চট্টগ্রাম প্রতিদিন

উদ্যেক্তা তৈরীর নামে ভুয়া হারবাল প্রোডাক্টের মার্কেটিং করছে জিএমআইটি

এমএলএম ব্যবসার প্রতারনা সম্পর্কে বাংলাদেশের বেশীরভাগ মানুষ সবাই জানে। গত দশকে মার্কেটিং মাল্টিলেভেল খাত , পরিবহন খাত ও আবাসন খাতের এমএলএম কোম্পানীর লোভনীয় অফারের প্রায় ৮২টা এমএলএম প্রতিষ্ঠানের প্রতারনার ফাদ ধরা পরার পর বন্ধ হয়ে গেছে। অনেক উদ্যক্তা এম এল এমের কথা বলে রাতারাতি যুব সমাজকে কোটিপতি বানানোর লোভ দেখিয়ে দেশের টাকা হাতিয়ে নিয়ে বিদেশে পাড়ি জমিয়েছে। আবার অনেকে একটা এমএলএম কোম্পানী বন্ধ হলে আরেকটা নতুন নাম খুলে প্রতারনার নতুন বাজার বসিয়েছে। বাংলাদেশে ইউনিপে, স্পিক এশিয়া, সি, এম এস ইন্টারন্যাশনাল, বিডিলিংক সিস্টেম, ডেসটিনিসহ কয়েকটি নামকরা প্রতিষ্ঠানের পতনের পর সেসব প্রতিষ্ঠানের লিডাররা নতুন নাম দিয়ে গোপনে যুব সমাজকে উদ্ধুদ্ধ করে পুনরায় এব্যবসা খুলে বসেন। চট্টগ্রামে এখনো কয়েকটি এমএলএম ব্যবসায়ীরা উদ্যক্তা তৈরীর করার নামে ভিন্ন নাম দিয়ে প্রতারনার এই প্রতিষ্ঠান খুলে ব্যবসা করছে। তাদের প্রতিষ্ঠানগুলোতে উদ্যক্তা তৈরীর করার চেয়ে সস্তা বিক্রেতা তৈরী করে দ্রুত কোটিপতি হওয়ার লোভ দেখিয়ে মুলত পন্য বিক্রিতে লাগিয়ে দেয়। মধ্যস্বত্বভোগী হিসাবে কর্মিদের কয়েকটি লেভেলে প্রতিটি পন্য থেকে কমিশন বন্টন করে। এতে ভোক্তা পর্যায়ে তাদের হারবাল প্রোডাক্টের দাম অনেক বেড়ে যায়। বছর কয়েক আগে মিশন টেন, এনেক্সসহ কয়েকটি এম এল এম কোম্পানী যুব সমাজকে আশ্রয় করে বিভিন্ন কোম্পানীর ভুয়া প্রোডাক্ট ও নিজেদের তৈরী প্রোডাক্টগুলো তাদের দিয়ে বিক্রি করাতো। সে প্রতিষ্ঠানগুলো বন্ধ হওয়ার পর নতুনভাবে এলিট কর্পোরেশনের মালিক ইসমাইল ও জিএমআইটির চেয়ারম্যান কামরুল কায়েস দুজনে অনলাইন বিক্রেতাদের উদ্যক্তা হিসাবে চিহ্নিত করে মুলত এলিট কর্পোরেশনের ভুয়া পন্য জিএমআইটির সদস্যরা বিক্রি করছে বলে অভিযোগ জানান ভোক্তভোগী কয়েকজন। চট্টগ্রামে তারা কয়েকজন সিন্ডিকেট করে যুব সমাজ, ছাত্র ছাত্রি ও বেকারদের রাতারাতি কোটিপতি হওয়ার লোভ দেখিয়ে গোপন অফিস করে তাদের মাধ্যমে বিক্রি করে। তাদের সাইনবোর্ড বিহীন গোপন অফিসের কয়েকজন প্রতিবেদককে বলেন, এই প্রতিষ্ঠানের ডিরেক্টর প্যানেলে রয়েছেন হাটহাজারীর নাজাতুল আলম জিসান, ব্যাটারী গল্লির জাবেদ সিদ্দিকী নীল। ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসাবে বাশখালীর আইয়্যুব হেলালী, আবু নাঈম, আলী আজম তাসকিন, ইমন শাহরিয়ার নাছের, ইফতেখার ইফতি নেতৃত্ব দিচ্ছেন। উদ্যক্তা তৈরী ও উৎপাদনকারী প্রতিষ্ঠান হিসাবে  জিএমআইটি (ডিসিডি বা উদোক্তা বা ইকর্মাস বা আইটি সেন্টার) পরিচয় দিলেও এমএলএম সিস্টেমে যুব সমাজ, এসএসসি ও এইচএসসি বয়সের ছাত্রছাত্রিদের প্রতারণার ইদুর ফাদে ফেলে বিসিএসআইআরের টেষ্ট সার্টিফিকেটকে পূজী করে ড্রাগ ও বিএসটিআই অনুমোদনহীন লোভনীয় নামে অকার্যকর হারবালসহ সেক্স আইটেম বিক্রি করছে বলে জানান সেখানে কয়েকজন কর্মরত ও সাধারণ ভোক্তারা।

সরেজমিনে জানা যায়, জিএমআইটির আইটি ইন্সিটিউট হিসাবে নিবন্ধন দেখা গেলেও আইটি ছাত্র গড়ার নামে মুলত তারা এলিট কর্পোরেশনের সাইনবোর্ড বিহীন ছদ্ম অফিস ব্যবহার করে বেকার ও সদ্য এসএসসি, এইচএসসি কলেজ পড়ুয়া ছাত্রছাত্রীকে টার্গেট করে উদোক্তা তৈরী করার নামে তাদের দিয়ে অনলাইন মার্কিটিংয়ের মাধ্যমে এলির্ট করপোরেশনের ভুয়া হারবাল প্রোডাক্ট বিক্রি করাচ্ছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সেখানে কর্মরত কয়েকজন জানান,  বিভিন্ন ট্রেনিং এর মধ্যমে শেখানো হয় কিভাবে সেক্স প্রোডাক্টসহ মোটা তাজা, লম্বা হবার প্রোডাক্টগুলো মানুষের কাছে বিশ্বাস যোগ্য করে তুলে বিক্রি করতে হয়।

প্রতিবেদকের হাতে তাদের আকর্ষনীয় মোড়কে করা কিছু প্রোডাক্ট এসেছে। যা ওজন বাড়ানোর জন্য মিল্কসেক, বাদাম সেক, মালাই সেক ও ওজন কমানোর জন্য স্লিমিং ট্রি, কেটো গ্রীন, লেমন জুসি, ব্লু- গ্রীন সেইসাথে লোভনীয় বিভিন্ন সেক্সুয়াল হারবাল প্রোডাক্ট ‘লাভ ফর ইভার’  লম্বা হওয়ার জন্য হাইট গ্রোথ প্লাস সম্প্রতি ভুয়া প্রোডাক্ট বিক্রি করছে প্রতিষ্ঠানটি। প্রোডাক্টের আকর্ষনীয়তা বাড়াতে প্রতিষ্ঠানটি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম টিকটক, ফেসবুক ও ইউটিউব সেলিব্রিটিদের দিয়ে লোভনীয় বিজ্ঞাপন তৈরী করে বিভিন্ন হেলথ্ রিলেটেড নাম দিয়ে পেজ খুলে বুষ্টিং করে ক্রেতাদের আকর্ষিত করে। তাদের প্রোডাক্টগুলো আন্তর্জাতিক মানের প্রোডাক্ট বলে তারা প্রচার করে।  প্রোডাক্টের  উপাদানগুলো আমেরিকার সিকাগো থেকে আসে বলে এমন ভুয়া প্রচারণা ছড়াচ্ছে। ক্রেতাদের কাছে প্রোডাক্টের বিশ্বাস যোগ্যতা বাড়াতে তাদের তৈরী করা ফেইক রিভিউ কাস্টমারকে শো করে এবং তাদের প্রডাক্টগুলো  বি এস টি আই ও বাংলাদেশ সাইন্স ল্যাব কতৃক পরীক্ষিত ও অনুমোদন প্রাপ্ত বলে প্রচারণা  ছড়িয়ে প্রমাণ স্বরুপ কাস্টমারের ইনবক্সে টেস্ট রির্পোট পেশ করে।

এলিট কর্পোরেশনের আকর্ষনীয় পন্যগুলোর বিসিএসআইআর টেষ্ট রির্পোটগুলো পর্যালোচনায় দেখা যায় যার প্রতিটা পন্যর টেষ্ট রিপোর্ট একই। তাদের সব রিপোর্টে আয়রন, ক্যালসিয়াম, প্রোটিন ও এনর্জির কথা উল্লেখ করা আছে। প্রশ্ন হলো ওজন বাড়ানো জন্য যে পুষ্টি উপাদান প্রয়োজন ওজন কমানোর ক্ষেত্রে কি একই পুষ্টি উপাদান ব্যবহার হয়? অথবা সেক্সুয়াল প্রোডাক্টের ক্ষেত্রেও একই পুষ্টি উপাদান কতটুকু ভুমিকা রাখে??

বিসিএসআইআর পরিচালক ড. বরুন কান্তি সাহা বলেন, প্রথমত  আমরা কোনো  প্রোডাক্টের অনুমোদন দেই না যদি কেউ বা কোনো প্রতিষ্ঠান প্রচার করে থাকে যে তাদের প্রোডাক্ট আমাদের থেকে অনুমোদন প্রাপ্ত তাহলে কথাটা সম্পূর্ণ মিথ্যে। আমরা শুধু প্রোডাক্টের স্যাম্পল পরীক্ষা করি। এলিট কর্পোশনের টেষ্ট রির্পোটগুলো দেখালে তিনি বলেন প্র্রতিটি রির্পোটই অনেক পুরোনো। এই রির্পোট গুলোর মেয়াদ সর্বোচ্ছ ত্রিশ দিন তাও আবার একটা বেইস এর ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। যেহেতু তারা একাদিক বেইসে একটাই সার্টিফিকেট ব্যাবহার করছে তাই বলা যায় এই রিপোর্টগুলো ভুয়া। এই রির্পোট গুলো ব্যানিজিক কাজে ব্যাবহারে কোনো নিয়ম নেই। এলির্ট কর্পোশন আইন অমান্য করে বাণিজ্যক কাজে এটি ব্যাবহার করছে।

বিসিএসআইআর ও সিটি কর্পোরেশনের দেয়া ট্রেড লাইসেন্সের দেওয়া ঠিকানায় গিয়ে দেখা যায় এলির্ট করর্পোশনের কোনো অফিস নেই উক্ত ঠিকানায়। শহরের বিভিন্ন জায়গায় তাদের ছদ্ম অফিসগুলোতে কোনরুপ সাইনবোর্ড নেই। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ও তাদের মোবাইলের মাধ্যমেই দেশের প্রত্যক ভোক্তা বা বিক্রেতাদের উদ্বুদ্ধ করা হয়। সেই ছদ্ম অফিসে প্রোডাক্টগুলো রাখা হয়না। তাদের নিজস্ব গোডাউন থেকে প্রোডাক্টগুলো মোবাইল এপসের মাধ্যমে বিভিন্ন জেলার গ্রাহকের ঠিকানা নিয়ে কুরিয়ারে পাঠিয়ে দেয়া হয়। এই বিষয়ে স্থানীয়দের থেকে জানতে চাইলে তারা বলে গত ২ মাস আগে ৯নং ওয়ার্ড, পশ্চিম কুয়াইশে, চৌধুরী বাড়িতে এখানে একটা হারবাল পন্য বানানোর ফ্যাক্টরি ছিল এবং এখানে বিভিন্ন হারবাল প্রোডাক্ট তৈরী করা হতো কিন্তু প্রায় দেড় মাস আগে অভিযান করে মেজিষ্ট্রেট এসে ফ্যাক্টোরিটি বন্ধ করে দেয়। ফ্যাক্টরীটি এখানে বন্ধ হলেও জানা যায় বিভিন্ন জায়গায় এখনো গোপন ফ্যাক্টরী করে প্রোডাক্টগুলো নির্মান করছে। গত আগষ্টের ৪ তারিখ ২০২৩ইং  আইয়্যুব হেলালীসহ ৭ জনের বিরুদ্ধে ভেজাল ঔষধ ও ভেজাল প্রসাধনী সামগ্রী বিক্রির দায়ে মহানগর গোয়েন্দা(উত্তর ও দক্ষিন) মামলা করেন। সিএন্ডবি কলোনীর বিপরীত পাশের অফিস থেকে তাদেরকে গ্রেফতার করেন। 

এ বিষয়ে জিএমআইটির ব্যবস্থাপনা পরিচালক কামরুল কায়েসের মুঠোফোনে ফোন দিলে তার মোবাইল বন্ধ পাওয়া যায়।

জিএমআইটির প্রতিষ্ঠানের মানিক বলেন, আমরা উদ্যক্তা হতে এসেছিলাম। এখানে এসে দেখি ভুয়া প্রোডাক্টের বিক্রয় কর্মী। প্রতিষ্ঠানের চেয়ারম্যানের নম্বর চাইলে সে বলেন, তিনিতো ধরা ছোয়ার বাইরে থাকেন। কারন জিএমআইটিকে আইটি সেন্টার বলা হলেও তা আসলে আইটি সেন্টার নয়। এটা প্রোডাক্ট বিক্রয় বেস। তাই তিনি কারু সাথে ধরা দেন না। আমরা যে এই প্রতিষ্ঠানের কর্মি সে হিসাবেও কোন ডকুমেন্ট দেয়া হয়না।

ম্যানেজিং ডিরেক্টর হিসাবে পরিচিত আইয়্যুব হেলালীকে ফোন দিলে তিনি বলেন, আমি আগে ছিলাম। এখন এই প্রতিষ্ঠানের সাথে নাই। আমার সাথে প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজমেন্টের সাথে জামেলা হয়েছে। জিএমআইটি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি যা বলার প্রশাসনকে বলেছি। বাকিটা আপনার সাথে সাক্ষাতে বলবো। তিনি প্রতিষ্ঠানের ম্যানিজিং ডিরেক্টর কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, আমি ডাইরেক্টর ছিলাম। ম্যানেজিং ডাইরেক্টর মুলত জাবেদ নামে এক লোক। 

ষোলকবহর ৮নং ওয়ার্ডের কাউন্সিলর মোরশেদ আলমকে জিএমআইটির উপদেষ্টা হিসাবে জড়িত আছেন কিনা এবিষয়ে প্রশ্ন করা হলে তিনি বলেন, আমি উপদেষ্টা নই। আমি জানি তারা আইটি প্রতিষ্ঠান করে উদ্যক্তা তৈরী করছে। যদি তার ব্যানারে উদ্যক্তার নামে বিক্রেতা তৈরী করে বা এলিট কর্পোরেশনের নাম দিয়ে লোভনীয় হারবাল প্রোডাক্ট বিক্রি করছে তা আমি জানিনা। যদি সঠিক হয় তবে তাদের বিরুদ্ধে দ্রুত প্রশাসন আইনানুগ ব্যবস্থা নিবে।



সম্পর্কিত খবর