দুজনের ক্রীড়া শিক্ষার জীবন শুরু হয়েছিল এক সঙ্গেই। ২০১৭ সালে ভর্তি হন বাংলাদেশ ক্রীড়া শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে (বিকেএসপি)। সেখানে হকির পাঠ নেওয়ার মাধ্যমে সেই যে শুরু আমিরুল ইসলাম ও রাকিবুল হাসানের, এরপর কখনোই তাঁদের পথ আলাদা হয়ে যায়নি। একসঙ্গে, একই ছন্দে এগিয়েছেন তাঁরা।
যুব দল হয়ে জাতীয় দলেও জায়গা করে নেওয়া হাত ধরাধরি করে। অভিজ্ঞদের ভিড়ে সিনিয়র দলে সুযোগ কম পেলেও ভীষণ সম্ভাবনার ঝিলিক দেখিয়ে আসছিলেন দুজনই। তাতে প্রত্যাশাও তৈরি হয় তাঁদের ঘিরে। এক সুতোয় গাঁথা দুই বন্ধুজুনিয়র বিশ্বকাপে গিয়ে এরই সমান্তরালে নিজেদের মেলে ধরেছেন তাঁরা।
ছয় ম্যাচের পাঁচটিতে হ্যাটট্রিক করে বিশ্বকে চিনিয়েছেন আমিরুল। প্রতিপক্ষ খেলোয়াড়দের মুখেও এখন তাঁকে নিয়ে স্তুতিবাক্য। আর পাঁচ গোল করা রাকিবুলও বন্ধুর জন্য গোলের ডালি সাজিয়ে দেওয়া পারফরম্যান্সে নজর কেড়েছেন। দুই বন্ধুর অনবদ্য নৈপুণ্যে বিশ্বকাপ থেকে খালি হাতে ফিরতে হয়নি বাংলাদেশকেও।
চ্যালেঞ্জার ট্রফি জেতার পথে একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে দুই বন্ধুর এক সুতোয় গাঁথা সাফল্যের পর আমিরুল-রাকিবুলরাও ভেসেছেন স্বপ্নপূরণের আনন্দে।
‘বিশ্বকাপে তো সবাই পারফরম করতে চায়। আমরা চাইতাম এ রকম কিছু করে দেখাতে। গত বছর যখন বিশ্বকাপে জায়গা করে নিই, তখন থেকেই মনের ভেতর এই ভাবনা কাজ করত যে কিছু করে দেখাতে হবে। সেই তাড়না থেকেই এবার বিশ্বকাপে কিছু করে দেখাতে পেরেছি।
সত্যি বলতে স্বপ্নের মতো একটি টুর্নামেন্ট কাটিয়েছি আমি। এই সাফল্যে আমার চেয়েও দলের বাকিদের অবদান বেশি’, বলেছেন আসরে সর্বোচ্চ ১৮ গোল করা আমিরুল। তাঁর মতো গোলের বন্যা বইয়ে দিতে না পারলেও দলের অন্যতম পারফরমার হিসেবে বিবেচিত হয়েছেন রাকিবুলও। কোচ সিগফ্রায়েড আইকম্যানও এই ফরোয়ার্ডের প্রশংসা করেছেন। আমিরুলের গোলে রাকিবুলের অবদানই সবচেয়ে বেশি দেখেছেন ডাচ এই কোচ। পেনাল্টি কর্নারে আমিরুলের করা বেশির ভাগ গোলেরই যে উত্স ছিলেন তিনি। রাকিবুল পেনাল্টি কর্নার আদায় করেছেন, তা থেকে গোল এনে দিয়েছেন আমিরুল। টুর্নামেন্টজুড়ে এই গল্প বারবার লিখেছেন দুই বন্ধু। তাতে ভীষণ খুশি রাকিবুলও, ‘আমি সবচেয়ে বেশি খুশি আমিরুলের জন্য। বাংলাদেশের একজন বিশ্বকাপের মঞ্চে সর্বোচ্চ গোলদাতার তালিকায় আছে। এটি দেখতে পাওয়াটা অন্য রকম আনন্দ দেয়। আমিরুল আমার বন্ধু, অনেক কাছের একজন। অনেক ছোট থেকে আমরা একসঙ্গে আছি। তো আমাদের স্বপ্নই ছিল এ রকম (বড় মঞ্চে সর্বোচ্চ গোলদাতা হওয়া)। যাক একজন তো পাচ্ছি, এ জন্য আমরা সবাই খুশি।’
আট বছরেরও বেশি সময় ধরে একসঙ্গে আছেন আমিরুল ও রাকিবুল। দিন যত গেছে, বন্ধুত্ব তত গাঢ় হয়েছে। খেলার পাশাপাশি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে একই বিভাগে পড়াশোনাও করছেন তাঁরা। খেলার মাঠেও একসঙ্গে এত দিন ধরে থাকাটা দারুণ কাজে দিয়েছে। বন্ধু আমিরুলের মতো বেশি গোল করতে না পারা নিয়ে অবশ্য আক্ষেপ নেই রাকিবুলের, ‘আক্ষেপ বা কোনো খারাপ লাগা কাজ করেনি। আপনি গোলের ভিডিও দেখলে লক্ষ করে থাকবেন যে আমিরুল গোল করলে ওর থেকে বেশি উদযাপন আমিই করতাম।’ দুজনের এখন নিজেদের সিনিয়র পর্যায়ে মেলে ধরার চ্যালেঞ্জ। তাঁদের ভাবা হচ্ছে দেশের হকির ভবিষ্যত্। সিনিয়র দলের হয়েও বিশ্বকাপ খেলার স্বপ্ন দেখেন আমিরুল, ‘বিশ্বকাপ আসলে অন্য রকম একটি জায়গা। অনেক রোমাঞ্চ কাজ করে এখানে। খেলতে চাই সিনিয়র বিশ্বকাপেও।’
রাকিবুল অবশ্য ঘরোয়া হকিতে নিয়মিত লিগ না হওয়ার বিষয়টিও মনে করিয়ে দিতে ভুললেন না। আর্থিক সংকটে সব আন্তর্জাতিক টুর্নামেন্টেও অংশ নেওয়া হয় না। এসব অপূর্ণতা ঘুচলে তবেই হকি এগিয়ে যাবে বলে মনে করেন তিনি, ‘আমাদের চাওয়া হকি খেলা মাঠে থাকুক। প্রিমিয়ার কিংবা ফ্র্যাঞ্চাইজি লিগ, যেটিই হোক না কেন। খেলতে পারলে উন্নতির সুযোগ থাকে। খেলোয়াড়রা যদি খেলতে না পারে তাহলে ফিট থাকবে কিভাবে? সাফল্য আসবে কিভাবে? এত দিন বলা হতো, হকিতে সাফল্য নেই। আমরা বিশ্বকাপে সাফল্য এনে দিয়েছি, এখন অন্তত হকির উন্নয়নে এগিয়ে আসুক সবাই।’ আগ্রহীদের সামনে আপাতত এক সুতোয় গাঁথা দুই বন্ধু তো উদাহরণ হিসেবে আছেনই!