জাতীয়

এক রাতেই বিলীন ঘরবাড়ি

ষাটোর্ধ্ব শামসুন নাহার ও জাহানারা বেগম, দুজনেই প্রতিবেশী। প্রায় তিন দশক ধরে সুখে-দুঃখে ছিলেন একে অপরের পাশে। কিন্তু কখনো ভাবেননি নদীতীরে একজনের শূন্য ভিটায় এভাবে পাশাপাশি বসতে হবে। মেঘনা নদীর ভয়াল ভাঙন কেড়ে নিয়েছে তাদের বসতভিটা, ঘরবাড়ি ও আশ্রয়। এখন তারা পরিবারসহ খোলা আকাশের নিচে একটি ছোট টং ঘরে মানবেতর জীবন পার করছেন। তারা জানেন না, এখন গন্তব্য কোথায়। শুধু এই দুজন নন, একই দুর্দশায় পড়েছেন প্রায় শতাধিক পরিবার।

এ দৃশ্য এখন মেঘনা নদীর ভয়াবহ ভাঙনে ক্ষতবিক্ষত ভোলার সদর উপজেলার বিচ্ছিন্ন কাচিয়া ইউনিয়নের মাঝেরচর গ্রামে। এক সময়ের শস্যভাণ্ডারখ্যাত এই গ্রামটির চার-পঞ্চমাংশ ইতোমধ্যেই নদীগর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, বাকি অংশও রয়েছে হুমকির মুখে। ভয়াবহ ভাঙন অব্যাহত থাকায় যেকোনো সময় পুরো গ্রামটি নিশ্চিহ্ন হয়ে যেতে পারে।

 

সরেজমিনে জানা গেছে, ৯০ দশকে মেঘনার বুক চিরে জেগে ওঠা কাচিয়া ইউনিয়নের রামদেবপুর, মধুপুর ও টবগী গ্রামে আট মাস আগেও প্রায় ১০ হাজার মানুষের স্থায়ী বাস ছিল। এখন পর্যন্ত ৬টি আশ্রয়ণ প্রকল্পের মধ্যে ৫টি মেঘনার গর্ভে বিলীন হয়ে গেছে, হুমকির মুখে আছে রামদেবপুর-৪ নামের অবশিষ্ট প্রকল্পটি। নদীতে হারিয়ে গেছে একটি মাটির কিল্লা, দুটি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়, দুটি মাদরাসা, তিনটি মসজিদ, একটি কমিউনিটি ক্লিনিক, শত শত বসতভিটা, বাজার, রাস্তাঘাট এবং কয়েক কিলোমিটার ফসলি জমি। ভিটেমাটি হারিয়ে কেউ আশ্রয় নিচ্ছেন নদীতীরে টং ঘরে, কেউ গরুর ঘরের পাশে একচালা চালায় কাটাচ্ছেন দিন। নদী ভাঙনে স্কুল ভবন হারিয়ে ১৭৯ নং উত্তর-পশ্চিম কাচিয়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের ক্লাস চলছে একটি পরিত্যক্ত সাইক্লোন শেল্টারে। কমিউনিটি ক্লিনিক চলছে বসতবাড়ির ভেতর গড়ে ওঠা অবশিষ্ট মাটির কিল্লায়।

এ যেন ভোলার মূল ভূখণ্ডের চোখের আড়ালে ঘটে যাওয়া এক নির্মম বাস্তবতা।

 

স্থানীয়দের ভাষ্য মতে, মাঝেরচরে আগে প্রায় সাড়ে ৭ হাজার ভোটার ছিলেন। প্রতিটি সরকারি আশ্রয়ণ প্রকল্পে ছিল ১১০-১৩০টি করে ঘর। প্রকল্পগুলো হলো বারইপুরা-১, রামদেবপুর-২, রামদেবপুর-৩, রামদেবপুর-৫ এবং নতুন রামদেবপুর-৩। সবই এখন স্মৃতি। চর রক্ষায় পানি উন্নয়ন বোর্ড দৃশ্যমান কোনো পদক্ষেপ না নেওয়ায় ক্ষুব্ধ স্থানীয়রা। নদীতে ঘরবাড়ি হারিয়ে খোলা আকাশের নিচে জীবনযাপন করছেন জেলে মো. কালু ও মেহের নেগার দম্পতি। ৩ ছেলে ও ২ মেয়েকে নিয়ে তারা বসবাস করতেন রামদেবপুর-২ নম্বর আশ্রয়ণ প্রকল্পে। মেহের নেগার বলেন, এক রাইতের মইধ্যে নদী ঘরবাড়ি সব ভাইঙা লইয়া গেছে, কিছুই হরাইতে পারিনাই। আচ্ছুক্কা ঠুস ঠুস কইররা ঘর ভিটার মাটি চাকা ধইররা নদীতে পরছে। নদী আমাগো সব লইয়া গেছে।

 



সম্পর্কিত খবর