ্য হলো কাগজপত্রের সঙ্গে বাস্তবতার মিল খুঁজে বের করা। আবেদনকারীর দেখানো গুদাম সত্যিই তাঁর নিয়ন্ত্রণে আছে কি না, সেখানে নির্ধারিত পরিমাণ সার সংরক্ষণের সক্ষমতা রয়েছে কি না, চুক্তি কার্যকর কি না এবং অন্যান্য বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ হয়েছে কি না—এসব বিষয় সরেজমিনে যাচাই করা জরুরি।
শুধু একটি চুক্তিপত্র দেখে, সাইনবোর্ডের ছবি তুলে কিংবা আনুষ্ঠানিক পরিদর্শন সম্পন্ন করেই যদি তদন্তের দায়িত্ব শেষ করা হয়, তাহলে সেই তদন্তের কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন উঠবেই।
একটি গুদামের সামনে সাইনবোর্ড টাঙানো আর বাস্তবে সার সংরক্ষণের উপযুক্ত গুদাম থাকা এক কথা নয়। কাগজে চুক্তি থাকা আর সেই চুক্তির ভিত্তিতে কার্যকরভাবে গুদাম ব্যবহারের অধিকার থাকা এক বিষয় নয়। প্রশাসনিক তদন্তের কাজ এসব পার্থক্য শনাক্ত করা।
তবে অভিযোগের ভিত্তিতে কাউকে আগেভাগে অনিয়মকারী ঘোষণা করাও দায়িত্বশীল সাংবাদিকতার পরিচয় নয়। প্রয়োজন আবেদনপত্র, সংশ্লিষ্ট দলিল, তদন্ত প্রতিবেদন ও নিয়োগের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত পর্যালোচনা করা। অভিযোগ সত্য হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে; আর অভিযোগ অসত্য হলে সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদেরও আত্মপক্ষ সমর্থনের সুযোগ দিতে হবে।
স্থানীয় সংসদ সদস্যের আশীর্বাদ—অভিযোগের সত্যতা যাচাই হবে কীভাবে?
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগ রয়েছে, রাজনৈতিক প্রভাব ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের ঘনিষ্ঠতার কারণে কিছু আবেদনকারী বিশেষ সুবিধা পেয়েছেন। অভিযোগটি গুরুতর। তবে কোনো ব্যক্তির রাজনৈতিক পরিচয় বা কারও সঙ্গে সম্পর্ক থাকার কারণেই তাঁকে অনিয়মের দায়ে অভিযুক্ত করা যায় না। দেখতে হবে, নিয়োগের সিদ্ধান্তে সেই পরিচয় বা সম্পর্ক বাস্তবে প্রভাব ফেলেছে কি না।
যদি দেখা যায়, একই ধরনের যোগ্যতার ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও একজন আবেদনকারী বাদ পড়েছেন, অথচ অন্যজন অনুমোদন পেয়েছেন; যদি নথিতে ঘাটতি থাকা সত্ত্বেও কারও তদন্ত প্রতিবেদন ইতিবাচক হয়; কিংবা কোনো আবেদনকারীর ক্ষেত্রে নিয়ম প্রয়োগে ব্যতিক্রম করা হয়, তাহলে সেই সিদ্ধান্তের লিখিত ব্যাখ্যা দিতে হবে।
সংসদ সদস্য জনগণের প্রতিনিধি, নিয়োগপ্রক্রিয়ার ঊর্ধ্বে থাকা কোনো কর্তৃত্ব নন। প্রশাসনের কর্মকর্তারাও কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তির ইচ্ছার বাস্তবায়নকারী নন; তাঁরা আইন ও বিধিমালার কাছে দায়বদ্ধ।
রাজনৈতিক সুপারিশ যদি যোগ্যতার বিকল্প হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে মেধা ও নিয়মের মূল্য কোথায় থাকবে?
২০০ টাকায় কাটা টিনের ঘর আর ডিলারশিপের বাস্তবতা
শিরোনামের ‘২০০ টাকায় কাটা টিন’ কথাটি এখানে প্রতীকীভাবে উঠে এসেছে এমন এক নিয়োগব্যবস্থার প্রশ্ন হিসেবে, যেখানে বাস্তব অবকাঠামো ও সক্ষমতার চেয়ে কাগজে-কলমে যোগ্যতা দেখানোই বড় হয়ে ওঠার অভিযোগ রয়েছে।
কিন্তু ইউরিয়া সারের ডিলারশিপ কোনো নামফলক ঝোলানোর ব্যবসা নয়। এটি কৃষকের উৎপাদন, ফসলের মৌসুম এবং স্থানীয় সার সরবরাহের সঙ্গে সরাসরি সম্পর্কিত একটি দায়িত্বশীল কার্যক্রম। একজন ডিলারের পর্যাপ্ত সংরক্ষণব্যবস্থা, আর্থিক সক্ষমতা ও নিয়ম মেনে সার বিতরণের ব্যবস্থা না থাকলে তার প্রভাব পড়তে পারে কৃষকের ওপর।
কৃষক যখন সময়মতো সার পান না, তখন তাঁর শুধু অর্থনৈতিক ক্ষতি হয় না; ক্ষতিগ্রস্ত হয় ফসলের উৎপাদন পরিকল্পনা, শ্রম ও সারা বছরের প্রত্যাশা। অথচ ডিলার নিয়োগের সময় যদি কৃষকের প্রয়োজনের চেয়ে প্রভাবশালী মহলের সুবিধা বড় হয়ে ওঠে, তাহলে সেই ব্যবস্থার উদ্দেশ্য নিয়েই প্রশ্ন দেখা দেয়।
আইন কি শুধু সাধারণ মানুষের জন্য?
আমাদের দেশে সাধারণ মানুষ একটি সনদ পেতে, একটি আবেদন অনুমোদন করাতে কিংবা ছোটখাটো কোনো প্রশাসনিক কাজ সম্পন্ন করতে গিয়ে নানা নিয়মের মুখোমুখি হন। একটি কাগজের ঘাটতিতে তাঁর আবেদন বাতিল হতে পারে, একটি ভুলের কারণে তাঁকে বারবার দপ্তরে ঘুরতে হতে পারে। অথচ সরকারি সুযোগ-সুবিধা বণ্টনের মতো গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রে যদি নিয়মের প্রয়োগে বৈষম্যের অভিযোগ ওঠে, তাহলে সাধারণ মানুষের মনে সন্দেহ জন্মানো স্বাভাবিক।
আইনের শাসনের অর্থ হলো, ক্ষমতাবান ও সাধারণ নাগরিক—সবার জন্য একই বিধি কার্যকর থাকা। পদ, পরিচয়, রাজনৈতিক আনুগত্য কিংবা ব্যক্তিগত যোগাযোগ কারও জন্য বিশেষ ছাড়ের নিশ্চয়তা হতে পারে না।
রাষ্ট্রের আইন যদি দুর্বল মানুষের ওপর কঠোর হয়, অথচ ক্ষমতার কাছাকাছি থাকা মানুষের ক্ষেত্রে নমনীয় হয়ে পড়ে, তাহলে আইন কাগজে থাকলেও ন্যায়বিচারের ভিত্তি দুর্বল হয়ে যায়।
এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ পুনঃযাচাই
ইউরিয়া সারের ডিলার নিয়োগ নিয়ে ওঠা অভিযোগের নিষ্পত্তি বক্তব্য বা পাল্টা বক্তব্যে সম্ভব নয়। প্রয়োজন নথিভিত্তিক তদন্ত এবং জনসম্মুখে জবাবদিহি। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে কয়েকটি প্রশ্নের উত্তর প্রত্যাশিত—
১. ২০২৫ সালের বিজ্ঞপ্তি থেকে ২০২৬ সালের সংশোধিত বিজ্ঞপ্তিতে ঠিক কোন কোন শর্ত পরিবর্তন করা হয়েছে?
২. চূড়ান্তভাবে নির্বাচিত প্রত্যেক আবেদনকারী সংশোধিত বিজ্ঞপ্তির বাধ্যতামূলক শর্ত পূরণ করেছেন কি না?
৩. আয়কর রিটার্ন, গুদামসংক্রান্ত দলিল, আর্থিক সক্ষমতা ও অন্যান্য যোগ্যতার নথি কীভাবে যাচাই করা হয়েছে?
৪. সরেজমিন তদন্তে কারা দায়িত্ব পালন করেছেন এবং তাঁদের প্রতিবেদনে কী তথ্য উঠে এসেছে?
৫. রাজনৈতিক সুপারিশ বা প্রভাবের অভিযোগের সত্যতা যাচাইয়ে কোনো স্বাধীন পর্যালোচনা হয়েছে কি না?
৬. কোনো আবেদনকারীকে নিয়মবহির্ভূত সুবিধা দেওয়ার প্রমাণ পাওয়া গেলে সেই সিদ্ধান্ত পুনর্বিবেচনা ও দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হবে কি না?
প্রয়োজনে সংশ্লিষ্ট নথি যাচাই করে নিরপেক্ষ পুনঃতদন্ত করতে হবে। তবে অভিযোগ প্রমাণিত হওয়ার আগে কোনো ডিলারকে অনিয়মকারী ঘোষণা করা যাবে না। একইভাবে, অভিযোগের গুরুত্ব বিবেচনা না করে সবকিছু নিয়মমাফিক হয়েছে বলে ধরে নেওয়াও দায়িত্বশীলতার পরিচয় নয়।
শেষ কথা
সারের ডিলারশিপ কোনো রাজনৈতিক পুরস্কার নয়, কোনো ব্যক্তির প্রতি অনুগ্রহও নয়। এটি কৃষকের প্রয়োজন পূরণ এবং কৃষি উৎপাদনব্যবস্থা সচল রাখার দায়িত্ব। এখানে যোগ্যতার মানদণ্ড হতে হবে বিধিমালা, সিদ্ধান্তের ভিত্তি হতে হবে যাচাই করা তথ্য, আর জবাবদিহির কেন্দ্রবিন্দুতে থাকতে হবে জনস্বার্থ।
যদি ২০০ টাকায় কাটা টিনের ঘরের মতো নামমাত্র অবকাঠামো দেখিয়েই কেউ যোগ্যতা অর্জন করে থাকেন, তাহলে সেই নিয়োগের বৈধতা ও যথার্থতা যাচাই করা জরুরি। আর যদি এসব অভিযোগের ভিত্তি না থাকে, তাহলে তথ্য-প্রমাণ প্রকাশ করে সংশ্লিষ্টদের অবস্থান পরিষ্কার করা উচিত।
আমরা কাউকে অন্যায়ভাবে অভিযুক্ত করতে চাই না; আমরা চাই, অন্যায় হয়ে থাকলে তার বিচার হোক। আমরা কারও ডিলারশিপ কেড়ে নেওয়ার দাবি তুলছি না; আমরা চাই, নিয়োগের প্রতিটি সিদ্ধান্তের পেছনে আইনসম্মত যুক্তি থাকুক।
কারণ রাষ্ট্র কোনো রাজা-বাদশার ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়। সরকারি সুযোগ-সুবিধা জনগণের সম্পদ, আর তার বণ্টন জনগণের স্বার্থেই হতে হবে।
প্রশ্নটি তাই শুধু কে ইউরিয়া সারের ডিলারশিপ পেলেন, তা নয়; প্রশ্ন হলো—কে কোন যোগ্যতায় পেলেন, কারা যাচাই করলেন এবং সেই সিদ্ধান্তের জবাব কে দেবেন?
এই প্রশ্নের উত্তর যত দিন অস্পষ্ট থাকবে, তত দিন নিয়োগপ্রক্রিয়ার স্বচ্ছতা নিয়ে বিতর্ক থামবে না। কৃষকের অধিকার ও আইনের শাসনের স্বার্থে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে সেই উত্তর দিতেই হবে।
লেখক কলামিস্ট মানবাধিকার কর্মী রাজনৈতিক বিশ্লেষক গবেষক সরিষাবাড়ি জামালপুর।