ঢাক-ঢোলের তালে তালে মাঠ জুড়ে লাঠির ঝঙ্কার, দর্শকদের উল্লাসে মুখর প্রান্তর
এ যেন হারিয়ে যাওয়া বাংলার লোকঐতিহ্যের জীবন্ত প্রতিচ্ছবি। জয়পুরহাট জেলার ক্ষেতলাল উপজেলার মাহমুদপুর ইউনিয়নের দেওগ্রামে প্রতি বছর আয়োজিত হয় শতবর্ষের ঐতিহ্যবাহী লাঠিখেলা মেলা।
এই মেলা কেবল একটি গ্রামীণ ক্রীড়া নয়; এটি প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে গ্রামীণ সমাজের সাহস, ঐক্য ও মর্যাদার প্রতীক হিসেবে টিকে আছে।
স্থানীয় প্রবীণদের মতে, ব্রিটিশ শাসনামলে দেওগ্রামের জমিদার প্রহরীদের কৌশল ও বীরত্ব প্রদর্শনের মাধ্যম হিসেবে এই লাঠিখেলার সূচনা করেন। ধীরে ধীরে এটি রূপ নেয় এক উৎসবে, যা গ্রামীণ সংস্কৃতির অবিচ্ছেদ্য অংশ হয়ে ওঠে।
লাঠিখেলার প্রতিটি চাল, প্রতিটি ঘূর্ণন যেন বীরত্বের এক শিল্পরূপ। লাঠির ঝঙ্কারে জেগে ওঠে বাংলার প্রাচীন রণসংস্কৃতি, যা আজও স্মরণ করিয়ে দেয় পূর্বপুরুষের বীরত্বগাথা।
লাঠিখেলা এক দর্শক আব্বাস আলী বলেন, আমরা ছোটবেলা থেকে এই লাঠিখেলা দেখে বড় হয়েছি। তখনকার দিনে এটাই ছিল গ্রামের সবচেয়ে বড় বিনোদন। আজও সেই স্মৃতি জাগে।
তরুণ প্রজন্মও এই ঐতিহ্য রক্ষায় এগিয়ে এসেছে। খেলোয়াড়দের এক তরুণ সদস্য জানান, লাঠিখেলা শুধু ক্রীড়া নয়, এটা আমাদের পূর্বপুরুষের ঐতিহ্য। আমরা চাই নতুন প্রজন্ম যেন এটি জানে, শেখে ও লালন করে।
প্রতি বছর এ মেলাকে ঘিরে এলাকাজুড়ে সৃষ্টি হয় উৎসবের আমেজ। মেলার মাঠে বসে দেশি পণ্যের দোকান, বাজে ঢাক-বাঁশি, আর দূর-দূরান্ত থেকে মানুষ ভিড় জমায়। এক দর্শক বলেন, এমন আয়োজন এখন খুব কমই দেখা যায়। এই মেলা আমাদের শেকড়ের সঙ্গে যুক্ত করে রাখে।
আধুনিকতার ছোঁয়ায় গ্রামীণ সংস্কৃতির অনেক কিছুই বিলীন হয়ে গেলেও দেওগ্রামের এই লাঠিখেলা এখনো টিকে আছে ইতিহাস ও ঐতিহ্যের অক্ষয় প্রতীক হয়ে।
সূর্যাস্তের আলোয় যখন মাঠে ঝলসে ওঠে লাঠির আঘাতের ঝঙ্কার আর দর্শকদের করতালি তখন মনে হয়, বাংলার বীরত্বগাথা এখনো জীবন্ত আছে দেওগ্রামের এই শতবর্ষের মেলায়।