আহ্বায়ক, সদস্যসচিবসহ তিন সদস্যের পদত্যাগের কারণে আবারও নেতৃত্ব সংকটে পড়েছে প্রেসক্লাব যশোর। সংকট কাটিয়ে স্বাভাবিক ধারায় ফেরার আগেই ফের বড় ধাক্কা খেল যশোরের এই ঐতিহ্যবাহী প্রতিষ্ঠানটি। সংকটকালীন কমিটির আহ্বায়ক একরাম উদ-দ্দৌলা, সদস্যসচিব মবিনুল ইসলাম মবিন ও সদস্য ওহাবুজ্জামান ঝন্টু রোববার পদত্যাগ করেছেন। একই দিনে শীর্ষ দুই নেতাসহ তিনজনের পদত্যাগের ঘটনায় সাধারণ সদস্যদের মধ্যে নতুন করে উদ্বেগ, হতাশা ও নানা আলোচনার সৃষ্টি হয়েছে।
রোববার (৩০ আগস্ট) দুপুর ১টা ১০ মিনিটে ব্যক্তিগত কারণ দেখিয়ে আহ্বায়ক একরাম উদ-দ্দৌলার কাছে পদত্যাগপত্র জমা দেন সদস্যসচিব মবিনুল ইসলাম মবিন। এর দুই ঘণ্টা পর বিকেল সাড়ে ৩টায় আহ্বায়ক পদ থেকে সরে দাঁড়ান প্রবীণ সাংবাদিক একরাম উদ-দ্দৌলা। একই সঙ্গে পদত্যাগ করেন কমিটির সদস্য ওহাবুজ্জামান ঝন্টু। পদত্যাগের পর তারা আর কোনো দায়িত্বে থাকছেন না বলেও জানিয়েছেন।
পদত্যাগপত্রে পৃথক কারণ উল্লেখ করা হলেও উভয়ের বক্তব্যে প্রেসক্লাবের চলমান সংকট, নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালনের সীমাবদ্ধতা এবং ব্যক্তিগত ও পেশাগত চাপের বিষয় উঠে এসেছে।
আহ্বায়ক একরাম উদ-দ্দৌলা তার পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করেন, প্রেসক্লাব যশোর পরিচালনা ও নির্বাচনসহ বিভিন্ন গঠনতান্ত্রিক বিষয়ে প্রশ্ন ও বিতর্কের প্রেক্ষাপটে গত ৬ আগস্ট বিশেষ সাধারণ সভায় সংকটকালীন আহ্বায়ক কমিটি অনুমোদন করা হয়। ওই সভায় তাকে আহ্বায়ক করে ১৪ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছিল।
বয়সজনিত শারীরিক অসুস্থতা সত্ত্বেও প্রেসক্লাবের সংকট নিরসন, ঐক্য, স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার প্রত্যয় নিয়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেছিলেন। দায়িত্ব নেওয়ার পর কিছু গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপও নেওয়া হয়। তবে সার্বিক পরিস্থিতিতে সব কার্যক্রম প্রত্যাশিত ও নিরপেক্ষভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হয়নি বলে তিনি মনে করেন।
একরাম উদ-দ্দৌলা বলেন, বিভিন্ন বিষয়ে আপত্তি জানানো সত্ত্বেও প্রেসক্লাব যশোরের দীর্ঘদিনের সুনাম, স্বার্থ ও সাংবাদিকদের ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হচ্ছে না। এমন পরিস্থিতিতে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন করতে না পারায় তার দীর্ঘ সাংবাদিকতা জীবন এবং প্রেসক্লাবের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে। একই সঙ্গে দীর্ঘদিনের পরিচিতদের কাছেও তিনি অনাকাঙ্ক্ষিতভাবে প্রশ্নবিদ্ধ হচ্ছেন।
এ অবস্থায় বিলম্ব হলেও বর্তমান পরিস্থিতিতে দায়িত্ব থেকে সরে দাঁড়ানোই সমীচীন বলে মনে করছেন তিনি। ব্যক্তিগত অসুস্থতা ও বয়সজনিত শারীরিক সমস্যাকেও পদত্যাগের অন্যতম কারণ হিসেবে উল্লেখ করেছেন।
অন্যদিকে সদস্যসচিব মবিনুল ইসলাম মবিন তার পদত্যাগপত্রে জানান, প্রেসক্লাব যশোরের নির্বাহী কমিটির বিভিন্ন অনিয়মতান্ত্রিক পদক্ষেপের বিরুদ্ধে গত জুলাই থেকে সাংবাদিক ইউনিয়ন যশোর আন্দোলন শুরু করে। এর ধারাবাহিকতায় প্রেসক্লাবের সংকট নিরসনে গত ৬ আগস্ট আহ্বায়ক কমিটি গঠন করা হয়।
পেশাগত ব্যস্ততার কারণে শুরুতে দায়িত্ব নিতে অনাগ্রহ প্রকাশ করলেও যৌথ কমিটির সভায় তাকে সদস্যসচিবের দায়িত্ব দেওয়া হয়। পরে সদস্যদের বৃহত্তর স্বার্থ ও সবার সমর্থনের প্রতি সম্মান জানিয়ে তিনি দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
দায়িত্ব পালনকালে প্রেসক্লাবের গঠনতন্ত্র সংশোধন, সদস্যপদ প্রদান এবং অডিট কার্যক্রম শুরুর মতো বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ কাজ সম্পন্ন হয়েছে বলে উল্লেখ করেন তিনি।
তবে প্রেসক্লাবের কার্যক্রমে অতিরিক্ত ব্যস্ত থাকার কারণে নিজ পত্রিকার কাজে প্রয়োজনীয় সময় দিতে পারেননি বলে জানান মবিন। এতে তিনি আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হওয়ার পাশাপাশি তার পেশাগত ভাবমূর্তিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বলে পদত্যাগপত্রে উল্লেখ করা হয়।
সামনে নির্বাচন, শীর্ষ দুই দায়িত্বশীলের পদত্যাগে নতুন প্রশ্ন প্রেসক্লাব যশোরের চলমান সংকটের মধ্যেই আগামী ১৯ সেপ্টেম্বর নির্বাচন অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা রয়েছে। সদস্যপদসহ বিভিন্ন দাবিতে সাংবাদিকদের আন্দোলনের পর গত ৬ আগস্ট বিশেষ সাধারণ সভায় সংকটকালীন আহ্বায়ক কমিটির অনুমোদন দেওয়া হয়েছিল।
নতুন সদস্যপদ দেওয়ার জন্য আবেদন ফরম বিক্রি শুরু হলে ১০১ জন ফরম সংগ্রহ করেন। এর মধ্যে ৯৫ জন আবেদন জমা দেন। যাচাই-বাছাই শেষে এক দফায় ২৮ জনকে সদস্যপদ দেওয়া হয়। পাশাপাশি একজনের আবেদনের প্রেক্ষিতে তার সদস্যপদ ফিরিয়ে দেওয়া হয়।
পরবর্তীতে গত ২৯ আগস্ট পুনঃমূল্যায়নে সদ্য দেওয়া দুজনের সদস্যপদ বাতিল করা হয় এবং ১০ জনকে নতুন করে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। তবে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিব মনে করেন, এতে নিরপেক্ষভাবে দায়িত্ব পালন এবং সাংবাদিকদের স্বার্থ ও ঐক্য অক্ষুণ্ন রাখা সম্ভব হয়নি। ফলে সংকটকালীন কমিটির শীর্ষ দুই নেতার পদত্যাগে নির্বাচন ও পরবর্তী কার্যক্রম নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে।
রোববার সকালে দৈনিক রানার পত্রিকার সম্পাদক শহীদ আরএম সাইফুল আলম মুকুলের ২৮তম হত্যাবার্ষিকী উপলক্ষে আয়োজিত বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়েছিলেন সদস্যসচিব মবিনুল ইসলাম মবিন। এর কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তার পদত্যাগের খবর আসে। পরে বিকেলে আহ্বায়ক একরাম উদ-দ্দৌলার পদত্যাগের ঘটনায় পরিস্থিতি আরও জটিল হয়ে ওঠে।
একই দিনে আহ্বায়ক ও সদস্যসচিবের পদত্যাগে প্রেসক্লাব যশোরের সংকটকালীন আহ্বায়ক কমিটি কার্যত নতুন অনিশ্চয়তার মুখে পড়েছে। সামনে নির্বাচন, সদস্যপদ নিয়ে বিতর্ক এবং সাংগঠনিক সংকটের মধ্যে পরবর্তী সিদ্ধান্ত কী হয়—সেদিকেই তাকিয়ে রয়েছেন সাধারণ সদস্যরা।