উৎপাদন বেশি, সংরক্ষণাগারের অভাব, নগদ টাকার তাগিদ—এই তিন কারণে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে কৃষকরা লোকসান দিয়ে পেঁয়াজ বিক্রি করতে বাধ্য হচ্ছেন, বিশেষ করে মুড়িকাটা পেঁয়াজ ওঠার মৌসুমের শেষ দিকে বাজারদর উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যাওয়ায় কৃষকের ক্ষতি বাড়ছে। রাজশাহীর দুর্গাপুর উপজেলার কৃষক আল-আমিন ১০ কাঠা জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ করে প্রায় ৩৫ মণ উৎপাদন পেয়েছেন। তাঁর হিসাবে, প্রতি মণ পেঁয়াজ উৎপাদনে খরচ পড়েছে প্রায় এক হাজার ৩০০ টাকা। অথচ বাজারে তিনি বিক্রি করছেন প্রতি মণ মাত্র ৩৫০ থেকে ৪০০ টাকায়। এতে প্রতি কেজিতে দাম দাঁড়াচ্ছে ১০ টাকার কাছাকাছি। আল-আমিন বলেন, এই পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যায় না, তাই লোকসান হলেও বিক্রি করতে হচ্ছে। একই চিত্র পাবনার সুজানগরে। কৃষক আবু বকর জানান, তাঁর পেঁয়াজ উৎপাদনে বিঘাপ্রতি খরচ হয়েছে প্রায় ৮০ হাজার টাকা।
মণপ্রতি খরচ হয়েছে এক হাজার ৪০০ থেকে এক হাজার ৫০০ টাকা। কিন্তু পাইকারি বাজারে তিনি পাচ্ছেন প্রতি মণ ৬০০ থেকে এক হাজার টাকা। খুচরা পর্যায়ে কেজিপ্রতি বিক্রি হচ্ছে ১৫ থেকে ২০ টাকায়। সংরক্ষণগারের অভাবে লোকসান দিয়ে বিক্রি করতে হচ্ছে—এমন অভিযোগও করেছেন কোনো কোনো কৃষক। কৃষিবিদরা বলছেন, সারা দেশে মুড়িকাটা পেঁয়াজের লোকসানের চিত্র এমনই। আর্থিক ক্ষতির মুখে পড়েছেন চাষিরা। লোকসানের ভয়ে আগামী মৌসুমে তাঁরা পেঁয়াজ আবাদ কমিয়ে দিতে পারেন এমন শঙ্কাও রয়েছে। কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, অনেক কৃষকই সার, বীজ ও কীটনাশক বাকিতে কিনে থাকেন। ফলে ঋণ পরিশোধের চাপেই তাঁরা লোকসান মেনেও দ্রুত পণ্য বিক্রি করে দেন।
দুর্গাপুর উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা সাহানা পারভীন লাবনী বলেন, সংরক্ষণের সুযোগ থাকলেও নগদ টাকার প্রয়োজনের কারণে কৃষকরা পেঁয়াজ ধরে রাখতে পারেন না। ডিসেম্বরের শেষ থেকে মার্চ পর্যন্ত মুড়িকাটা পেঁয়াজ বাজারে আসে। মৌসুমের শুরুতে দাম তুলনামূলক বেশি থাকলেও মার্চে এসে তা উৎপাদন খরচের নিচে নেমে যায়। চলতি বছরের শুরুতে রাজধানী ঢাকার খুচরা বাজারে মুড়িকাটা পেঁয়াজের কেজি ছিল ৬০ থেকে ৭০ টাকা, পরে কোনো কোনো এলাকায় ৪৫ থেকে ৫০ টাকায় নামে। আবার ডিসেম্বরের শুরুতে এই পেঁয়াজের দাম ছিল ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা। কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪-২৫ অর্থবছরে দেশে প্রায় তিন লাখ হেক্টর জমিতে পেঁয়াজ আবাদ করে উৎপাদন হয়েছে ৪৪ লাখ ৪৮ হাজার ৭০০ টন। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তিন লাখ হেক্টরের বেশি জমিতে পেঁয়াজ চাষ করা হয়। তবে এর মধ্যে প্রায় ২৫ শতাংশ তোলা হয়েছে। সে হিসাবে ৭৫ হাজার হেক্টর জমির উৎপাদন থেকে প্রায় ১১ লাখ টন পেঁয়াজ পাওয়া গেছে। পাবনা জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মো. জাহাঙ্গীর আলম প্রামাণিক কালের কণ্ঠকে জানান, এই জেলায় আট হাজারের বেশি হেক্টর জমিতে মুড়িকাটা পেঁয়াজ আবাদ করা হয়েছে। পেঁয়াজের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছিল এক লাখ ৪২ হাজার ৩১৫ টন। কিন্তু উৎপাদন হয়েছে এক লাখ ৫০ হাজার টন। তবে পেঁয়াজের বাজারদর কম।
তিনি জানান, এখানকার পেঁয়াজের উৎপাদন খরচ কেজিপ্রতি ৩০ টাকা। আর কৃষকদের পেঁয়াজ বিক্রি করতে হচ্ছে ২০ টাকায়। তিনি আরো জানান, বৃষ্টির কারণে ক্ষতিগ্রস্ত পেঁয়াজ সংরক্ষণ করা যাবে না। পেঁয়াজ সংরক্ষণে এয়ার ফ্লো মেশিন দেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, নগদ টাকার প্রয়োজনে কৃষকরা এই পেঁয়াজ বিক্রি করে দেন। এ ছাড়া কৃষকরা পেঁয়াজ পরিপক্ব হওয়ার আগেই তুলে ফেলেন; এ কারণে এই পেঁয়াজ বেশিদিন সংরক্ষণ করার সুযোগ কম। তাই একপ্রকার বাধ্য হয়ে কৃষক বিক্রি করে দেন।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের অতিরিক্ত উপপরিচালক মোহাম্মদ বেলায়েত হোসেন জানান, দেশে মুড়িকাটা পেঁয়াজের উৎপাদন প্রায় ১০ লাখ টনের কাছাকাছি। তবে অঞ্চলভেদে উৎপাদন খরচ ভিন্ন। কোথাও কেজিপ্রতি ৩২ টাকা, কোথাও ৪০ টাকার বেশি খরচ হচ্ছে। কৃষিবিদরা মনে করেন, সংরক্ষণ সুবিধা বাড়ানো গেলে কৃষকের ক্ষতি অনেকটাই কমানো সম্ভব। কৃষিবিদ ড. মোহা. মাসুদুল হক ঝন্টু বলেন, কৃষকরা যদি অন্তত ৪০ দিন পেঁয়াজ সংরক্ষণ করতে পারেন, তাহলে পরে ভালো দাম পেতে পারেন। তবে তিনি জানান, সম্প্রতি শিলাবৃষ্টিতে অনেক এলাকায় পেঁয়াজ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে, যা সংরক্ষণ করা সম্ভব নয়। তিনি বলেন, দেশে উৎপাদন বাড়লেও সংরক্ষণ ও বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতার কারণে কৃষক ন্যায্যমূল্য পাচ্ছেন না। এ অবস্থায় আমদানি নিয়ন্ত্রণ এবং আধুনিক সংরক্ষণ ব্যবস্থা গড়ে তোলার ওপর জোর দেন তিনি।