বাংলাদেশ রেলওয়ের প্রশাসনিক ও আর্থিক দুর্বলতার মূলে রয়েছে রেলওয়ে মহাপরিচালকের (ডিজি) নির্বাহী ক্ষমতার সংকোচন—এমন দাবি তুলে ধরে আজ বাংলাদেশ রেলওয়ে পোষ্য সোসাইটি প্রধান উপদেষ্টা বরাবর একটি উচ্চপর্যায়ের স্মারকলিপি পেশ করেছে। স্মারকলিপিতে ডিজির পূর্ণ নির্বাহী ক্ষমতা পুনরুদ্ধারের দাবি জানানো হয়েছে।
রবিবার সকালে পোষ্য সোসাইটির কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনিরের নেতৃত্বে একটি পাঁচ সদস্যের প্রতিনিধি দল গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকারের অন্তর্বর্তীকালীন সরকারের প্রধান উপদেষ্টার তেজগাঁও কার্যালয়ে এই স্মারকলিপি জমা দেন। প্রতিনিধি দলে আরও ছিলেন ভারপ্রাপ্ত সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রাজ্জাক মল্লিক, সাংগঠনিক সম্পাদক সাইদুজ্জামান শিপন, মহিলা বিষয়ক সম্পাদক নুরজাহান আক্তার এবং সদস্য এমদাদুল হক ও শামীম হোসেন।
ঐতিহাসিক, আইনগত ও সাংবিধানিক ভিত্তি তুলে ধরে স্মারকলিপিতে বলা হয়:
রেলওয়ে একটি রাষ্ট্রীয় পরিবহন ব্যবস্থা হিসেবে কেবল অর্থনীতির নয়, জাতীয় নিরাপত্তা ও সামাজিক সংহতির সঙ্গেও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। এর প্রতিষ্ঠার সূচনা থেকেই, বিশেষত ১৯৪৭ সালের পর বাংলাদেশ অংশে রেলওয়ে মহাব্যবস্থাপক তথা মহাপরিচালকের হাতে ছিল পূর্ণ প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা।
Railway Act, 1890 (সংশোধিত) এর ধারা ৩–৬ এবং ২৭-এ রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের প্রধান নির্বাহীর হাতে চূড়ান্ত কর্তৃত্বের বিধান রয়েছে।
এছাড়া Railway Establishment Code (Vol. 1 & 2), General Code (Vol. 1 & 2) এবং Government Servants (Conduct) Rules, 1979—এর Rule 5(2)-এ শৃঙ্খলা রক্ষায় সংস্থাপ্রধানের কর্তৃত্বের বিধান রয়েছে।
সংবিধানের ২১(১) ধারা অনুসারে—“প্রত্যেক সরকারি কর্মচারী জনগণের প্রতি দায়িত্বশীল হইবেন”— এবং ২৯(১) ধারায় মেধা, যোগ্যতা ও সুশাসনের ভিত্তিতে নিয়োগের নির্দেশনা রয়েছে। অথচ বাস্তবে রেলওয়ে ডিজির নির্বাহী ক্ষমতা প্রায় পুরোপুরি সংকুচিত করে ফেলা হয়েছে, যার ফলে স্বচ্ছতা, দক্ষতা ও জবাবদিহিতা মারাত্মকভাবে বিঘ্নিত হয়েছে।
বর্তমান বাস্তবতা তুলে ধরে স্মারকলিপিতে জানানো হয়:
বর্তমানে ডিজির দায়িত্ব কার্যত প্রতীকী; প্রতিদিন ৪০০–৫০০ ফাইল সই করাই তাঁর প্রধান কাজ হয়ে দাঁড়িয়েছে। প্রকল্প অনুমোদন, বাজেট বাস্তবায়ন, জনবল নিয়োগসহ প্রায় প্রতিটি সিদ্ধান্ত মন্ত্রণালয় বা বিভাগীয় স্তরে আটকে থাকে।
২০২২–২৩ অর্থবছরে বাংলাদেশ রেলওয়ের লোকসান দাঁড়িয়েছে প্রায় ১৮ হাজার কোটি টাকা (সূত্র: অর্থ মন্ত্রণালয়)। নিয়মিত ট্রেন সময়মতো পৌঁছায় না (৮৫% ব্যর্থতা), ৪৭% যান্ত্রিক সরঞ্জাম ও ৩২% কোচ অকেজো বা সীমিত সক্ষমতায় চলছে। ফলে যাত্রীসেবা, পণ্য পরিবহন ও আয় কমে গিয়ে রেল আজ ক্রমাগত লোকসানে যাচ্ছে।
আন্তর্জাতিক তুলনায় বাংলাদেশের রেল ব্যবস্থা পিছিয়ে পড়েছে, স্মারকলিপিতে এমনটিই বলা হয়েছে:
ভারতের রেল বোর্ড চেয়ারম্যান বা মালয়েশিয়া, থাইল্যান্ড, ইন্দোনেশিয়ার রেলপ্রধানেরা স্বতন্ত্র নীতিনির্ধারক হিসেবে কাজ করার পূর্ণ সুযোগ পান। ফলে এসব দেশে রেল লাভজনক ও আধুনিক পরিবহনব্যবস্থায় রূপ নিয়েছে। বাংলাদেশের রেলও একই পথে এগোতে ডিজিকে কার্যকরভাবে নির্বাহী ক্ষমতা প্রদান করা জরুরি।
স্মারকলিপিতে তিনটি সুস্পষ্ট প্রস্তাবনা উত্থাপন করা হয়:
১. বাংলাদেশ রেলওয়ে মহাপরিচালকের প্রশাসনিক ও আর্থিক ক্ষমতা পূর্ণভাবে পুনরুদ্ধার করে দ্রুত প্রজ্ঞাপন জারি করা;
২. বাংলাদেশ রেলওয়ে বোর্ড বা কমিশন গঠন করে মহাপরিচালককে নির্বাহী প্রধান হিসেবে নিয়োগ দেওয়া;
৩. ১৯৭৩ সালের রেলওয়ে নিয়োগ ও শৃঙ্খলা বিধিমালা পুনর্বহাল করা।
পোষ্য সোসাইটির সভাপতি মনিরুজ্জামান মনির বলেন, "একটি রাষ্ট্রায়ত্ত পরিবহন সংস্থায় জবাবদিহিমূলক ও দক্ষ প্রশাসনের প্রধান পূর্বশর্ত হলো স্বাধীন নির্বাহী প্রধান। আমরা সেই কাঠামো ফেরানোর দাবি জানাচ্ছি দেশের স্বার্থেই।"
প্রসঙ্গত, উক্ত স্মারকলিপির অনুলিপি সিনিয়র সচিব (জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়), সচিব (রেলপথ মন্ত্রণালয়) এবং মহাপরিচালক (বাংলাদেশ রেলওয়ে)-এর নিকট অবগতি ও প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ গ্রহণের অনুরোধসহ প্রেরণ করা হয়েছে।
বায়ান্ন/আরএস