খরা ও চরাঞ্চলের কৃষিতে নতুন দিগন্তের প্রত্যাশা নিয়ে দেশে প্রথমবারের মতো উচ্চ খরা-সহনশীল সয়াবিনের ইনব্রিড জাত ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ উদ্ভাবন করেছে (গাকৃবি)। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষিতত্ত্ব বিভাগের প্রখ্যাত কৃষিতত্ত্ববিদ এর নেতৃত্বে দীর্ঘ এক দশকের গবেষণার ফল হিসেবে জাতটি সম্প্রতি উদ্ভাবিত হয়। এ সাফল্যের মাধ্যমে বিশ্ববিদ্যালয়টির উদ্ভাবিত ফসলের জাতের সংখ্যা দাঁড়ালো ৯৪-এ, যা দেশের কৃষি গবেষণায় নতুন মাইলফলক হিসেবে বিবেচিত হচ্ছে।
গবেষণা সূত্রে জানা যায়, তাইওয়ানের এশিয়ান ভেজিটেবল রিসার্চ অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট সেন্টার, এবং দক্ষিণ কোরিয়া থেকে সংগৃহীত প্রায় ২৫০টি জার্মপ্লাজম তিন বছর ধরে কঠোর পরীক্ষার মাধ্যমে মূল্যায়ন করা হয়। এর মধ্যে ‘জি০০০৫৬’ জার্মপ্লাজমটি খরা- সহনশীল হিসেবে নির্বাচিত হয়। পরবর্তীতে ‘সলিডারিডেট নেটওয়ার্ক এশিয়া’র সহায়তায় নোয়াখালী, লক্ষীপুর ও ভোলার বিভিন্ন চরাঞ্চলে পাঁচ বছর মাঠপর্যায়ে সফল মূল্যায়নের ভিত্তিতে ২০২৫ সালের ১১ নভেম্বর জাতটির আনুষ্ঠানিক ছাড়পত্র প্রদান করে।
গবেষকদের দাবি, ৫০ থেকে ৬০ শতাংশ ফিল্ড ক্যাপাসিটির মতো কঠিন খরা পরিস্থিতিতেও জাতটি টিকে থেকে উচ্চ ফলন দিতে সক্ষম। প্রতি গাছে ৮০ থেকে ১০০টি ফল ধারণ এবং বড় দানার কারণে এক হাজার বীজের ওজন প্রায় ২৩০ গ্রাম। হেক্টরপ্রতি ফলন ৩ দশমিক ২ থেকে ৩ দশমিক ৮ টন পর্যন্ত পাওয়া সম্ভব, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় উল্লেখ যোগ্য ভাবে বেশি।
বিশেষজ্ঞদের মতে, উপকূলীয় চরাঞ্চলে লবণাক্ততা, অনাবৃষ্টি ও অনিশ্চিত আবহাওয়ার কারণে সয়াবিন চাষ দীর্ঘদিন ধরে ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। ‘জিএইউ সয়াবিন ৬’ সেই সীমাবদ্ধতা কাটিয়ে কৃষিতে নতুন সম্ভাবনা তৈরি করবে। জাতটির আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো বীজে ট্রিপসিনের মাত্রা তুলনামূলক কম, ফলে পোল্ট্রি খাদ্যে প্রোটিন শোষণের হার বাড়ে। এতে দেশের পোল্ট্রি শিল্প উপকৃত হবে বলে সংশ্লিষ্টরা মনে করছেন। এ ছাড়া জাতটি স্বল্পমেয়াদি মাত্র তিন মাস থেকে তিন মাস দশ দিনের মধ্যে পরিপক্ক হয়। ফলে কৃষক স্বল্প সময়ে অধিক ফলন পেয়ে লাভবান হতে পারবেন। পুষ্টিগুণের দিক থেকেও সয়াবিন অত্যন্ত সমৃদ্ধ; এতে রয়েছে প্রায় ৪০-৪৫ শতাংশ উচ্চমানের প্রোটিন ও ১৮-২০ শতাংশ তেল, যা অপুষ্টি দূরীকরণ ও হৃদ্রোগের ঝুঁকি কমাতে সহায়ক।
গবেষণা দলের প্রধান ড. এম. এ. মান্নান বলেন, জিএইউ সয়াবিন ৬ আমাদের দীর্ঘ গবেষণা, মাঠের অভিজ্ঞতা ও কৃষকের প্রত্যাশার সমন্বিত ফল। খরা- প্রবণ জমিতে সয়াবিন চাষের অনিশ্চয়তা দূর করে এটি নতুন সম্ভাবনার দ্বার খুলে দেবে।
গাকৃবির ভাইস-চ্যান্সেলর অধ্যাপক ড. জিকেএম মোস্তাফিজুর রহমান বলেন, এ জাত বাংলাদেশের কৃষিতে যুগান্তকারী সংযোজন। খাদ্যনিরাপত্তা জোরদার ও কৃষকের আয় বৃদ্ধি উভয় ক্ষেত্রেই এটি টেকসই কৃষির প্রতীক হয়ে উঠতে পারে।
উল্লেখ্য, এর আগে একই গবেষণা দল লবণ ও জলাবদ্ধতা- সহনশীল বৈশিষ্ট্যসম্পন্ন আরও পাঁচটি উচ্চফলনশীল সয়াবিন জাত উদ্ভাবনে সাফল্য দেখিয়েছে। নতুন এ জাত মাঠপর্যায়ে সম্প্রসারণ পেলে খরা ও চরাঞ্চলের কৃষিতে ইতিবাচক পরিবর্তন আসবে বলে সংশ্লিষ্ট মহলের প্রত্যাশা।