ঝিনাইদহের কালীগঞ্জ উপজেলার শমসেরনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজে অধ্যক্ষের সহায়তায় জাল সনদ দিয়ে এক শিক্ষকের চাকরি করার প্রমাণ মিলেছে। অভিযুক্ত শিক্ষক দর্শন বিষয়ের প্রভাষক মোছা. নাসরিন নাহার বর্তমানে প্রতিষ্ঠানটিতে কর্মরত আছেন এবং প্রতি মাসে নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা তুলছেন। আর এ কাজে কলেজটির অধ্যক্ষ মো. সফিকুল ইসলামের সম্পৃক্ততার তথ্য পাওয়া গেছে। বিপুল পরিমাণ টাকার বিনিময়ে তিনি এই জাল সনদধারীকে কলেজের প্রভাষক পদে চাকরি দিয়েছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
অনুসন্ধানে জানা গেছে, ২০১০ সালের ১৫ নভেম্বর দর্শন বিষয়ে প্রভাষক পদে কালীগঞ্জ উপজেলার তৎকালীন 'জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেমোরিয়াল মহাবিদ্যালয়'-এ যোগদান করেন নাসরিন নাহার; যার বর্তমান নাম শমশেরনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজ। কলেজটি তৎকালীন আওয়ামী লীগ সরকার নির্বাহী আদেশে সরকারিকরণের সিদ্ধান্ত নেয়। এরপর মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তর (মাউশি) ২০২০ সালের ৫ মার্চ কলেজটি পরিদর্শন করে। মাউশির পরিদর্শনের পর সরকার ২০২১ সালের ১১ আগস্ট কলেজটি সরকারিকরণের আদেশ জারি করে।
পরবর্তীতে কলেজ সরকারিকরণ-পরবর্তী শিক্ষক-কর্মচারী আত্তীকরণ (পদ সৃজন ও অস্থায়ী নিয়োগ) কার্যক্রম শুরু করার পূর্বেই বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষ (এনটিআরসিএ) কর্তৃক শিক্ষকদের নিবন্ধন সনদ যাচাইয়ের জন্য ২০২১ সালের ১ সেপ্টেম্বর এনটিআরসিএর কাছে আবেদন করে কলেজ কর্তৃপক্ষ। একই বছরের ২১ সেপ্টেম্বর এনটিআরসিএ তাদের ওয়েবসাইটে সহকারী পরিচালক তাজুল ইসলাম স্বাক্ষরিত কলেজের সকল শিক্ষকের নিবন্ধন সনদ যাচাইয়ের তালিকা প্রকাশ করে। সেখানে এনটিআরসিএর মন্তব্যের ঘরে উল্লেখ করা হয়, দর্শন বিষয়ের প্রভাষক মোছা. নাসরিন নাহারের সনদটি জাল ও ভুয়া। একই সাথে উক্ত শিক্ষকের বিরুদ্ধে কলেজ কর্তৃপক্ষকে থানায় মামলা দায়ের করে অফিসকে অবহিত করার নির্দেশ প্রদান করা হয়। এর পরদিন থেকে নাসরিন নাহার কলেজে আসা বন্ধ করে দেন।
জালিয়াতি করা শিক্ষকের সনদে দেখা যায়, তিনি ২০০৯ সালের ৫ম শিক্ষক নিবন্ধন পরীক্ষার সনদ দিয়ে প্রভাষক পদে কলেজটিতে যোগদান করেন, যার রোল নম্বর ৪০৭১১৩৯৭। সনদের ফলাফলে উল্লেখ করা হয়েছে, তিনি আবশ্যিক বিষয়ে ৫৩ ও ঐচ্ছিক বিষয়ে ৫৫ নম্বর পেয়েছেন। কিন্তু এনটিআরসিএর যাচাইয়ে দেখা যায় উক্ত রোল নম্বরের প্রার্থী অনুত্তীর্ণ। তার প্রকৃত প্রাপ্ত নম্বর আবশ্যিক বিষয়ে ২২ এবং ঐচ্ছিক বিষয়ে ২৬। ফলে এটি স্পষ্ট যে, তাঁর জমাকৃত সনদটি জাল ও ভুয়া।
কলেজ সূত্রে জানা গেছে, ২০২২ সালের ১৪ জানুয়ারি মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) প্রফেসর মো. শাহেদুল খবির চৌধুরী স্বাক্ষরিত শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রেরিত পদ সৃজন প্রস্তাবেও উক্ত শিক্ষকের জাল সনদের বিষয়টি উল্লেখ করে তাঁর নিয়োগ যথাযথ নয় মর্মে পদ সৃজনে অসুপারিশ করা হয়। কিন্তু ২০২৩ সালের ৪ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় তাঁর পদ সৃজনে সুপারিশ করে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠায়। জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ও কোনো প্রকার যাচাই-বাছাই ছাড়াই শিক্ষক নাসরিন নাহারের পদ সৃজন করে। একই বছরের ১৪ ডিসেম্বর শিক্ষা মন্ত্রণালয় এক প্রজ্ঞাপনে নাসরিন নাহারকে প্রভাষক (দর্শন) পদে অস্থায়ী নিয়োগের আদেশ জারি করে। আর সেই আদেশের প্রেক্ষিতেই ২০২৩ সালের ১৮ ডিসেম্বর তিনি সরকারিভাবে কলেজে যোগদান করেন এবং নিয়মিত সরকারি বেতন-ভাতা তুলছেন। আর এসব কাজে আর্থিক সুবিধার বিনিময়ে সহায়তা করেছেন কলেজটির অধ্যক্ষ সফিকুল ইসলাম।
এ বিষয়ে কলেজের দর্শন বিষয়ের প্রভাষক আব্দুল্লাহ আল মারুফ বলেন, "যে শিক্ষকের নামে এনটিআরসিএ ও মাউশির সুস্পষ্ট সনদ জালিয়াতির প্রতিবেদন আছে, মাউশি যাকে পদ সৃজনের সুপারিশই করেনি, এনটিআরসিএ যার বিরুদ্ধে জালিয়াতির মামলা করার জন্য কলেজ কর্তৃপক্ষকে নির্দেশ দিয়েছিল এবং যিনি ৩ বছরেরও বেশি সময় কলেজে অনুপস্থিত ছিলেন, তাঁর পদ সৃজন ও সরকারি নিয়োগ আদেশ কীভাবে হলো? তিনি যে সরকারি বেতন তুলছেন, তা সরাসরি সরকারি অর্থ আত্মসাতের শামিল। এর দায় অধ্যক্ষ ও যাঁরা নথিপত্রের কাজ করেছেন তাঁরা এড়াতে পারেন না। এখানে বিপুল অঙ্কের অবৈধ অর্থ লেনদেন হয়েছে।"
অভিযুক্ত শিক্ষক নাসরিন নাহারের মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে প্রথমে একজন নারী ফোনটি রিসিভ করেন। সংবাদকর্মী পরিচয় দেওয়ার পর তিনি "আমি একজন গৃহিণী" বলে ফোন কেটে দেন। পরে আরও কয়েকবার চেষ্টা করা হলেও তিনি আর ফোন ধরেননি।
শমসেরনগর সরকারি ডিগ্রি কলেজের অধ্যক্ষ সফিকুল ইসলাম বলেন, নাসরিন নাহারের শিক্ষক নিবন্ধন সনদ জাল কি না তা তিনি জানেন না। নিবন্ধন সনদ ছাড়াই নাসরিন নাহারের পদ সৃজন হয়েছে। পদ সৃজন করতে শিক্ষক নিবন্ধনের সনদ দেখাতে হয়নি। আর্থিক লেনদেনের অভিযোগটি মিথ্যা দাবি করে ওই শিক্ষকের বিরুদ্ধে মামলা না করার বিষয়টিও তিনি স্বীকার করেন।
কালীগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) রেজওয়ানা নাহিদ বলেন, "এ বিষয়ে আপনার মাধ্যমেই প্রথম শুনলাম। খোঁজখবর নিয়ে তদন্তপূর্বক প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে।"