রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিদিন উদ্ধার হচ্ছে অজ্ঞাতপরিচয় মরদেহ। পরিচয় শনাক্ত হলে স্বজনরা মর্গ থেকে মরদেহ নিয়ে যান।
কিন্তু পরিচয় না মিললে আইনি প্রক্রিয়া শেষে এসব মরদেহের ঠাঁই হয় ‘বেওয়ারিশ’ হিসেবে। পরে দাফন ও সৎকারের জন্য মরদেহগুলো হস্তান্তর করা হয় আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের কাছে।
সংস্থাটির তথ্য অনুযায়ী, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে আগস্ট পর্যন্ত আট মাসে ৪০০ বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করা হয়েছে। অর্থাৎ মাসে গড়ে ৫০টি।
এর মধ্যে জানুয়ারিতে ৩০, ফেব্রুয়ারিতে ৫৯, মার্চে ৫২, এপ্রিলে ৪৬, মে মাসে ৫৬, জুনে ৬৭, জুলাইয়ে ৪২ এবং আগস্টে ৪৮টি মরদেহ রয়েছে। এর মধ্যে জুরাইন কবরস্থানে ৭৪টি ও মোহাম্মদপুরের রায়েরবাজার কবরস্থানে ৩২৫টি মরদেহ দাফন করা হয়েছে। একটি মরদেহ সৎকার করা হয়েছে পোস্তগোলা শ্মশানঘাটে।
তবে এ সংখ্যার সঙ্গে দ্বিমত পোষণ করেছেন ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) কমিশনার মোসলেহ উদ্দিন আহমদ।
তিনি বলেন, এত বেশি সংখ্যক মরদেহ বেওয়ারিশ হওয়ার কথা নয়। বিষয়টি সম্পর্কে তাঁর বিস্তারিত জানা নেই। এর আগে ২০২৪ সালে ৫৭০টি এবং ২০২৫ সালে ৬৪৩টি বেওয়ারিশ মরদেহ দাফন ও সৎকার করে আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলাম।
ডিএমপি সূত্র বলছে, রাজধানীর সড়ক, রেললাইন, ফুটপাত, পার্ক, নদী, খাল ও ঝিলসহ বিভিন্ন স্থান থেকে প্রায় প্রতিদিন অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তাদের সবাই হত্যার শিকার নন।
সড়ক দুর্ঘটনা, পানিতে ডুবে কিংবা অসুস্থতায়ও অনেকে মারা যান। তাদের বেশির ভাগ ভবঘুরে, মানসিক ভারসাম্যহীন, গৃহহীন কিংবা দীর্ঘদিন পরিবার থেকে বিচ্ছিন্ন। জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন না থাকায় অনেকের পরিচয় শনাক্ত করা সম্ভব হয় না।
তবে হত্যার পর মরদেহ খণ্ডবিখণ্ড বা বিকৃত করে ফেলার ঘটনাও রয়েছে। এতে ফিঙ্গারপ্রিন্টসহ গুরুত্বপূর্ণ আলামত নষ্ট হয়ে যাওয়ায় পরিচয় শনাক্তে হিমশিম খেতে হয় পুলিশকে।
সোমবারও রাজধানীর শাহবাগ, মতিঝিল, যাত্রাবাড়ী ও কামরাঙ্গীরচর এলাকা থেকে এক নারীসহ পাঁচজনের অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। এসব মরদেহ ময়নাতদন্তের জন্য ঢাকা মেডিকেল কলেজের মর্গে পাঠানো হয়েছে।
ডিএমপি কমিশনার বলেন, প্রযুক্তির মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা না গেলে পুলিশ ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে চেষ্টা করে। অর্ধগলিত মরদেহের পরিচয় শনাক্ত করা কঠিন। এ ক্ষেত্রে ডিএনএ নমুনা সংরক্ষণ করা হয়। মর্গে জায়গার সংকট থাকায় পরে মরদেহ দাফন করা হয়।
সম্প্রতি আদাবরের একটি খাল থেকে ব্যাগ ও বস্তায় ছয় টুকরা অবস্থায় এক তরুণীর অজ্ঞাতনামা মরদেহ উদ্ধার করা হয়। অর্ধগলিত হওয়ায় তাঁর আঙুলের ছাপও নষ্ট হয়ে গেছে। প্রযুক্তির সহায়তা নিয়েও গতকাল পর্যন্ত পরিচয় শনাক্ত করতে পারেনি পুলিশ ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (পিবিআই)।
আঞ্জুমান মুফিদুল ইসলামের দাফনসেবা কর্মকর্তা কামরুল আহমেদ বলেন, পুলিশের ক্লিয়ারেন্স ছাড়া কোনো মরদেহ বেওয়ারিশ হিসেবে দাফন করা হয় না। সুরতহাল ও ময়নাতদন্ত শেষে পুলিশ মরদেহ হস্তান্তর করলে তারা দাফন বা সৎকার করে।
মানবাধিকারকর্মী নুর খান লিটন বলেন, ঢাকায় বেওয়ারিশ মরদেহের বড় একটি অংশ হত্যাকাণ্ডের শিকার। এসব হত্যার রহস্য উদ্ঘাটন ও বিচার কম হওয়ায় অপরাধীরা উৎসাহিত হচ্ছে। তাঁর মতে, হত্যার পর লাশ গুম করেও যাতে কেউ পার না পায়, সে জন্য রাষ্ট্রকে কার্যকর পদক্ষেপ নিতে হবে।