জাতীয়

কুষ্টিয়ায় কৃষি বিপণন মাঠ কর্মকর্তা রাসেলের বিরুদ্ধে দুর্নীতির ব্যাপক অভিযোগ

জেলার কুমারখালী ও খোকসা উপজেলায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের মডেল ঘর নির্মাণে ব্যাপক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে কৃষি কর্মকর্তা রাসেলের বিরুদ্ধে । সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তা ও ঠিকাদার  মিলে প্রতিটি ঘরের অর্ধেক বরাদ্দ হাতিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। শুধু তাই নয়, প্রকৃত যোগ্য কৃষকদের বাদ দিয়ে টাকার বিনিময়ে স্বজনপ্রীতি করে কৃষকদের ঘর বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে।কুমারখালীতে ১৫ টা ও খোকসাতে ২০ টা ঘর বরাদ্ধে স্বজনপ্রীতি ও দুর্নীতি অভিযোগ পাওয়া গেছে। তবে যারা এই মডেল ঘর পেয়েছেন, তাদের অনেকের ঘরের নির্মাণ এখনো শেষ হয়নি। অথচ পেঁয়াজ উঠানো শেষ হয়েছে আরো একমাস আগে। যে কারণে বিপাকে পড়েছেন কৃষকেরা। অন্যদিকে বরাদ্দ পাওয়া কৃষকদের প্রশিক্ষণের বরাদ্দের টাকা নিয়ে হয়েছে নয় ছয় ।

জানা যায়, ফলন ও দাম ভাল হওয়ায় প্রতিবছরই কুমারখালী ও খোকসায় বাড়ছে পেঁয়াজের আবাদ। কিন্তু সংরক্ষণের অভাবে এখানকার উৎপাদিত পঁচনশীল ফসল পেঁয়াজের ২৫ থেকে ৩০ শতাংশই নষ্ট হয়ে যাওয়ার কারণে পেঁয়াজ চাষিরা ক্ষতিগ্রস্ত হন। এমন অবস্থায় পেঁয়াজ সংরক্ষণের জন্য সরকারিভাবে উদ্যোগ নেওয়ার দাবি জানিয়ে আসছিল প্রান্তিক পেঁয়াজ চাষিরা। এর ফলে  কৃষিবিপণণ অধিদপ্তর কর্তৃক বাস্তবায়নাধীন কৃষক পর্যায়ে পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণ পদ্ধতি আধুনিকায়ন এবং বিপণন কার্যক্রম উন্নয়ন প্রকল্পের অধীনে কুমারখালি ১৫ টা ও খোকসায় ২০ টা ঘরের বরাদ্দ দেওয়া হয়।

খোকসা উপজেলায় সরেজমিনে গিয়ে দেখা যায়, বেশিরভাগ ঘর এখনো কাজ ৭০-৮০%  বাকি আছে। যে গুলো হয়েছে তার আবার বেশির ভাগ নিম্নমানের নির্মাণ সামগ্রী দিয়ে তৈরীতে উদ্বোধনের আগেই ভেঙ্গে পড়ছে। সাড়ে ৪ টন ধারন ক্ষমতার ঘরে দেড় থেকে দুই টন পিঁয়াজ দিতেই ভেঙ্গে পড়েছে। এ বিষয়ে উপকারভোগি কৃষক বিশ্বজিৎ জানান, "ঘর নিতে রাসেল সাহেবকে ৩০ হাজার টাকা দিতে হয়েছে। আবার ৩ ব্যাগ সিমেন্ট দিয়েছি। ঘরের সাইনবোর্ড নিতে ২০০ টাকা সহ যাবতীয় সামগ্রি পরিবহনের খরচ নিয়েছে রাসেলের এক সহকারী।" একই রকম কথা জানান খোকসার আর কয়েকজন কৃষক।  রিন্টু নাসের এক জন জানান, " আমাদের পিঁয়াজ পঁচে যাচ্ছে এখনো ঘরের পিলার আর টিন ছাড়া কিছুই হয়নি। কবে হবে জানিনা। তিনি বলেন যারা টাকা দিচ্ছে হয়তো তাদেরটা আগে হচ্ছে। আর কেউ টাকা না দিলে তার ঘর হতে সময় নিচ্ছে। খোকসা ওসমানপুরের এক কৃষক জানান, " নিম্নমানের সামগ্রী দিয়ে তৈরভ করছে ঘর। নির্মাণ শ্রমিক সহ ১০-১৫ জনের টিমকে ১৫-২০ দিন তিন বেলা খাবার ও থাকার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। বাঁশ, কাঠ, সাইনবোর্ড, টিন, মিটার আনতে ভাড়া দেওয়া লেগেছে। ৩ ব্যাগ সিমেন্ট দেওয়া হয়েছে।

কুমারখালী উপজেলায় সরেজমিনে দেখা যায় , প্রায় ঘর রাসেলের খালা, কাজিন অথবা বিভিন্ন আত্মীয় পেয়েছে।  ৫ লাখ ৯০ হাজার টাকা ব্যয়ে নির্মাণ প্রতিটি ঘর বাড়ির উঠান বা ফাঁকা জায়গায় মাত্র এক শতাংশ জমিতে টিন-বাঁশ, কাঠের বাটাম, লোহা ও কংক্রিটের সমন্বয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এই ঘরের আয়তন প্রায় ৩৭৫ বর্গফুট। প্রতিটি ঘরে বাতাস চলাচলের জন্য ৬টি বায়ু নিষ্কাশন পাখা সংযুক্ত রয়েছে। মূলত ভ্যান্টিলেশনের পর্যাপ্ত ব্যবস্থা থাকার কারণেই সংরক্ষিত পেঁয়াজ পঁচবে না। তাপমাত্রা ও অর্দ্রোতা পরিমাপের জন্য প্রতিটি ঘরে হাইগ্রোমিটার রয়েছে। এই উপজেলার বেশিরভাগ ঘরের কাজ এখনও শেষ হয় নাই। ঘর করতে অনেক কৃষকে দিতে হয়েছে সিমেন্ট, বালি ও ইট। ঘরের পিলারের ঢালায়ে খোয়া ও রডেও করেছে অনিয়ম। প্রত্যেক কৃষকে ঘর তৈরীর মিস্ত্রিকে প্রায় মাস খানেক  থাকা ও খাওয়ার ব্যবস্থা করতে হয়েছে। প্রতিটি ঘরে সংরক্ষণ করা যায় ৩শ থেকে সাড়ে ৪শ মণ পেঁয়াজ ও তিনটি আলাদা আলাদা স্তরে পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারবেন অন্তত ১০ জন কৃষক। কিন্তু রাখছেন মাত্র একজন কৃষক।  এ ঘরে নয় মাস পর্যন্ত পেঁয়াজ ভালো থাকে। পেঁয়াজ ও রসুন সংরক্ষণের দেশীয় মডেল ঘরের আশায় পেঁয়াজ চাষিরা তাদের পুরাতন ঘর মেরামত না করায় এখন পেঁয়াজ নিয়ে বিপাকে পড়েছেন তারা।
চাঁদপুর ইউনিয়নের বরইচারা গ্রামের খয়বার আমিনের ছেলে বাবু মোল্লা প্রতিবেদকে বলেন, আমার ঘরের কাজ এখনও শেষ হয় নাই। ঘরের কাজের বিষয়ে রাসেলকে জিজ্ঞেস করলে সে বলে ঈদের পরে কাজ করলে ভালো হবে। সে আমার কাছ থেকে ১০ হাজার টাকা চেয়েছে ঘরবাবদ আমি বলেছি ঘরের কাজ শেষ হলে আমি আপনাদের খুশি করব কিন্তু এখন না। এই ঘর করতে আমার কাছ থেকে সিমেন্ট চেয়েছিল আমি বলেছি আপনারা করেন আমি পরে দিব। এই ঘরের মেঝে করতে আমাকে বালি ও ইট দিতে হয়েছে। যতদিন এই ঘরের কাজ করেছে মিস্ত্রি সবাইকে আমার তিন বেলা খেতে দিতে হয়েছে এবং থাকতে দিতে হয়েছে।

কৃষি বিপণন অধিদপ্তরের মাঠ কর্মকর্তা রাসেল বিশ্বাসের যোগসাজশে  ১০ হাজার থেকে  ৫০ হাজার টাকার বিনিময়ে দেওয়া হয়েছে এ সকল সরকারি ঘর। এছাড়া ঘরের ডিজাইন বিকৃত করে নির্মাণ করা হচ্ছে। ঘর নির্মাণে অথবা বিতরণের বিষয়ে কোন মতামত নেওয়া হচ্ছে না কুমারখালি উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসের। এমনকি কুমারখালি উপজেলা প্রশাসন ও কৃষি অফিসে নেই এ সকল ঘরের তালিকা।

এই বিষয়ে অন্য কৃষক বাগুলহাট ইউনিয়নের দমদম গ্রামের সাত্তার মুন্সির ছেলে আতিয়ার রহমান বাড়িতে না থাকায় তার স্ত্রীর সাথে প্রতিবেদকের কথা হলে তিনি জানান,রাসেল আমার বোনের ছেলে তাই আমরা পাইছি।"রাত্রির মধ্যে হুরপার করে করলি" পিলার ভালো হয়নি। ঘর ভাড়া দেবার কথা জানতে চাইলে বলেন আমারই দেছে তাই আমারই পিয়াজ রাখি, কেউ যদি ভাড়া নেয় নিবি'। ঘর নিতে কত টাকা লেগেছে সে প্রসঙ্গে বলেন,"টাকা পয়সা কত লাগেছে আমার ছেলে জানে আমার কাছে কয়ও না এসব কথা, বলে যা করিছি আমরা করেছি তোমার এত শোনার দরকার নেই। তবে তিনি আরো জানান, টাকা ছাড়া কোন কাজ হয়রে বাবা। ঘরে কাজ করার সময় তিন বস্তা সিমেন্ট দিয়েছি আর ওরা যতদিন কাজ করেছে ততোদিন খাতি দিয়েছি।

বিষয়টি নিয়ে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান জিসান এন্টারপ্রাইজের প্রোপাইটার মনোয়ার হোসেনের মুঠো ফোনে ফোন দিলে তিনি ফোন কেটে দেন।

এই বিষয়ে মাঠ কর্মকর্তা  রাসেলের সাথে কথা হলে তিনি সকল অভিযোগ অস্বীকার করে বলেন, আমি আমার দায়িত্ব ঠিকমতোই পালন করছি কোন অনিয়ম করিনা।
কুমারখালি উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার মুঠোফোনে কল করলে তিনি ফোন ধরেন নাই।

কুষ্টিয়া জেলার সিনিয়র কৃষি বিপণন কর্মকর্তা সুজাত হোসেন খান বলেন, আমার পেঁয়াজের ঘরে কোন অভিযোগ নাই। কোথায় অভিযোগ পায়ছেন কোনডা দেখছেন সেডা আমি জানি। এজাবত কেউ অনিয়ম পাই নাই। আপনি কোথায় অনিয়ম পাইছেন আমার জানা নাই।
এ বিষয়ে জেলা প্রশাসক তৌফিকুল রহমান বলেন, আমি আসার পরে এই রকম কোন ঘর দেওয়া হয়ছে কিনা আমার জানা নাই হয়তো আমি আসার আগে হয়ে থাকতে পারে।



সম্পর্কিত খবর