দেশের খবর

টাঙ্গাইলে জমি বরাদ্দ পেলেও নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি আধুনিক বাস টার্মিনালের

 ১৯৮১ সালে তৎকালীন রাষ্ট্রপতি বিচারপতি আব্দুস সাত্তার টাঙ্গাইল জেলার পুরাতন বাসস্ট্যান্ড থেকে ২ কিলোমিটার দূরে বর্তমান নতুন বাস টার্মিনালটি উদ্বোধন করেন। তখন এই টার্মিনাল থেকে ঢাকা, ময়মনসিংহ ও জামালপুরে বাস চলাচল করতো। ফলে আশির দশকের জন্য টার্মিনালটি যথেষ্ট ছিল। বর্তমানে টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক দিয়ে উত্তরবঙ্গের ২৩টি জেলার যানবাহন চলাচল করে, যা এটিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে। এ ছাড়াও দক্ষিণবঙ্গের বেশ কয়েকটি জেলাতে টাঙ্গাইল থেকে সরাসরি বাস চলাচল করছে।

 

এক যুগ আগে পৌরসভার মেয়র ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশে বাস টার্মিনালের ভবন ও যাত্রী ছাউনি পরিত্যক্ত ঘোষণা করেন। সেই পরিত্যক্ত ভবনে এখনও চলছে টার্মিনালের সমস্ত কার্যক্রম। ভবনটি মেয়াদ উত্তীর্ণ হওয়ায় যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের দুর্ঘটনা।

 

গত তিন বছর আগে আধুনিক বাস টার্মিনালের জন্য শহরের রাবনা বাইপাস এলাকায় প্রায় পাঁচ একর সরকারি জমি বরাদ্দ পায় টাঙ্গাইল পৌরসভা। বরাদ্দ পেলেও এখনো টার্মিনালের ‌নির্মাণ কাজ শুরু করতে পারেনি পৌর কতৃপক্ষ। বর্তমানে টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালে যানবাহনের সংখ্যা অনেক, যায়গা সংকটের কারনে যানবাহনের চাপে রাস্তা বন্ধ হয়ে প্রতিনিয়ত যানযটের সৃষ্টি হয়। এই যানযটের কারনে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় চলাচলকারী বড় সংখ্যক পথচারীদের। এছাড়া টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতাল বাসস্ট্যান্ড সংলগ্ন হওয়ায় হাসপাতালে আসা রোগী ও তাদের স্বজনদের দুর্ভোগ পোহাতে হয়।

 

রাজধানী ঢাকার নিকটবর্তী জেলা টাঙ্গাইল।  আয়তনের দিক থেকে ঢাকা বিভাগের সর্ববৃহৎ জেলা এবং জনসংখ্যার দিক থেকে ঢাকা বিভাগের ২য় সর্ববৃহৎ জেলা টাঙ্গাইল। এর আয়তন প্রায় ৩,৪১৪.৩৫ বর্গ কিলোমিটার।

 

টাঙ্গাইলকে 'উত্তরবঙ্গের প্রবেশদ্বার' বলা হয়, বর্তমানে ঢাকা-টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক ব্যবহার করে উত্তরবঙ্গের বিভিন্ন জেলার যানবাহন দেশের অন্যান্য অংশের সাথে যুক্ত হয়। টাঙ্গাইল-যমুনা সেতু মহাসড়ক দিয়ে উত্তরবঙ্গের ২৩টি জেলার যানবাহন চলাচল করে, যা এটিকে দেশের উত্তরাঞ্চলের প্রবেশদ্বার হিসেবে পরিচিতি এনে দিয়েছে।

 

কিন্তু টাঙ্গাইলে নেই কোনো আধুনিক বাস টার্মিনাল।  নতুন বাস টার্মিনাল হিসেবে পরিচিত টাঙ্গাইল পৌরসভার দেওলা ও কোদালিয়া এলাকায় বাস টার্মিনাল নির্মিত হয়েছে ৮০ দশকে। সময়ের ব্যবধানে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। হাজার হাজার মানুষ তাদের গন্তব্যে রওয়ানা দেয় এই বাস টার্মিনাল থেকে। বর্তমানে এই নতুন বাস টার্মিনালের অবস্থা খুবই নাজেহাল। প্রয়োজনের তুলনায় যায়গা সংকট থাকার কারনে সব সময় যানযট লেগেই থাকে। জেলার বিভিন্ন উপজেলা থেকে লোকজন কর্মের উদ্দেশ্যে আসে এই জেলা শহরে। 

 

টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালের পাশেই রয়েছে ২৫০ শয্যা বিশিষ্ট জেনারেল হাসপাতাল এবং টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল। জেলা শহর ও বিভিন্ন উপজেলা থেকে বড় সংখ্যক মানুষ চিকিৎসা নিতে আসে এখানে।  নতুন বাস টার্মিনালে প্রতিনিয়ত যানযট লেগে থাকার কারনে রোগী ও তাদের স্বজনদের যাতায়াত করতে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয়। এছাড়া জরুরি বিভাগে ভর্তি হতে আসা মুমূর্ষ রোগিদের ঘন্টার পর ঘন্টা নতুন বাস স্ট্যান্ডের যানজটে অপেক্ষা করতে হয়। অনেকে রাস্তায় মৃত্যুবরণ করেন।

 

গত ২০২২ সালের জুলাই মাসের ৪ তারিখে ১ লক্ষ ১ টাকা মুল্যের দলিল মুলে টাঙ্গাইল পৌরসভা ৩০ বছর মেয়াদী  ৪.৯৪ একর সরকারি জমি লিজচুক্তি বন্দোবস্ত পায় আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করার জন্য। যায়গাটি রাবনা বাইপাসের পাশেই অবস্থিত।  দীর্ঘ সময় পার হলেও নির্মাণ কাজ শুরু হয়নি এই আধুনিক বাস টার্মিনালের।

 

টাঙ্গাইল জেলা বাস-কোচ-মিনিবাস মালিক সমিতির সাবেক সভাপতি খন্দকার ইকবাল হোসেনের কাছ থেকে জানা যায়, টাঙ্গাইল জেলা বাস-কোচ-মিনিবাস মালিক সমিতির অন্তর্ভুক্ত রয়েছে ৮০০টি গাড়ি। প্রতিদিন ৩৫০ থেকে ৪০০টি গাড়ি চলে জেলা শহরের বাস টার্মিনাল থেকে, বাকি ৪০০ গাড়ি চলে বিভিন্ন উপজেলা বাস টার্মিনাল থেকে। এছাড়াও ট্রাক ও সিএনজিচালিত অটোরিক্সা, ব্যটারী চালিত ইজিবাইকের আলাদা স্ট্যান্ড না থাকায় বাস টার্মিনালেই এসব যানবাহনের স্ট্যান্ড হিসেবেও রুপ নিয়েছে। ফলে দিন দিন যায়গা সংকটটি প্রকট আকার ধারণ করছে।

 

টাঙ্গাইল জেলা বাস-কোচ-মিনিবাস শ্রমিক ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক মোমিনুল ইসলাম লাভলু জানান, গত ১০ বছর আগে পৌরসভা থেকে এই বাস টার্মিনাল  পরিত্যাক্ত ঘোষনা করা হয়। এরপর বাস টার্মিনালের মালিক সমিতি ও শ্রমিক ইউনিয়ন এবং যাত্রী ছাউনি হিসেবে ব্যবহৃত পরিত্যক্ত ভবনটি সংস্কার করা হয়নি। জেলার যানবাহনের সাথে সম্পৃক্ত মালিক, শ্রমিক সবারই কাম্য আধুনিক বাস টার্মিনাল। 

 

মেজর জেনারেল মাহমুদুল হাসান আদর্শ কলেজের বাংলা বিভাগের প্রধান ইউসুফ আলী মিয়া (তরুন ইউসুফ) জানান, তার বাসা টাঙ্গাইল নতুন বাস টার্মিনালের পাশেই, প্রতিদিন কলেজে যাওয়া আসার সময় বাস টার্মিনালের রাস্তায় যানজটের কারণে চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় তাকে। স্বাভাবিক সময়ের চেয়ে প্রায় ৪০ মিনিট সময় বেশি লাগে কলেজে পৌঁছাতে। এছাড়াও বাস টার্মিনালের কাছে টাঙ্গাইল জেনারেল হাসপাতাল এবং টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা নিতে আসা রোগীদেরও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় বাস টার্মিনালের এই যানজটের কারণে। 

 

তিনি আরোও জানান, যানজটের কারণে ডেলিভারি রোগী বাস টার্মিনালেই বাচ্চা প্রসব করার ঘটনাও ঘটেছে। বাস টার্মিনালের আশেপাশের এলাকার শিক্ষার্থীদেরও শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে পাঠ নিতে যাওয়ার সময়ও চরম ভোগান্তি পোহাতে হয় এই যানযটের কারনে। আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করে পরিকল্পিতভাবে যানবাহন চলাচল করলে এই যানজটের নিরসন হবে এবং পথচারীদের ভোগান্তি লাঘব হবে বলে মনে করেন তিনি। 

 

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পথচারী জানান, বাস টার্মিনালে এমনিতেই জায়গা সংকট,  এখানে বাস রাখার পাশাপাশি ট্রাক, সিএনজি চালিত অটোরিক্সা ও ব্যাটারী চালিত ইজিবাইককের অলিখিত স্ট্যান্ডও রয়েছে। এছাড়াও বাস টার্মিনালের উত্তর পাশে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে কাঁচা বাজার। এই বাজারের দোকানগুলো প্রায় রাস্তার উপরেই বসেছে, যে কারণে যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে এবং যেকোনো সময় ঘটতে পারে বড় ধরনের সড়ক দুর্ঘটনা, প্রাণহানি হতে পারে মানুষের। অতি দ্রুত অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এই কাঁচা বাজার অপসারণ করা দরকার বলে দাবি করেন প্রশাসনের কাছে। 

 

এ বিষয়ে টাঙ্গাইল পৌরসভার প্রশাসক ও স্থানীয় সরকার টাঙ্গাইলের উপ-পরিচালক মো: শিহাব রায়হান জানান, আধুনিক বাস টার্মিনাল নির্মাণ করার জন্য টাঙ্গাইল পৌরসভার অনুকূলে সরকারি বরাদ্দ পাওয়া জমিতে মাটি ভরাট করার জন্য টেন্ডার আহ্বান করা হয়েছে। টেন্ডার প্রক্রিয়া শেষ হলেই দ্রুতই মাটি ভরাট করে বাস টার্মিনাল নির্মাণের কাজ শুরু করা হবে বলে তিনি আশাবাদ ব্যক্ত করেন।



সম্পর্কিত খবর