ঢাকা

আওয়ামীপন্থী চিকিৎসকদের দখলে টাঙ্গাইলের স্বাস্থ্য খাত

ব্যাপক গণআন্দোলনের মুখে আওয়ামী লীগ সরকারের পতনের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও টাঙ্গাইলের স্বাস্থ্য খাত এখনো আওয়ামীপন্থী স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) চিকিৎসকদের হাতে জিম্মি রয়েছে।

জেলার সিভিল সার্জনের কার্যালয়, মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল, ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স এবং ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রসহ সব সরকারি হাসপাতালে আওয়ামীপন্থী পেশাজীবী সংগঠন স্বাচিপের আধিপত্য ও প্রভাব বিদ্যমান। এর ফলে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (ড্যাব) সদস্যরা কোণঠাসা হয়ে পড়েছেন।

পুরোনো আওয়ামীপন্থী সিন্ডিকেটের মাধ্যমেই এখনো নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছে ওষুধের টেন্ডার। স্বেচ্ছাচারিতা, অনিয়ম আর সিন্ডিকেটের মারফত উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের বিরুদ্ধে এমএসআর (MSR) টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের গুরুতর অভিযোগও রয়েছে।

সম্প্রতি ঘাটাইল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ২৫ বস্তা মেয়াদোত্তীর্ণ ওষুধ নদীতে ফেলে দেওয়ার সময় জনতার হাতে ধরা পড়েন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। গণমাধ্যমে বিষয়টি প্রকাশ পেলে এ নিয়ে রীতিমতো তোলপাড় শুরু হয় এবং নড়েচড়ে বসেন স্বাস্থ্য বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা।

ওষুধকাণ্ডের এই ঘটনায় উপজেলা স্বাস্থ্য ও পরিবার-পরিকল্পনা কর্মকর্তা ও স্বাচিপ সদস্য আবু নঈম মোহাম্মদ সোহেলকে ওএসডি করা হয়। পাশাপাশি অধিকতর তদন্তের জন্য তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটিও গঠন করা হয়েছে।

জানা গেছে, টাঙ্গাইল জেলায় একটি মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল, একটি ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল, ১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স ও ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্র রয়েছে।

আওয়ামী শাসনামলে প্রায় ১৫ বছর ধরে এসব হাসপাতালের চিকিৎসক নিয়োগ ও বদলির ক্ষেত্রে স্বাচিপের সদস্যপদই ছিল যোগ্যতার প্রধান মাপকাঠি।

টাঙ্গাইলের বর্তমান সিভিল সার্জন ফরাজী মো. মাহবুবুল আলম মঞ্জু স্বাচিপের আজীবন সদস্য। গত বছরের ৯ মার্চ তিনি টাঙ্গাইলে যোগদান করেন। এ ছাড়া ডেপুটি সিভিল সার্জন মুহাম্মদ আজিজুল হকও স্বাচিপের সদস্য।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ১১৭ জন চিকিৎসকের বেশিরভাগই স্বাচিপের সদস্য। ২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর উপপরিচালক পদে স্বাচিপের দুই সদস্য কামরুল কিবরিয়া ও সহকারী পরিচালক পদে মারুফ আহমেদ খান যোগদান করেন। উপজেলা স্বাস্থ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে ১২ উপজেলার মধ্যে ৯ জনই আওয়ামী সরকারের আমলে নিয়োগ পান। যাদের প্রায় সবাই স্বাচিপ সদস্য বা দলটির সুবিধাভোগী।

২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ৪৮ জন চিকিৎসক, কর্মকর্তা ও কর্মচারীর তালিকা প্রকাশ করে বৈষম্যবিরোধী চিকিৎসক সমাজ। জুলাই গণবিপ্লবের বিরোধিতা ও গণহত্যায় মদদ দেওয়ার অভিযোগ আনা হয় তাদের বিরুদ্ধে। এই তালিকার কয়েকজনের বদলি হলেও বাকিরা এখনো গুরুত্বপূর্ণ পদে বহাল রয়েছেন।

১২টি উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে অনুমোদিত ৪৫০টি পদের মধ্যে শূন্যপদ ১৭৭টি। পদায়ন করা ২৭৩ জনের মধ্যে বেশিরভাগই আওয়ামীপন্থী সুবিধাভোগী। ৫ আগস্টের পরে যে ১৪৫ জনের পদায়ন করা হয়, তার মধ্যেও প্রাধান্য পায় আওয়ামী সুবিধাভোগীরা।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের ৭৯০টি অনুমোদিত পদের বিপরীতে কর্মরত আছেন ৬৩ জন চিকিৎসক এবং ২৫০ শয্যাবিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতালের ৮৭ জনের বিপরীতে রয়েছেন ৫৪ জন চিকিৎসক। এ ছাড়া ১১১টি উপস্বাস্থ্য কেন্দ্রের ৩৯টি পদ শূন্য রয়েছে। এখানকার চিকিৎসকদের অধিকাংশই আওয়ামী পরিবারের সদস্য বা সুবিধাভোগী।

এ প্রসঙ্গে ড্যাবের টাঙ্গাইল জেলা শাখার সভাপতি আব্দুল মতিন বলেন, "জেলার চিকিৎসা ক্ষেত্র এখনো স্বাচিপ ও আওয়ামী সুবিধাবাদী চিকিৎসকদের দখলে। নানা অনিয়ম-দুর্নীতি চলছে আগের মতোই। শূন্যপদে আওয়ামী দুঃশাসনে হয়রানি ও নির্যাতনের শিকার চিকিৎসকদের পদোন্নতি ও পদায়নের সুযোগ রয়েছে। বিষয়টি ঊর্ধ্বতন মহলের নজরে আনা হয়েছে।"

এদিকে জেলার ১২টি উপজেলার মধ্যে মির্জাপুর, দেলদুয়ার, নাগরপুর, ভূঞাপুর, গোপালপুর, ধনবাড়ী ও সখিপুর উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের মেডিকেল, সার্জিক্যাল অ্যান্ড রিকোজিট টেন্ডারে অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব উপজেলায় সিন্ডিকেটের মাধ্যমে পাবলিক প্রকিউরমেন্ট বিধিমালার বহির্ভূত শর্ত আরোপ করে টেন্ডার নিয়ন্ত্রণের অভিযোগ রয়েছে।

জেলা সিভিল সার্জন ফরাজী মো. মাহবুবুল আলম মঞ্জু বলেন, "ঘাটাইল স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সের ওষুধকাণ্ডের ঘটনায় সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাকে ওএসডি এবং তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। উপজেলার টেন্ডারে অনিয়ম প্রমাণিত হলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।" তবে তিনি নিজে স্বাচিপের সদস্য নন বলেও দাবি করেন।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালের পরিচালক মোহাম্মদ আব্দুল কুদ্দুস অভিযোগ খণ্ডন করে বলেন, "টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতালে সরকার যাকে পোস্টিং দিয়েছে, তিনি চাকরি করছেন। এখানে কে স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের আর কে ডক্টরস অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সদস্য, তা দেখবে সরকার। এটা সম্পূর্ণ নীতিগত বিষয়।"

৫ আগস্টের পর রাজনৈতিক পটপরিবর্তন হলেও টাঙ্গাইলের স্বাস্থ্য খাতে স্বাচিপের আধিপত্য এখনো ভাঙেনি। মেধা ও যোগ্যতার ভিত্তিতে পদায়ন এবং অনিয়ম-দুর্নীতি রোধে কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন ভুক্তভোগী চিকিৎসক ও সাধারণ মানুষ।

 


সম্পর্কিত খবর