রংপুর

জলঢাকার সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, বাড়ছে বেসরকারি স্কুলের দাপট

নীলফামারীর জলঢাকায় সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থায় শিক্ষকসংকট, শিক্ষার্থীর উপস্থিতি হ্রাস এবং পাঠদানের মান অবনতির কারণে এক ধরনের নীরব সংকট তৈরি হয়েছে। উপজেলার ২৪৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মধ্যে ৯০টিতে প্রধান শিক্ষক এবং ৯০টি সহকারী শিক্ষকের পদ দীর্ঘদিন ধরে শূন্য রয়েছে। ফলে ভারপ্রাপ্তদের দায়িত্ব পালন ও শিক্ষকসংকটের কারণে ব্যাহত হচ্ছে নিয়মিত পাঠদান। এ পরিস্থিতির সুযোগ নিয়ে শিক্ষার্থী টানছে বেসরকারি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয়, হাফেজিয়া ও সাধারণ মাদ্রাসাগুলো। এতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলোতে দিন দিন শিক্ষার্থী কমছে, যা স্থানীয় শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের উদ্বেগ বাড়িয়েছে।

উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিস সূত্রে জানা গেছে, জলঢাকায় বর্তমানে ২৪৮টি সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে প্রথম থেকে পঞ্চম শ্রেণি পর্যন্ত মোট প্রায় ৩৫ হাজার ৭৮০ জন শিক্ষার্থী রয়েছে। তবে বাস্তবে অধিকাংশ বিদ্যালয়ে দৈনিক উপস্থিতি সন্তোষজনক নয়।

সরেজমিনে বিভিন্ন বিদ্যালয় ঘুরে দেখা যায়, কোথাও ২০-২৫ জন, কোথাও ৪০-৫০ জন শিক্ষার্থী উপস্থিত রয়েছে। অনেক বিদ্যালয়ে মোট শিক্ষার্থীর এক-তৃতীয়াংশও উপস্থিত থাকে না; অথচ ভর্তি রেজিস্টারে শিক্ষার্থীর সংখ্যা অনেক বেশি। খোঁজ নিয়ে জানা যায়, বাজার বা প্রধান সড়কসংলগ্ন বিদ্যালয়গুলোতে উপস্থিতি তুলনামূলক ভালো হলেও গ্রামের প্রত্যন্ত ও চরাঞ্চলের বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থী উপস্থিতি আশঙ্কাজনকভাবে কম।

শিক্ষকসংকটের কারণে অনেক বিদ্যালয়ে নিয়মিত সব শ্রেণির পাঠদান সম্ভব হচ্ছে না। প্রধান শিক্ষক না থাকায় সহকারী শিক্ষকদেরই প্রশাসনিক ও দাপ্তরিক দায়িত্ব পালন করতে হচ্ছে। ফলে শ্রেণিকক্ষে পর্যাপ্ত সময় দিতে পারছেন না তাঁরা।

স্থানীয় অভিভাবকদের অভিযোগ, সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে পাঠদানের মান আগের তুলনায় কমে গেছে। অনেক শিক্ষক নিয়মিত ও আন্তরিকভাবে শ্রেণি কার্যক্রম পরিচালনা করেন না। বিদ্যালয়ের অবকাঠামো উন্নত হলেও শিক্ষার গুণগত মানে তার প্রতিফলন নেই। ফলে অনেক অভিভাবক সন্তানকে সরকারি বিদ্যালয় থেকে সরিয়ে কিন্ডারগার্টেন কিংবা বেসরকারি প্রতিষ্ঠানে ভর্তি করাচ্ছেন।

অভিভাবকদের দাবি, প্রাথমিক শিক্ষার মানোন্নয়নে কার্যকর উদ্যোগের অভাব রয়েছে। বিদ্যালয় পরিচালনা কমিটি কাগজে-কলমে থাকলেও অধিকাংশ ক্ষেত্রে শিক্ষার মানোন্নয়নে তাদের কার্যকর ভূমিকা দেখা যায় না। সচেতন অভিভাবকদের ভাষ্য, যাঁরা সরকারি প্রাথমিক শিক্ষার উন্নয়নের দায়িত্বে রয়েছেন, তাঁদের অনেকেই নিজেদের সন্তানকে এসব বিদ্যালয়ে ভর্তি করান না। ফলে দরিদ্র পরিবারের সন্তানদের নির্ভরতার এই বিদ্যালয়গুলো ক্রমেই গুরুত্ব হারাচ্ছে।

অন্যদিকে শিক্ষক ও স্থানীয়দের অভিযোগ, সরকারি বিদ্যালয়ে শিক্ষকসংকট, ক্লাসের অনিয়ম এবং শিক্ষার নিম্নমানের বিষয়গুলো সামনে এনে বিভিন্ন কিন্ডারগার্টেন শিক্ষার্থী ভর্তিতে অভিভাবকদের উদ্বুদ্ধ করছে। পাশাপাশি কিছু এনজিও পরিচালিত বিদ্যালয় ও হাফেজি মাদ্রাসা ঋণ বা খাদ্যসহায়তাসহ বিভিন্ন সুবিধার আশ্বাস দিয়ে শিক্ষার্থী আকৃষ্ট করছে। এতে সরকারি বিদ্যালয়গুলোতে শিক্ষার্থীর সংখ্যা ধারাবাহিকভাবে কমছে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক শিক্ষক বলেন, "বছরের শুরুতে অনেক সময় সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের আগেই কিন্ডারগার্টেনগুলোতে পাঠ্যবই পৌঁছে যায়। আবার এত সরকারি বিদ্যালয় থাকা সত্ত্বেও কীভাবে এত বেশি কিন্ডারগার্টেনের অনুমোদন দেওয়া হচ্ছে, সেটিও প্রশ্নের বিষয়।"

শিক্ষাসংশ্লিষ্টদের মতে, দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষক নিয়োগ না হওয়া, শূন্য পদ পূরণে ধীরগতি, অভিভাবকদের অনাগ্রহ এবং বিকল্প শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের বিস্তারের কারণে সরকারি প্রাথমিক শিক্ষা ব্যবস্থা আজ চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। দ্রুত শূন্য পদে নিয়োগ, নিয়মিত তদারকি, শিক্ষার গুণগত মান বৃদ্ধি এবং অভিভাবকদের সম্পৃক্ততা নিশ্চিত করা না গেলে ভবিষ্যতে সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়গুলো আরও বড় সংকটে পড়তে পারে।

এ বিষয়ে উপজেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, "শিক্ষার্থীদের উপস্থিতি কম হলেও পরীক্ষার সময় কিছুটা বাড়ে। উপস্থিতি বাড়াতে অভিভাবকদের আরও সচেতন হতে হবে। আমরা নিয়মিত বিদ্যালয় পরিদর্শন, তদারকি, মা সমাবেশসহ শিক্ষার মানোন্নয়নে বিভিন্ন পদক্ষেপ গ্রহণ করছি। শিক্ষকসংকটের বিষয়টি ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষকে জানানো হয়েছে।"

 


সম্পর্কিত খবর