খুলনা

জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে বেনাপোল থেকে দূরপাল্লার আমদানি-রপ্তানি পণ্যের ট্রাকপ্রতি ভাড়া বেড়েছে ৪-৫ হাজার টাকা

মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংকটের কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ও ফ্রেইট চার্জ উল্লেখযোগ্যভাবে বেড়ে যাওয়ায় দেশে ডিজেল, কেরোসিন, অকটেন ও পেট্রোলের দাম লিটারে ২০ টাকা করে বাড়িয়েছে সরকার। নতুন নির্ধারিত দাম কার্যকর হওয়ার সাথে সাথে স্থলবন্দর বেনাপোলে আমদানি-রপ্তানি পণ্য পরিবহন ব্যাহত হচ্ছে। জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধির প্রভাব পড়েছে দেশের সর্ববৃহৎ এই স্থলবন্দরের বাণিজ্যে। দেশের অভ্যন্তরে পণ্য পরিবহনে গুনতে হচ্ছে বাড়তি ভাড়া। গন্তব্য অনুযায়ী ট্রাকভাড়া বেড়েছে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা পর্যন্ত। সবচেয়ে বেশি ভাড়া বেড়েছে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও সিলেট রুটে। ফলে বাণিজ্যসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে স্থবিরতার সৃষ্টি হচ্ছে। বাস ভাড়া এখনো না বাড়লেও যেকোনো সময় তা বাড়তে পারে বলে আশঙ্কা করছেন ব্যবসায়ীরা।

অনেক আমদানিকারক প্রতিষ্ঠানের সাথে বার্ষিক চুক্তিতে আবদ্ধ থাকায় বিপাকে পড়েছেন সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট ও পরিবহন ব্যবসায়ীরা। লাভ দূরে থাক, লোকসান দিয়ে তাঁদের আমদানিকারকের প্রতিষ্ঠানে পণ্য পাঠাতে হচ্ছে। তেলের দামের পাশাপাশি টায়ার, ট্রাকের যন্ত্রাংশের মূল্য এবং ফেরি ভাড়া বৃদ্ধির কারণেও ট্রাকের ভাড়া বেড়েছে বলে পরিবহনসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, বেনাপোল থেকে ঢাকায় আগে ট্রাকভাড়া ছিল ২০ থেকে ২১ হাজার টাকা। তা বেড়ে এখন ২৫ থেকে ২৬ হাজার টাকা হয়েছে। চট্টগ্রাম রুটে পণ্য পরিবহনে আগে গুনতে হতো ২৭ থেকে ২৮ হাজার টাকা, এখন গুনতে হচ্ছে ৩৫ থেকে ৩৬ হাজার টাকা পর্যন্ত। গাজীপুর, টঙ্গী ও নারায়গঞ্জে আগে ভাড়া ছিল ২২ হাজার টাকা, যা বর্তমানে দাঁড়িয়েছে ২৬ থেকে ২৭ হাজার টাকায়। এতে চরম বিপাকে পড়েছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের মতে, পরিবহন খরচ বৃদ্ধির কারণে উৎপাদিত পণ্যের দামও বেড়ে যাবে। তেলের মূল্যবৃদ্ধির পাশাপাশি তীব্র ট্রাকসংকটে অনেকে আমদানীকৃত পণ্য খালাস করতে পারছেন না।

বেনাপোল স্থলবন্দরের হ্যান্ডলিং শ্রমিকেরা জানান, বন্দরের দুটি ইউনিয়নের প্রায় ৫ হাজার শ্রমিক প্রতিদিন পণ্য ওঠানো-নামানোর (লোড-আনলোড) কাজ করেন। ট্রাকসংকট ও ভাড়া বৃদ্ধির কারণে অনেক ব্যবসায়ী আমদানীকৃত পণ্য খালাস করছেন না। প্রতিদিন যেখানে ৪০০ থেকে ৬০০ ট্রাক পণ্য ওঠানো-নামানো হতো, তা এখন অর্ধেকে নেমে এসেছে। এভাবে চলতে থাকলে শ্রমিকেরা দুর্ভোগে পড়বেন এবং অনেকে বেকার হয়ে যাবেন।

ট্রাকভর্তি পণ্য নিয়ে বেনাপোল থেকে ঢাকায় যাচ্ছিলেন চালক নাজমুল ইসলাম। তিনি বলেন, "প্রতি লিটারে ২০ টাকা বাড়ায় বেনাপোল-ঢাকা-বেনাপোল আসা-যাওয়ায় ১৫০ লিটার তেলে আগের চেয়ে প্রায় ৩ হাজার থেকে ৩ হাজার ৫০০ টাকা বেশি লাগছে। আবার ঢাকা থেকে ফেরার পথে কাঙ্ক্ষিত ভাড়া পাওয়া যায় না। এ কারণে প্রতি ট্রিপে ৪ থেকে ৫ হাজার টাকা বেশি নিতে হচ্ছে। এর ওপর ফেরি ভাড়া, সেতুর টোল ও বিভিন্ন স্থানের খরচ তো আছেই।"

সাদ্দাম হোসেন নামে অপর এক চালক বলেন, "ট্রাকে কেমিক্যাল নিয়ে ভালুকা যাচ্ছি। আগের চেয়ে চার হাজার টাকা বেশি ভাড়া দিতে হচ্ছে।" ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, "আগে জ্বালানি সংকটের সময় একবার ভাড়া বাড়ে, এবার তেলের দাম বাড়ায় আবারও ভাড়া বাড়ল।"

বেনাপোল ট্র্যান্সপোর্ট এজেন্সি মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক আজিম উদ্দিন গাজী জানান, বেনাপোল বন্দর থেকে সারাদেশে পণ্য পরিবহনের ভাড়া অনেকটা বেড়েছে। তেলের দাম, ফেরি ভাড়া ও টোল বৃদ্ধির পাশাপাশি ঢাকা থেকে ফেরার পথে ট্রিপ না পাওয়ায় ট্রাকমালিকেরা ভাড়া বাড়িয়েছেন। এতে পণ্য পরিবহনের জন্য ট্রাক ও কাভার্ড ভ্যান পাওয়া দুষ্কর হয়ে উঠছে। ফলে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম বাড়ার আশঙ্কা রয়েছে। প্রতিদিন এই বন্দর থেকে দুই শতাধিক কাভার্ড ভ্যানসহ প্রায় ৫০০টি পণ্যবাহী ট্রাক দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে যায়। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে স্বাভাবিক পণ্য পরিবহন ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে।

বেনাপোল ল্যান্ডপোর্ট ইম্পোর্টার্স অ্যান্ড এক্সপোর্টার্স অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি আলহাজ মতিয়ার রহমান জানান, দেশের সবচেয়ে বড় এই স্থলবন্দর দিয়ে প্রতিদিন সাড়ে ৩শ থেকে ৪শ ট্রাক পণ্য আমদানি এবং ১০০ থেকে ১৫০ ট্রাক পণ্য রপ্তানি হয়ে থাকে। তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে আমদানি-রপ্তানি পণ্য সময়মতো গন্তব্যে পাঠানো যাচ্ছে না। তেলের দাম বাড়ার পরপরই ট্রাকমালিকেরা ভাড়া ৫-৬ হাজার টাকা বাড়িয়ে দিয়েছেন, যা ব্যবসায়ীদের চরম ভোগান্তিতে ফেলেছে। ট্রাকভাড়া বাড়ার ফলে পণ্যের সামগ্রিক উৎপাদন ও পরিবহন খরচ বৃদ্ধি পাবে, যার চূড়ান্ত প্রভাব পড়বে সাধারণ ভোক্তার ওপর।

বেনাপোলের সিঅ্যান্ডএফ ব্যবসায়ী আব্দুল লতিফ বলেন, "তেলের মূল্যবৃদ্ধি ও পরিবহনসংকটের কারণে ট্রাকভাড়া স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় অনেক বেশি। ব্যবসায়ীরা লাভের আশায় পণ্য আমদানি করলেও পরিবহন খরচ অতিরিক্ত বেড়ে যাওয়ায় তাঁদের লোকসান গুণতে হচ্ছে। তবে পচনশীল পণ্য নষ্ট হওয়ার ভয়ে অনেকে বাধ্য হয়ে অতিরিক্ত ভাড়াতেই পণ্য খালাস করছেন।"

এ বিষয়ে যশোর চেম্বার অব কমার্সের যুগ্ম সম্পাদক ও আমদানিকারক এজাজ উদ্দিন টিপু জানান, তেলের মূল্যবৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়েছে ট্রাকভাড়ায়। এর ফলে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়ে যাবে এবং এর দায়ভার শেষ পর্যন্ত ভোক্তাকেই বহন করতে হবে।

উল্লেখ্য, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ মন্ত্রণালয়ের সংবাদ বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নতুন নির্ধারিত দামে প্রতি লিটার ডিজেল ১৩৫ টাকা, অকটেন ১৬৫ টাকা, পেট্রোল ১৬০ টাকা এবং কেরোসিন ১৫৫ টাকা করা হয়েছে। আগে ডিজেল ১১৫ টাকা, অকটেন ১৪৫ টাকা, পেট্রোল ১৪০ টাকা এবং কেরোসিন ১৩৫ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছিল।

 


সম্পর্কিত খবর