ঢাকা

টাঙ্গাইলের 'ভাসানী হল': ট্রাকস্ট্যান্ডের দখলে সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্র

একসময় যে মঞ্চে নাটকের সংলাপে মুখরিত হতো টাঙ্গাইল, আজ সেই মঞ্চের বারান্দায় বসেছে পানের দোকান। যে চত্বরে বইমেলার ভিড় লাগত, সেই চত্বর এখন ট্রাকস্ট্যান্ড; মাঝরাতে সেখানে বসে মাদকের আড্ডা।

এটি টাঙ্গাইলের ঐতিহ্যবাহী ভাসানী হলের বর্তমান অবস্থা। ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে প্রায় এক যুগের বেশি সময় ধরে এটি পরিত্যক্ত। টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক প্রাণ আজ অক্সিজেনের অভাবে হাঁসফাঁস করছে।

জানা গেছে, টাঙ্গাইল শহরের প্রাণকেন্দ্রে প্রায় ৩৫ শতাংশ জমির ওপর "টাঙ্গাইল টাউন হল" নামে মিলনায়তনটি নির্মিত হয়। ১৯৭৬ সালের ১৬ আগস্ট তৎকালীন রাষ্ট্রপতির শিক্ষাবিষয়ক উপদেষ্টা অধ্যাপক আবুল ফজল এর ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।

১৯৭৮ সালের ২ এপ্রিল ঢাকা বিভাগের কমিশনার খানে আলম খান এটি উদ্বোধন করেন।

পরবর্তীকালে টাঙ্গাইল পৌরসভার তৎকালীন চেয়ারম্যান সামছুল হকের উদ্যোগে মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়ে এর নাম পরিবর্তন করে রাখা হয় "ভাসানী হল"।

প্রায় এক হাজার আসনবিশিষ্ট এই মিলনায়তনটি একসময় দেশের অন্যতম বৃহৎ ও দৃষ্টিনন্দন সাংস্কৃতিক কেন্দ্র ছিল।

স্থানীয় প্রবীণ ও সংস্কৃতি কর্মীদের মতে, কয়েক দশক ধরে টাঙ্গাইলের নাটক, সংগীত, আবৃত্তি, বইমেলা এবং রাজনৈতিক কর্মীদের মহামিলনক্ষেত্র ছিল এটি।

টাঙ্গাইল জেলা বিএনপির সাবেক সদস্যসচিব ও মওলানা ভাসানীর দৌহিত্র মাহমুদুল হক সানু বলেন, "ভাসানী হল সংস্কার এখন সময়ের দাবি। শুধুমাত্র মজলুম জননেতা মওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানীর নামে নামকরণ করা হয়েছে বিধায় দীর্ঘদিন ধরে হলটি পরিত্যক্ত অবস্থায় পড়ে রয়েছে। টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু গত ১২ জুন হলটি পরিদর্শন করেছেন। আশা করছি, বর্তমান সরকার খুব দ্রুতই এই মিলনায়তনটি আধুনিক ও যুগোপযোগী করে সংস্কার করার পদক্ষেপ গ্রহণ করবে।"

বিশিষ্ট সুরকার ও গীতিকার ফিরোজ আহমেদ বাচ্চু বলেন, "এই মিলনায়তনটিকে কেন্দ্র করেই নাট্যচর্চাসহ সংস্কৃতি কর্মীদের নিয়মিত আড্ডা বসত। প্রতিবছর ফেব্রুয়ারি মাসে এর চত্বরে হতো বইমেলা। ঈদের সময় বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সংগঠন নাটক, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও কনসার্টের আয়োজন করত। এ ছাড়া এই ভাসানী হলে জেলার অনেক রাজনৈতিক সভা-সমাবেশও অনুষ্ঠিত হতো। এটি ছিল সাংস্কৃতিক অঙ্গনের মূল কেন্দ্র। ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে নামকরা থিয়েটার দল আসত, হতো নাট্যোৎসব। পাড়া-মহল্লার সংগঠনগুলো এখানেই মঞ্চ মাতাত।"

তিনি আরও বলেন, "কালের বিবর্তনে সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলো হারিয়ে গেছে। সংস্কারের অভাবে ভবনটি ব্যবহারের অনুপযোগী হয়ে পড়ায় প্রায় এক যুগ আগে প্রশাসন এটিকে পরিত্যক্ত ঘোষণা করে। ফলে একসময়ের সাংস্কৃতিক প্রাণকেন্দ্রটি আজ অপরাধের আখড়ায় পরিণত হয়েছে।"

তরুণ সংস্কৃতি ব্যক্তিত্ব ইউসুফ বলেন, "টাঙ্গাইলকে বলা হয় সাংস্কৃতিক নগরী। কিন্তু এই নগরীতে একটি সুন্দর ও মানসম্মত সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নেই। একসময় ভাসানী হল ঘিরে যে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চলত, তা বন্ধ হয়ে গেছে এক যুগ আগেই। তাই দ্রুত ভাসানী হল পুনর্নির্মাণ করা জরুরি হয়ে উঠেছে।"

শৈলী শিল্পচর্চা একাডেমির প্রতিষ্ঠাতা মৌসুমী রহমান বলেন, "টাঙ্গাইলে একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কেন্দ্র নির্মাণ অত্যন্ত জরুরি। একসময় ভাসানী হল আমাদের প্রাণকেন্দ্র ছিল। ভাসানী হল পুনর্নির্মাণ করা হলে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের গতি বাড়বে।"

টাঙ্গাইল ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক কামরুজ্জামান খান বলেন, "মাদকের ছোবল এবং কিশোর গ্যাংয়ের উৎপাত থেকে মুক্তি পেতে হলে ক্রীড়া ও সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে মুখরিত রাখতে হবে। তাই সাংস্কৃতিক অঙ্গনকে গতিশীল করতে ভাসানী হল সংস্কার খুবই গুরুত্বপূর্ণ।"

কবি মাহমুদ কামাল বলেন, "হলটি মওলানা ভাসানীর নামে থাকায় বিগত সরকার সংস্কারের কোনো উদ্যোগ নেয়নি। বর্তমান সরকারের কাছে আমাদের দাবি, ভাসানী হলটি পুনর্নির্মাণ কিংবা সংস্কার করা হোক।"

স্থানীয়রা মনে করেন, এটি শুধু ইট-সিমেন্টের একটি স্থাপনা নয়, টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের এক অবিচ্ছেদ্য অংশ। জেলার গৌরবময় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে টিকিয়ে রাখতে এবং শহরের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বজায় রাখতে ঐতিহাসিক এই স্থাপনাটি দ্রুত সংস্কার করা জরুরি।

উল্লেখ্য, টাঙ্গাইল সদর আসনের সংসদ সদস্য এবং মৎস্য ও প্রাণিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী সুলতান সালাউদ্দিন টুকু গত ১২ জুন হলটি পরিদর্শন করেন। পরিদর্শন শেষে তিনি দ্রুত এই ঐতিহাসিক হলটির পূর্ণাঙ্গ সংস্কারের জন্য গণপূর্ত বিভাগকে নির্দেশনা দেন।

তিনি বলেন, "ভাসানী হল টাঙ্গাইলের জন্য অত্যন্ত ঐতিহ্যবাহী ও গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থাপনা। এটি পুনর্নির্মাণের ব্যাপারে সর্বাত্মক চেষ্টা করা হবে।"

একটি শহর বাঁচে তার সংস্কৃতি নিয়ে। ভাসানী হল মরে গেলে টাঙ্গাইলের সাংস্কৃতিক আত্মাই মরে যাবে। ট্রাকস্ট্যান্ড সরিয়ে ও মাদকের আড্ডা বন্ধ করে যদি আবার মঞ্চে আলো জ্বলে, তবেই টাঙ্গাইল ফিরে পাবে তার "সাংস্কৃতিক নগরী"র পরিচয়।

এখন দেখার বিষয়, এই আশ্বাস কত দ্রুত বাস্তবে রূপ নেয়।

 


সম্পর্কিত খবর