গাজীপুরে প্রশাসনের যোগসাজশে চোরাই জ্বালানি তেলের দোকানদার রোমান দীর্ঘ দিন ধরে অবৈধ ব্যবসা পরিচালনা করে আসছে। প্রশাসনের আশ্বাসেও বন্ধ হচ্ছে না চোরাই জ্বালানি তেলের দোকান।
অভিযোগ উঠেছে, প্রশাসনের কতিপয় কিছু কর্মকর্তার যোগসাজশ ও অদৃশ্য ক্ষমতা বলে টানা ২৪ ঘণ্টা দোকান খোলা রেখে উপচে-পড়া চোরাই জ্বালানি তেলের কারবার চালিয়ে যাচ্ছে রোমান। দূর থেকে দেখে যে কারও মনে হতে পারে এটি বালুর গদি, বাস্তবে বালুর গদির আদলে চোরাই জ্বালানি তেলের কারবার চালাচ্ছে রোমান।
নাম প্রকাশ না করার শর্তে চোরাই জ্বালানি তেলের দোকানদার রোমানের ঘনিষ্ঠ একজন বলেন, যতোই নিউজ হোক রোমানের দোকান বন্ধ হবে না, তার উপরের লেভেলের লোক আছে। আরও বলেন, তার সাথে সবারই সম্পর্ক ভালো সে সবকিছু ম্যানেজ করে চলে।
গত কয়েক দিন আগে কয়েকটি জাতীয় দৈনিক পত্রিকা ও নিউজ পোর্টালে প্রশাসনকে ‘ম্যানেজ’ করে রমরমা চোরাই তেল কারবার, নাশকতার শঙ্কা ও গাজীপুরে প্রকাশ্যে চোরাই জ্বালানি তেলের ব্যবসা দুষ্কৃতকারীদের টার্গেট খোলা তেলের দোকান সহ বিভিন্ন শিরোনামে সংবাদ প্রকাশিত হয়। তখন গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) উপ-কমিশনার (ক্রাইম উত্তর) মো. রবিউল হাসান বলেন, আপনারা আমাদেরকে চোরাই তেলের দোকানের তথ্য দিয়ে সহযোগিতা করুন, এ বিষয়ে এখনি আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা হবে বলে জানান। গণমাধ্যমে তার বক্তব্য প্রকাশের পরও থেমে নেই সিন্ডিকেট প্রধান রোমানের চোরাই জ্বালানি তেলের কারবার।
গতকাল মঙ্গলবার সরেজমিনে দেখা গেছে, ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের কোনাবাড়ি বাইমাইল এলাকায় বালুর গদির আড়ালে অবস্থিত রোমানের দোকান থেকে প্রতিদিন সকাল থেকে গভীর রাত পর্যন্ত ট্রাক, কাভার্ড ভ্যান ও পণ্যবাহী যানবাহনের চালকরা পাইপের মাধ্যমে সরাসরি গাড়ির ট্যাংক থেকে ডিজেল, অকটেন ও পেট্রোল নামিয়ে নিচ্ছেন। দেশের বর্তমান পরিস্থিতিতে জ্বালানি তেলের পাম্পগুলো সরাসরি বোতল বা খোলা জ্বালানি তেল বিক্রি না করায়, দুষ্কৃতকারীরা এই অবৈধ উৎস থেকে তেল সংগ্রহ করে নাশকতা ও অন্যান্য অবৈধ কাজে ব্যবহার করছে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে।
ঢাকা-টাঙ্গাইল মহাসড়কের পাশে গড়ে ওঠা এসব দোকানের নেই কোনো সাইনবোর্ড, নেই বিস্ফোরক অধিদপ্তরের অনুমোদন বা বৈধ লাইসেন্স। স্থানীয়দের দাবি, একটি সংঘবদ্ধ সিন্ডিকেট ব্যবসাটি নিয়ন্ত্রণ করে। পুলিশকে মাসোহারা দেওয়ার পাশাপাশি কিছু সাংবাদিক, রাজনৈতিক দলের নেতা ও মানবাধিকার কর্মীকেও অর্থ দিয়ে ম্যানেজ করা হয় বলে অভিযোগ রয়েছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক জ্বালানি তেল ক্রেতা বলেন, এ জায়গায় একটা দোকান দেখলে ওসি রে বিশ হাজার টেহা দেয়। ওসির ড্রাইভার এখানে আসে না, কোনাবাড়ী আরিফ কলেজের সামনে আসে, টেহা ওখানে দিতে লাগে। একদিন আমার কাছে এসে তেলের টেহা নিয়া গেছে ওসির ড্রাইভাররে টেহা দেওয়ার জন্যে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন ক্রেতা জানান, চোর হলো গাড়ির ড্রাইভাররা, আমরা তো কম দামে কিনে ন্যায্য দামে বিক্রি করি। পুলিশ থেকে সাংবাদিক সবাইকে ম্যানেজ করেই ব্যবসা করতে হয়। আরও জানান, দোকান খোলা রাখতে থানা পুলিশকে মাসিক নির্দিষ্ট হারে টাকা দিতে হয়। প্রতিদিন টহল পুলিশের জন্যও ১০০ টাকা দিতে হয়, না দিলে ঝামেলায় পড়তে হয়।
স্থানীয়দের আশঙ্কা, অনুমোদনবিহীনভাবে তেল মজুত ও বিক্রি হওয়ায় যে কোনো সময় বড় ধরনের অগ্নিকাণ্ড বা দুর্ঘটনা ঘটতে পারে। তারা অবিলম্বে এসব অবৈধ ব্যবসা বন্ধে স্থানীয় প্রশাসনের কার্যকর পদক্ষেপ দাবি করেছেন।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক স্থানীয় এক ব্যবসায়ী বলেন, রাতের বেলায় পুলিশের গাড়ির এদিকে-ওদিকে ঘোরাঘুরি করে টহল দেয়, তাও তাদের কিছু বলে না, আমরা কিছুই বুঝলাম না, আমরা হতাশ!
গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কোনাবাড়ি থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. সালাহ উদ্দিন আহাম্মেদ বলেছিলেন, কেউ যদি দোকান খোলা রাখে বা নাম ভাঙিয়ে টাকা নেয়, সে বিষয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। কিন্তু সে সময় দোকান বন্ধ করতে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করলেও কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারেননি ওসি সালাহ উদ্দিন আহাম্মেদ।
ঘটনা নিশ্চিত করে এ বিষয়ে গাজীপুর মেট্রোপলিটন পুলিশের (জিএমপি) কমিশনার ইসরায়েল হাওলাদার বলেন, তাদের বিরুদ্ধে খোঁজখবর নিয়ে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।