মীরসরাই রেঞ্জের ফরেস্ট রেঞ্জার আল আমিনের বিরুদ্ধে ফের ওঠেছে ঘুষ দাবির অভিযোগ। গত ১২ মে ভোর ৪টা নাগাদ ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে টহলকালে একটি ফার্নিচার বোঝাই পিক-আপ আটকের ঘটনায় চাঞ্চল্যের সৃষ্টি হয়েছে।
জানা গেছে, ফরেস্ট রেঞ্জার আল আমিনের নেতৃত্বে মীরসরাইয়ের জোরারগঞ্জ বিটের কর্মকর্তা হাসানুজ্জামানসহ প্রায় ৬ জনের একটি মোটরসাইকেল বহর মহাসড়কে অভিযান চালায়। অভিযানে নীল রঙের একটি ফার্নিচারবোঝাই পিক-আপ আটক করা হয়।
পিক-আপের মালিক জানান, তিনি চট্টগ্রামের পাহাড়তলী এলাকা থেকে মেয়ের বিয়ের জন্য ফার্নিচার কিনেছেন এবং সমস্ত বৈধ কাগজপত্র তাঁর কাছে রয়েছে। কিন্তু আল আমিন ওই বক্তব্য আমলে না নিয়ে ঘটনাটি ‘লেনদেনের মাধ্যমে’ মীমাংসার নির্দেশ দেন সহকারী কর্মকর্তা হাসানুজ্জামানকে।
অভিযোগ রয়েছে, প্রথমে মালিকের কাছে ৫০ হাজার টাকা দাবি করা হলেও আপোষে ২৫ হাজার টাকায় বিষয়টির নিষ্পত্তি করা হয় এবং পরে পিক-আপটি ছেড়ে দেওয়া হয়।
স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, আল আমিনের চাকরি বয়স এক বছর পূর্ণ না হলেও ঘুষ গ্রহণ ও অনৈতিক কর্মকাণ্ডে তার দক্ষতা যেন ৪০ বছরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদেরও ছাড়িয়ে গেছে। ইতিমধ্যে তার বিরুদ্ধে একাধিক অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগ স্থানীয় প্রশাসন ও বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের কাছে জমা পড়েছে বলে জানা যায়।
এ বিষয়ে চট্টগ্রাম বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, “ঘটনাটি খতিয়ে দেখা হবে। প্রমাণ পাওয়া গেলে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।”
স্থানীয়দের অভিযোগ, এরকম অনিয়ম-দুর্নীতির কারণে সাধারণ মানুষ বন বিভাগের ওপর আস্থা হারাচ্ছে। তারা দ্রুত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন।
এদিকে ফরেস্ট রেঞ্জার মো. আল-আমিনের বিরুদ্ধে কাঠ পাচার, বনজ সম্পদ লুটপাট, ঘুষ আদান-প্রদান এবং কোটি টাকার দুর্নীতির অভিযোগ উঠেছে। ছাত্রলীগের সাবেক ক্যাডার হিসেবে পরিচিত আল-আমিন ৩১ মার্চ ২০২৪ তারিখে বন অধিদপ্তরের প্রজ্ঞাপনের ভিত্তিতে ফরেস্ট রেঞ্জার হিসেবে নিয়োগ পান এবং ৬ মে ইনানী বিটে প্রশিক্ষণরত অবস্থায় বন ভূমি জবরদখল, গাছ ও বালু বিক্রি এবং বনদস্যুদের সহযোগিতায় বিপুল অর্থ আত্মসাৎ করেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরবর্তীতে তাকে মীরসরাই রেঞ্জে বদলি করা হয় এবং ২০২৫ সালের ফেব্রুয়ারিতে সেখানে দায়িত্ব নেন। এরপর থেকেই জোরারগঞ্জ ও গোবানিয়া বিটে সেগুন কাঠ পাচারসহ বন উজাড়ের অভিযোগ উঠে। বৈধ লট কর্তনের অনুমতি না পেলেও অর্থের বিনিময়ে সেই কাঠ পাচারকারীদের কাছে বিক্রি করা হয়। চোরাই গাছ জব্দ করে রেঞ্জ অফিসে মজুদ করার নির্দেশ দিয়ে সেই কাঠের ৫০% বিক্রি, ৩০% পরিবহন খরচ এবং ২০% রেঞ্জ অফিস ও পার্ক ব্যবস্থাপনায় ব্যবহারের কথাও বলা হয়। বালুখালী-গোবানিয়া রোড দিয়ে ট্রাকপ্রতি ১৫০০-২০০০ টাকা এবং গাছ কাটার ক্ষেত্রে ১০-১৫ হাজার টাকা পর্যন্ত ঘুষ আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। ১২ মে ভোরে ঢাকা-চট্টগ্রাম মহাসড়কে এক ফার্নিচারবাহী পিক-আপ আটক করে বৈধ কাগজ থাকা সত্ত্বেও ২৫ হাজার টাকা ঘুষ নিয়ে ছেড়ে দেওয়ার ঘটনাও ঘটেছে। এছাড়া স্টাফদের ঘুষ দিতে বাধ্য করা, ভাউচারে স্বাক্ষর নিয়ে টাকা আত্মসাৎ, প্রকল্পের বরাদ্দকৃত অর্থ আত্মসাৎ, বন কর্মকর্তাদের হুমকি, গালিগালাজ, এবং বন বিভাগের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ম্যানেজ করার দাবি—সব মিলিয়ে আল-আমিনের বিরুদ্ধে রয়েছে ভয়াবহ দুর্নীতির চিত্র। অভিযোগ জমা পড়লেও এখনো তার বিরুদ্ধে দৃশ্যমান কোনো ব্যবস্থা গ্রহণ করা হয়নি। স্থানীয় বন কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজ দ্রুত তদন্ত ও শাস্তিমূলক ব্যবস্থা গ্রহণের দাবি জানিয়েছেন।