বান্দরবানের আলীকদম উপজেলার মিয়ানমার সীমান্তবর্তী ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউনিয়নের মানুষ এখনো আধুনিক নাগরিক সেবার বড় অংশ থেকে বঞ্চিত। মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধার সংকট, বিদ্যুতের অপ্রতুলতা, ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল সেন্টার না থাকা এবং নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয়ের অভাবে সরকারি সেবা নিতে চরম দুর্ভোগ পোহাচ্ছেন দুর্গম এই জনপদের বাসিন্দারা।
স্থানীয়দের অভিযোগ, দেশের বিভিন্ন প্রত্যন্ত অঞ্চলেও যখন ডিজিটাল প্রযুক্তির ব্যবহার বাড়ছে এবং সরকারি সেবাগুলো অনলাইনে দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে, তখন কুরুকপাতার অনেক এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধাই নেই। ফলে জন্মনিবন্ধন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আবেদন, অনলাইন আবেদন, তথ্য যাচাইসহ বিভিন্ন নাগরিক সেবা পেতে তাঁদের ইউনিয়নের বাইরে যেতে হয়।
স্থানীয় বাসিন্দা মেসা ম্রো ও অর্জন ত্রিপুরা বলেন, কুরুকপাতার প্রত্যন্ত পাহাড়ি এলাকাগুলোতে নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট না থাকায় অনলাইনভিত্তিক সরকারি সেবা নেওয়া প্রায় অসম্ভব। বিশেষ করে বয়স্ক, বিধবা ও মাতৃত্বকালীন ভাতাসহ বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির আবেদন করতে তাঁদের অতিরিক্ত সময় ও অর্থ ব্যয় করতে হয়।
ইউনিয়ন পর্যায়ে ডিজিটাল সেন্টার না থাকায় অনেক বাসিন্দাকে এসব সেবা নিতে আলীকদম উপজেলা সদরে যেতে হয়। দুর্গম পাহাড়ি পথের কারণে কোনো কোনো এলাকা থেকে উপজেলা সদরের দূরত্ব ৭০ থেকে ৮০ কিলোমিটার পর্যন্ত। এতে যাতায়াতের সময় ও খরচ দুটিই বাড়ছে। দুর্গম সড়কের কারণে যানবাহনের ভাড়াও তুলনামূলক বেশি বলে জানান স্থানীয়রা।
কুরুকপাতা ইউপি সদস্য জগৎ চন্দ্র ত্রিপুরা ও কাম্পুক ম্রো বলেন, ইউনিয়নে কার্যকর ও স্থায়ী প্রশাসনিক অবকাঠামো না থাকায় নাগরিক সেবা আরও জটিল হয়ে পড়েছে। বিদ্যুৎ ও ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে প্রযুক্তিনির্ভর সরকারি সেবায়ও যথাযথ গতি আনা যাচ্ছে না।
ইউনিয়নের ৪ নম্বর কুরুকপাতা ইউপি চেয়ারম্যান ক্রাতপুং ম্রো বলেন, ‘আমাদের ইউনিয়ন এলাকায় মোবাইল নেটওয়ার্ক বা ইন্টারনেট সুবিধা নেই। এমনকি ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব কার্যালয়ও নেই। বর্তমানে আলীকদম সদর ইউনিয়ন এলাকায় একটি ভাড়া করা কক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের সব কার্যক্রম পরিচালনা করতে হচ্ছে।’
তিনি বলেন, দুর্গম এলাকার মানুষের নাগরিক সেবা নিশ্চিত করতে হলে দ্রুত ইউনিয়নে নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা চালু, বিদ্যুৎ সরবরাহ এবং একটি স্থায়ী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নির্মাণ প্রয়োজন।
ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি শিক্ষাক্ষেত্রেও পিছিয়ে রয়েছে কুরুকপাতা ইউনিয়ন। ইউনিয়নে কোনো মাধ্যমিক বিদ্যালয় না থাকায় প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর শিক্ষার্থীদের পড়াশোনার জন্য দূরের এলাকায় যেতে হয়।
কুরুকপাতা সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক মো. আবু শামা বলেন, দুর্গম যোগাযোগব্যবস্থা ও বাড়তি খরচের কারণে অনেক পরিবারের পক্ষে সন্তানদের দূরে রেখে পড়াশোনা করানো কঠিন। ফলে অনেক শিক্ষার্থী প্রাথমিক শিক্ষা শেষ করার পর আর নিয়মিত পড়াশোনা চালিয়ে যেতে পারে না।
তিনি আরও বলেন, ইন্টারনেট সুবিধার অভাবে শিক্ষার্থীরা অনলাইন শিক্ষা, ডিজিটাল শিক্ষাসামগ্রী ও তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর শিক্ষার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছে। দেশের অন্যান্য এলাকার শিক্ষার্থীরা যেখানে সহজেই এসব সুবিধা পাচ্ছে, কুরুকপাতার শিক্ষার্থীদের কাছে তা এখনো অনেকটা দুর্লভ।
যোগাযোগ ও প্রযুক্তিগত অবকাঠামোর ঘাটতির প্রভাব পড়ছে স্বাস্থ্যসেবায়ও। জরুরি স্বাস্থ্যসংক্রান্ত তথ্য, চিকিৎসকের পরামর্শ কিংবা অনলাইনভিত্তিক স্বাস্থ্যসেবা পাওয়ার সুযোগ সীমিত। দুর্গম এলাকার বাসিন্দাদের চিকিৎসার জন্যও অনেক দূরে যেতে হয়।
স্থানীয়দের মতে, ভৌগোলিকভাবে কুরুকপাতা দুর্গম হলেও এখানকার মানুষ দেশের অন্যান্য এলাকার নাগরিকদের মতোই সরকারি সেবা পাওয়ার অধিকার রাখেন। কিন্তু প্রয়োজনীয় অবকাঠামোর অভাবে তাঁরা সেই অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।
কুরুকপাতা ইউনিয়নের বাসিন্দারা দ্রুত মোবাইল নেটওয়ার্ক ও ইন্টারনেট সুবিধা সম্প্রসারণের পাশাপাশি একটি পূর্ণাঙ্গ ডিজিটাল সেন্টার, বিদ্যুৎ সংযোগ এবং ইউনিয়ন পরিষদের নিজস্ব স্থায়ী কার্যালয় স্থাপনের দাবি জানিয়েছেন।
একই সঙ্গে ইউনিয়নে অন্তত একটি মাধ্যমিক বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠা, স্বাস্থ্যসেবার উন্নয়ন এবং ডিজিটাল প্রযুক্তির মাধ্যমে সরকারি ও স্বাস্থ্যসেবা নিশ্চিত করার দাবি তাঁদের।
স্থানীয়দের ভাষ্য, দুর্গমতার কারণে কোনো জনপদ নাগরিক সেবা থেকে পিছিয়ে থাকতে পারে না। সরকারের ডিজিটাল সেবার সুফল পাহাড়ের প্রত্যন্ত মানুষের কাছে পৌঁছে দিতে কুরুকপাতার মতো দুর্গম ইউনিয়নগুলোতে অগ্রাধিকার ভিত্তিতে যোগাযোগ, বিদ্যুৎ ও ডিজিটাল সেবা অবকাঠামো গড়ে তোলা জরুরি।