ভারত ও মিয়ানমারের ইলিশ দেদারসে আমদানি হচ্ছে বেনাপোল বন্দর দিয়ে। ৫০০ টাকায় কেনা ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশ ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা কেজি দরে বিক্রি হচ্ছে বেনাপোল, যশোরসহ দেশের বিভিন্ন বাজারে। আগে ভারতে রপ্তানি হতো পদ্মার ইলিশ, অথচ এখন ভারত থেকে আমদানি হচ্ছে শত শত কেজি ভারতীয় ইলিশ। দেশের কয়েকজন আমদানিকারক এই ইলিশ আনছেন।
কাস্টমস ও ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন সূত্রে জানা গেছে, চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসে বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। এর মধ্যে জুলাইয়ে এসেছে ২৯ হাজার ৪৪০ কেজি এবং আগস্টে ৩ লাখ ২৩ হাজার ৩৪৬ কেজি। আমদানি করা এসব ইলিশের মূল্য দেখানো হয়েছে মোট ৬ কোটি ৯২ লাখ টাকা। এর মধ্যে জুলাইয়ে আমদানি মূল্য ছিল ৩৫ লাখ ৪৮ হাজার ৭৯৬ টাকা এবং আগস্টে ৬ কোটি ৫৭ লাখ ৪৫ হাজার ৭১ ৪ টাকা। দুই মাসে ফেমাস ট্রেডার্স, সততা ফিশ ফিড, শরীফ ট্রেড ইন্টারন্যাশনাল, স্বর্ণালী ইন্টারন্যাশনাল ও রাব্বি এন্টারপ্রাইজসহ মোট ২২ জন আমদানিকারক এসব মাছ এনেছেন।
ভারত থেকে এলসির মাধ্যমে আমদানি করা ইলিশের দাম পড়ছে প্রতি কেজি ২৫২ টাকা। সরকারি শুল্ক ১৬২ টাকা, ট্রাক ভাড়া ও এলসি খরচসহ অন্যান্য খরচ প্রতি কেজিতে আরও ১০০ টাকা ধরলে মোট কেনাবেচা খরচ পড়ে ৫১৪ টাকা। সেই মাছই বাজারে বিক্রি হচ্ছে ১৪০০ থেকে ১৮০০ টাকা কেজিতে।
শুধু বাংলাদেশে নয়, পশ্চিমবঙ্গের বাজারগুলোতেও প্রবেশ করেছে টনের পর টন গুজরাট, মুম্বাই ও মিয়ানমারের ইলিশ। তবে ‘স্বাদ ও গন্ধহীন’ এসব মাছকে বাংলাদেশের সুস্বাদু ইলিশ পরিচয়ে বিক্রির অভিযোগ উঠেছে অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে। ভোক্তাদের অভিযোগ, বাজারে গেলেই মাছ ব্যবসায়ীরা ভারত-মিয়ানমারের ইলিশকে পদ্মার ইলিশ বলে চালিয়ে দিচ্ছেন। কিন্তু বাড়িতে নিয়ে রান্নার পর দেখা যায়— সেই ইলিশে নেই কোনো স্বাদ ও সুগন্ধ। দেশি ইলিশের সঙ্গে দেখতে প্রায় একই রকম এবং আকারেও বড়, অথচ দাম প্রায় অর্ধেক। বেনাপোল ও যশোরসহ দেশের বিভিন্ন মাছের বাজারে এমন ইলিশের সরবরাহ বেড়েছে। ব্যবসায়ীদের কাছে এসব মাছ ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশ নামে পরিচিত। অনেকে একে ‘রোহিঙ্গা ইলিশ’ বলেও প্রচার করে থাকেন। বাজারে বাংলাদেশি ইলিশের চাহিদা বিপুল এবং দামও তুলনামূলক বেশি। সেই সুযোগ কাজে লাগিয়েই কিছু ব্যবসায়ী বিদেশ থেকে ইলিশ এনে ‘পদ্মার ইলিশ’ বলে বিক্রি করছেন।
ক্রেতাদের অভিযোগ, দেশি ইলিশ মনে করে এসব মাছ কিনে তারা প্রতারিত হচ্ছেন। স্বাদ ও গন্ধে দেশি ইলিশের সঙ্গে বিস্তর পার্থক্য থাকলেও তা ক্রেতাকে জানানো হচ্ছে না। এই চাহিদার সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র ক্রেতাদের ঠকাচ্ছে।
বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের পরিদর্শক আশওয়াদুল আলম বলেন, "চলতি ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রথম দুই মাসেই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে ৩ লাখ ৫২ হাজার ৭৮৭ কেজি ইলিশ আমদানির তথ্য পাওয়া গেছে। মোট ২২ জন আমদানিকারক এসব মাছ এনেছেন। মাছ ভালোভাবে পরীক্ষা করেই আমরা কোয়ারেন্টাইন সার্টিফিকেট প্রদান করে থাকি।"
মাছ ব্যবসায়ীরা জানান, ভারতের বিভিন্ন রাজ্য ও মিয়ানমারের এসব মাছ ভারত হয়ে বেনাপোল বন্দর দিয়ে দেশে প্রবেশ করছে। তবে বেনাপোল স্থলবন্দর ফিশারিজ কোয়ারেন্টাইন কার্যালয়ের কর্মকর্তাদের তথ্যমতে, বেনাপোল দিয়ে আসা মাছ মূলত ভারতীয় ইলিশ। মিয়ানমার থেকে যে ইলিশ আসে, সেগুলো চট্টগ্রাম বন্দর দিয়ে প্রবেশ করে। তবে বাজারে মিয়ানমারের ইলিশ বিক্রি হচ্ছে বলে তারা নিশ্চিত করেছেন।
এদিকে একটি সূত্রের দাবি, অনেক ইলিশ অবৈধভাবেও দেশে আনা হয়েছে। গত ২২ জুলাই বেনাপোল স্থলবন্দর দিয়ে 'সাদা মাছ' ঘোষণা দিয়ে আমদানি করা ১২ কার্টন (প্রায় ৩৬০ কেজি) ভারতীয় ইলিশ মাছ জব্দ করে বেনাপোল কাস্টমস কর্তৃপক্ষ।
বেনাপোল বাজারে ইলিশ কিনতে আসা মো. মহিউদ্দিন বলেন, দেশি ইলিশ মনে করেই তিনি একটি মাছ কিনেছিলেন। খাওয়ার পর বুঝতে পারেন, মাছটির স্বাদ ও গন্ধ দেশি ইলিশের মতো নয়। দেখতে একই রকম হওয়ায় সাধারণ ক্রেতাদের পক্ষে দেশি ও বিদেশি ইলিশের পার্থক্য বোঝা কঠিন।
আরেক ক্রেতা আনোয়ারুল ইসলাম জানান, কখনও চাঁদপুর, কখনও বরিশাল আবার কখনও চট্টগ্রামের ইলিশের নাম করে বিক্রি করা হলেও ইলিশগুলো মূলত ভারত ও মিয়ানমার থেকে আনা। ব্যবসায়ীদের এই চড়া দামের প্রতারণা বন্ধে প্রশাসনের আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া উচিত।
বাজারের ব্যবসায়ীদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে ১ কেজি ২০০ গ্রাম থেকে ৩০০ গ্রাম ওজনের দেশি ইলিশ বিক্রি হচ্ছে প্রতি কেজি প্রায় ৩ হাজার ৩০০ থেকে ৩ হাজার ৪০০ টাকা দরে। বিপরীতে একই ওজনের কথিত ভারতীয় ও মিয়ানমারের ইলিশের দাম প্রায় ১ হাজার ৪০০ থেকে ১ হাজার ৮০০ টাকা। ফলে স্বাভাবিকভাবেই ক্রেতাদের একটি বড় অংশ কম দামের মাছের দিকে ঝুঁকছেন।
নাভারন বাজারের মাছ ব্যবসায়ী যাদব হালদার বলেন, এসব মাছ ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসছে বলে শুনেছেন। বাগআঁচড়ার কুদ্দুস ও বেনাপোলের জাফর নামের দুই ব্যক্তি এলসির মাধ্যমে বৈধভাবে এসব মাছ আমদানি করছেন। তবে বিপুল পরিমাণ বিদেশি ইলিশ আসার কারণে দেশি ইলিশের বাজারে এর নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
বেনাপোল বাজারের দেশি ইলিশ ব্যবসায়ী উৎস মণ্ডল, বাবু, মাহবুব, মোস্তাফিজুর ও পরিতোষ বিশ্বাস জানান, কম দামে বড় আকারের এসব বিদেশি ইলিশ বাজারে আসায় দেশি ইলিশের বিক্রি কমে গেছে। দামের পার্থক্যের কারণে প্রকৃত দেশি ইলিশ ব্যবসায়ীরা আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন। এতে ক্রেতা ও দেশি ব্যবসায়ী— দুপক্ষই ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে।
এ বিষয়ে নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কয়েকজন আমদানিকারক জানান, তারা বৈধভাবে সরকারি শুল্ক পরিশোধ করে ইলিশ আমদানি করে আড়তদারদের কাছে বিক্রি করেন। খুচরা বাজারে ব্যবসায়ীরা কী বলে বিক্রি করছেন, সেটির দায় আমদানিকারকদের নয়।
এদিকে ক্রেতাদের অভিযোগ, বিদেশি ইলিশ দেশি বলে বিক্রি করা হলেও ভোক্তা অধিকার সংরক্ষণ অধিদপ্তর বা প্রশাসনের কোনো নজরদারি নেই। এসব মাছের যথাযথ মান পরীক্ষারও ব্যবস্থা নিশ্চিত করা দরকার।