* গণঅভ্যুত্থানে লুট হওয়া অস্ত্র অপরাধীদের হাতে
* ভোটারদের উদ্বেগ, বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকির শঙ্কা
* ১৭ মাসে গোলাগুলির বিভিন্ন ঘটনায় কমপক্ষে ২২ জন নিহত, আহত ১৩৭
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করাই এখন সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে। কারণ, জুলাই গণঅভ্যুত্থানে পুলিশের যেসব আগ্নেয়াস্ত্র ও গোলাবারুদ লুট হয়েছিল; সেগুলো দেড় বছরেও পুরোপুরি উদ্ধার করতে পারেনি আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা। এছাড়া এক হাজারেরও বেশি আগ্নেয়াস্ত্র এবং দুই লাখের বেশি গোলাবারুদেরও হদিস মেলেনি এখনো। ফলে নির্বাচনের আগে এসব অস্ত্র উদ্ধার না হলে সেগুলো বড় ধরনের নিরাপত্তা ঝুঁকি তৈরি করতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশ্লেষকরা। ২০২৪ সালের জুলাই আন্দোলন চলাকালে বিতর্কিত ভূমিকার কারণে পুলিশের ওপর সাধারণ মানুষের ব্যাপক ক্ষোভ জন্ম নেয়। এরই ধারাবাহিকতায় ওই বছরের ৫ আগস্ট আওয়ামী লীগ সরকারের পতন ঘটে। ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে সাড়ে চারশর বেশি থানা ও পুলিশ ফাঁড়িতে হামলা ও লুটপাটের ঘটনা ঘটে। একইসঙ্গে, গণভবন থেকে স্পেশাল সিকিউরিটি ফোর্সের (এসএসএফ) অস্ত্রপাতিও লুট হয়। হামলাকারীরা তখন সবমিলিয়ে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার আগ্নেয়াস্ত্র এবং সাড়ে ছয় লাখের মতো গোলাবারুদ লুট করে নিয়ে গেছে বলে প্রাথমিকভাবে জানিয়েছিল পুলিশ।
তবে সম্প্রতি প্রধান উপদেষ্টার সঙ্গে বৈঠকের সময় সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান জানান, গণঅভ্যুত্থানের সময় লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের প্রকৃত সংখ্যা ছিল তিন হাজার ৬১৯টি। সেইসঙ্গে, লুটকারীরা চার লাখ ৫৬ হাজার ৪১৮ রাউন্ড গোলাবারুদ নিয়ে গিয়েছিল। লুট হওয়া আগ্নেয়াস্ত্রের মধ্যে চায়নিজ রাইফেলসহ বিভিন্ন ধরনের বন্দুক, সাব মেশিনগান (এসএমজি), লাইট মেশিনগান (এলএমজি), পিস্তল, শটগান, গ্যাসগানসহ আরও নানা ধরনের অস্ত্র ছিল বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়। খোয়া যাওয়া এসব অস্ত্র ও গুলি উদ্ধারে ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে বিশেষ অভিযান শুরু করে সেনা-পুলিশের সময়ন্বয়ে গঠিত যৌথবাহিনী। এ অভিযানে গত দেড় বছরে দুই হাজার ২৫৯টি উদ্ধার করা হয়েছে; যা লুট হওয়া অস্ত্রের প্রায় ৬২ দশমিক চার শতাংশ। এছাড়া প্রায় দুই লাখ ৩৭ হাজার ১০০ রাউন্ড উদ্ধার করা হয়েছে, যা লুট হওয়া গোলাবারুদের প্রায় ৫২ শতাংশ।
লুটের অস্ত্র অপরাধীদের হাতে: থানা থেকে পুলিশের যেসব অস্ত্র ও গুলি লুট হয়েছিল, সেগুলোর মধ্যে অনেক অস্ত্র ও গুলি গত দেড় বছরে ছিনতাই, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, এমনকি মানুষ হত্যার মতো অপরাধ কাজেও ব্যবহার হয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে।
এর মধ্যে গত বছরের এপ্রিল মাসে চাঁদাবাজির অভিযোগে খুলনা থেকে আটক দুই ব্যক্তির কাছ থেকে পুলিশের ব্যবহৃত দুটি পিস্তল, একটি শটগান এবং বেশকিছু গুলি উদ্ধার করে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী।
পুলিশের পক্ষ থেকে তখন জানানো হয়েছিল যে, আটক ব্যক্তিরা লুটের ওইসব অস্ত্র ও গুলি চাঁদাবাজিসহ নানান সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ডে ব্যবহার করে আসছিল।
এ ঘটনার কয়েক মাসের মধ্যে চট্টগ্রামে থেকেও লুটের বেশকিছু অস্ত্র ও গুলি উদ্ধার করে পুলিশ। সেগুলোরও ছিনতাই ও ডাকাতির কাজে ব্যবহৃত হচ্ছিল বলে জানানো হয়।
এছাড়া ২০২৪ সালের নভেম্বরে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায় শাহিদা আক্তার নামের এক নারীকে গুলি করে হত্যা করা হয়। শ্রীনগর উপজেলার দোগাছি এলাকার এক্সপ্রেসওয়ের সার্ভিস লেন থেকে মরদেহ উদ্ধার করে পুলিশ। তদন্তে কর্মকর্তারা জানতে পারেন যে, ঢাকার ওয়ারী থানা থেকে লুট করা পিস্তল দিয়ে হত্যাকাণ্ডটি ঘটানো হয়েছে। পরে হত্যাকারীকে গ্রেপ্তার করে সেই পিস্তল উদ্ধার করে পুলিশ।
এ বিষয়ে নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর জেনারেল আ ন ম মুনীরুজ্জামান বলেন, লুটের যেসব অস্ত্র সাধারণ অপরাধীদের হাতে পড়েছে, তারাই ছিনতাই-ডাকাতির মতো ঘটনায় সেগুলো ব্যবহার করছে। কিন্তু আরেকটি বড় উদ্বেগের জায়গা হলো, অনেক অস্ত্র হাত বদল হয়ে উগ্র গোষ্ঠীগুলোর কাছেও চলে যেতে পারে। সেটি ঘটে থাকলে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি বড় ধরনের ঝুঁকির মধ্যে পড়বে।
একই কথা বলছেন পুলিশের সাবেক মহাপরিদর্শক (আইজিপি) নুরুল হুদা। তিনি বলেন, খোয়া যাওয়া অস্ত্র সব সময়ই নিরাপত্তা উদ্বেগের কারণ। সেগুলো কাদের হাতে পড়েছে এবং তারা কী উদ্দেশ্যে সেটার ব্যবহার করতে চাচ্ছে, সে বিষয়ে নিশ্চিত করে কিছু বলা সম্ভব না।
অতীতের নির্বাচনগুলোর তুলানায় এবারের সংসদ নির্বাচনে নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি উদ্বেগ রয়েছে বলে জানাচ্ছেন নিরাপত্তা বিশ্লেষকরা।
নিরাপত্তা বিশ্লেষক অবসরপ্রাপ্ত মেজর এমদাদুল ইসলামের মতে, বাড়তি উদ্বেগের একটা বড় কারণ হলো পুলিশ বাহিনীর দুর্বল অবস্থান। সাধারণ মানুষ এখনও তাদের ওপর পুরোপুরি ভরসা রাখতে পারছেন না। পুলিশের এই দুর্বল অবস্থানের কারণে দেশের আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নাজুক হয়ে পড়েছে। এর মধ্যেই নির্বাচন হতে যাচ্ছে, কিন্তু পুলিশের সদস্যরা সেখানে কতটা শক্ত ভূমিকা পালন করতে পারবেন, সেটি নিয়ে সন্দেহের যথেষ্ঠ অবকাশ রয়েছে। ইতোমধ্যেই একাধিক প্রার্থীর ওপর হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে। এর মধ্যে গত ডিসেম্বরে গুলি করে হত্যা করা হয় ঢাকা-৮ আসনের সম্ভাব্যপ্রার্থী ও ইনকিলাব মঞ্চের মুখপাত্র শরিফ ওসমান হাদিকে। প্রার্থীদের ওপর হামলার ঘটনা ঘটছে, এমনকি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের ওপরেও হামলার ঘটনা ঘটতে দেখা যাচ্ছে, যা আইনশৃঙ্খলা নিয়ে জনগণকে নেতিবাচক ইঙ্গিত দিচ্ছে।
এমন পরিস্থিতিতে সরকারের পক্ষ থেকে গুরুত্বপূর্ণ অনেক প্রার্থীর নিরাপত্তার ব্যবস্থা করা হয়েছে। বহু প্রার্থীকে দেওয়া হয়েছে অস্ত্র রাখার লাইসেন্স।
এদিকে, অন্তর্বর্তী সরকারের গত দেড় বছরের শাসনামলে একের পর এক গোলাগুলি ও হত্যার ঘটনা ঘটতে দেখা গেছে।
মানবাধিকার সংস্কৃতি ফাউন্ডেশনের হিসাবে, গত ১৭ মাসে গোলাগুলির বিভিন্ন ঘটনায় কমপক্ষে ২২ জন নিহত এবং ১৩৭ জন আহত হয়েছেন। এসব ঘটনায় নিয়ে ভোটারদের মধ্যে উদ্বেগ রয়েছে বলে জানান বিশ্লেষকরা।
নির্বাচন বিশেষজ্ঞ ড. আব্দুল আলীম বলেন, নির্বাচনের সময়েও যদি মানুষের মধ্যে নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ থেকে যায়, তাহলে তারা ভোটকেন্দ্র যাওয়ার ব্যাপারে কতটা আগ্রহ দেখাবেন, সেটা একটা বড় প্রশ্ন।