ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে ঢাকাস্থ বিদেশি কূটনীতিকদের মনোযোগ এখন ভোটের মাঠে। প্রভাবশালী দেশের কূটনীতিকরা রাজনৈতিক দল, সরকারের উপদেষ্টা, নির্বাচন কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্থার সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে অবাধ, সুষ্ঠু, গ্রহণযোগ্য, অংশগ্রহণমূলক ও নিরপেক্ষ নির্বাচন দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন তারা। নির্বাচন সামনে রেখে ঢাকাস্থ মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট : ক্রিস্টেনসেন, চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, যুক্তরাজ্যের হাইকমিশনার সারাহ কুক, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার একাধিক রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন।
একই সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে অনেকেই নির্বাচন কমিশনে গিয়েও বৈঠক করেছেন। তারা নির্বাচনের প্রস্তুতি সম্পর্কে জানার আগ্রহ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের নির্বাচনী ইশতেহারেও বিদেশি কূটনীতিকদের আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। মার্কিন রাষ্ট্রদূত ব্রেন্ট ক্রিস্টেনসেন নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান, জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমান, স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টা জাহাঙ্গীর আলম চৌধুরী, প্রধান নির্বাচন কমিশনার এ এম এম নাসির উদ্দিনের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। স্বরাষ্ট্র উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকে মার্কিন রাষ্ট্রদূত নির্বাচনী নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে অন্তর্বর্তী সরকারের পদক্ষেপ জেনেছেন। একই সঙ্গে প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে বৈঠকে গণতান্ত্রিক ও শান্তিপূর্ণ নির্বাচন আয়োজনের অগ্রগতি সম্পর্কে জানতে চেয়েছেন তিনি।
ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন বিএনপি, জামায়াতে ইসলামী, জাতীয় নাগরিক পার্টির শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। এসব বৈঠকে বাংলাদেশের রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে গভীর সম্পর্ক গড়ার বার্তা দিয়েছে চীন। ঢাকায় নিযুক্ত ব্রিটিশ হাইকমিশনার সারাহ কুক বিএনপি চেয়ারম্যান তারেক রহমান ও জামায়াতে ইসলামীর আমির শফিকুর রহমানের সঙ্গে সম্প্রতি বৈঠক করেছেন। উভয় বৈঠকে বাংলাদেশে অবাধ, সুষ্ঠু, বিশ্বাসযোগ্য এবং শান্তিপূর্ণ নির্বাচনের জন্য যুক্তরাজ্যের উৎসাহ পুনর্ব্যক্ত করেছেন।
কূটনীতিকদের আগ্রহ বিএনপির ইশতেহারে : ঢাকার বিদেশি কূটনীতিকদের মধ্যে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলের ইশতেহারেও আগ্রহ লক্ষ্য করা গেছে। বিএনপির নির্বাচন ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে ৩৮টি দেশের কূটনীতিকরা অংশ নেন। ইশতেহারে বিএনপির পররাষ্ট্রনীতি কী হবে, সে বিষয়ে এসব কূটনীতিকদের আগ্রহই বেশি ছিল।
ইশতেহার ঘোষণা অনুষ্ঠানে ঢাকায় নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূত ইয়াও ওয়েন, পাকিস্তানের হাইকমিশনার ইমরান হায়দার, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত মাইকেল মিলার অংশ নেন। এ ছাড়াও মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ভারত, রাশিয়া, যুক্তরাজ্যসহ বিভিন্ন দেশের কূটনীতিকরা অংশ নিয়েছেন।
নির্বাচন পর্যবেক্ষণে ইইউ : নির্বাচন সামনে রেখে ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রায় ২০০ জন পর্যবেক্ষক মাঠে রয়েছেন। নির্বাচনী প্রস্তুতির শেষ ধাপ পর্যবেক্ষণ করতে ঢাকায় এসেছেন ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রধান পর্যবেক্ষক ইভারস ইজাবস। তিনি ঢাকা ছাড়াও জেলা পর্যায়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ অংশীজনদের সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন। প্রধান পর্যবেক্ষক নির্বাচন কমিশন, রাজনৈতিক দল, বিচারিক সমাজ, অন্তর্বর্তীকালীন সরকার, গণমাধ্যম, নাগরিক সমাজ, তরুণ কর্মী এবং ভোটারদের সঙ্গে বৈঠক করবেন। তিনি ভোটের শুরু থেকে ব্যালট গণনা শেষ হওয়া পর্যন্ত নির্বাচনের দিনের কার্যক্রম পর্যবেক্ষণ করবেন এবং ফলাফল সারণিকরণের প্রক্রিয়া অনুসরণ করবেন।
আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ইভারস ইজাবস ঢাকায় এক সংবাদ সম্মেলনের মাধ্যমে প্রাথমিক তথ্য ও সিদ্ধান্ত সম্বলিত ইইউ পর্যবেক্ষক দলের প্রাথমিক বিবৃতি দেবেন। নির্বাচনের পরবর্তী পরিবেশ পর্যবেক্ষণের জন্য ইইউ পর্যবেক্ষক দল নির্বাচনের পরেও বেশ কিছুদিন সারা দেশে অবস্থান করবে। যুক্তরাষ্ট্রের কংগ্রেসম্যানদের ভোটে উৎসাহ : বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচনে শুধু ঢাকার বিদেশি কূটনীতিকরা যে চোখ রাখছেন তা নয়, এর বাইরে বিদেশ থেকেও অনেকেই এই নির্বাচন পর্যবেক্ষণে রয়েছেন। বাংলাদেশে যাতে নির্বাচন অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরাপদ হয়, তা নিশ্চিত করতে বাংলাদেশ সরকারের প্রতি সহায়তা এবং নিরপেক্ষ পর্যবেক্ষণ দিতে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্কো রুবিওকে ইতোমধ্যেই চিঠি লিখেছেন মার্কিন সিনিয়র কংগ্রেসম্যান জো উইলসন এবং নাইল পাও। চিঠিতে বাংলাদেশের জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোট সামনে রেখে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তরের সক্রিয় ভূমিকা কামনা করেছেন মার্কিন কংগ্রেসের এই সদস্যরা।
চিঠিতে বলা হয়, আগামী ১২ ফেব্রুয়ারি বাংলাদেশের ভোটাররা ব্যালটের মাধ্যমে নিজেদের মত প্রকাশ এবং দেশের ভবিষ্যৎ নির্ধারণের গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ পাবেন। অন্তর্বর্তী সরকারের নেয়া সংস্কারের ধারাবাহিকতায় এই নির্বাচন একটি ইতিবাচক অগ্রগতির সুযোগ তৈরি করেছে বলেও উল্লেখ করা হয়। কংগ্রেস সদস্যরা পররাষ্ট্র দপ্তরকে অন্তর্বর্তী সরকারের সঙ্গে সমন্বয় করে নির্বাচনকে অবাধ, সুষ্ঠু ও নিরাপদ করতে প্রয়োজনীয় সহায়তা দেওয়ার অনুরোধ জানান।
এ বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্রের পররাষ্ট্র দপ্তর কী ধরনের পদক্ষেপ নিচ্ছে, সে সম্পর্কে কংগ্রেস সদস্যদের দপ্তরগুলোকে অবহিত রাখার অনুরোধ জানানো হয়েছে চিঠিতে। পাশাপাশি ১২ ফেব্রুয়ারির আগেই এ বিষয়ে একটি ব্রিফিং দেওয়ারও অনুরোধ করা হয়েছে। নির্বাচন নিয়ে জাতিসংঘের প্রত্যাশা : বাংলাদেশের জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে জাতিসংঘ বলেছে, নির্বাচনে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সব ব্যক্তি নির্ভয়ে ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশ নিতে পারবেন। জাতিসংঘের সদর দপ্তরে এক সংবাদ ব্রিফিংয়ে সাংবাদিকদের মুখোমুখি হয়ে মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেসের উপমুখপাত্র ফারহান হক বলেছেন, আমরা অবশ্যই নির্বাচন আয়োজনকে উৎসাহিত করি। জাতিসংঘের পুরো ব্যবস্থায় আমরা এটি স্পষ্ট করে দিয়েছি যে, নির্বাচনে এমন একটি পরিবেশ নিশ্চিত করা গুরুত্বপূর্ণ, যেখানে সব ব্যক্তি নির্ভয়ে ও শান্তিপূর্ণভাবে প্রকাশ্য রাজনৈতিক কর্মকাণ্ডে অংশগ্রহণ করতে পারেন এবং স্বাধীনভাবে ভিন্নমত প্রকাশ করতে পারেন।
বাংলাদেশের নির্বাচনে বিদেশিদের আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলে সাবেক রাষ্ট্রদূত মুন্সী ফয়েজ আহমদ বলেন, নির্বাচন সামনে রেখে রাজনৈতিক দলগুলোর সঙ্গে বিদেশি কূটনীতিকদের বৈঠক একটি স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ভোট সামনে রেখে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্রদূতরা বোঝার চেষ্টা করেন, রাজনৈতিক দলগুলো কী চায়। আমি নিজেও বিভিন্ন দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্ব পালনকালে সেসব দেশে নির্বাচনের আগে খোঁজ খবর নিতাম। এটা দোষের কিছু নয়। বাংলাদেশের নির্বাচনে বিদেশিদের আগ্রহ নিয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র উপদেষ্টা তৌহিদ হোসেন বলেন, প্রত্যেক দেশেরই ইচ্ছাকৃত বা অনিচ্ছাকৃত কিছু ট্রাডিশন দাঁড়িয়ে যায়। ভারতে যেমন এক ধরনের ট্রাডিশন দাঁড়িয়ে গেছে। আমাদের এখানেও এমন আছে। এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে যে, এখানের যারা কূটনৈতিক কমিউনিটি আছেন, তারা এটা নিয়ে কথা বার্তা বলেন, আমারও অনেক সময় মনে হয় যে, আমাদের সমাজেরও একটি বড় অংশ চায় তারা এ বিষয়ে কথা বলুক। কাজেই তাদের আমি দোষ দিতে পারি না। এটা আমাদের সংস্কৃতির অংশ হয়ে গেছে।