প্রবাসীদের বিভিন্ন আইনি বিরোধ দ্রুত নিষ্পত্তিতে সরকার বিভাগীয় পর্যায়ে বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনের উদ্যোগ নিয়েছে বলে জানিয়েছেন আইনমন্ত্রী মো. আসাদুজ্জামান। তিনি বলেছেন, এ জন্য খসড়া প্রণয়নের কাজ চলছে। জনপরামর্শ শেষে আগামী সংসদ অধিবেশনে বিলটি উত্থাপন করা সম্ভব না হলেও পরবর্তী অধিবেশনে আনার চিন্তা করছে সরকার। এসব ট্রাইব্যুনালে প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের মামলা নিষ্পত্তির ব্যবস্থা রাখার পরিকল্পনা রয়েছে। মঙ্গলবার রাজধানীর হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে রিফিউজি অ্যান্ড মাইগ্রেটরি মুভমেন্টস রিসার্চ ইউনিটের (রামরু) ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে ‘সোনার মানুষ সম্মিলন ২০২৬’-এর উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথির বক্তব্যে মন্ত্রী এসব কথা বলেন।
আইনমন্ত্রী বলেন, আমাদের কিছু জ্যেষ্ঠ আইনজীবী এসে প্রবাসীদের জন্য একটি বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠন করা যায় কি না, সেই দাবি জানিয়েছিলেন। আমরা সেই উদ্যোগ নিয়েছি। বিশেষ করে বিভাগীয় পর্যায়ে এমন আদালত গঠনের পরিকল্পনা করছি, যেগুলো শুধু প্রবাসীদের বিভিন্ন ধরনের সংকট সমাধানে কাজ করবে। প্রবাসীদের মামলা শুধু ওই আদালতগুলোই দেখবে। এ ধরনের বিশেষায়িত আদালত গঠনের পরিকল্পনা আমরা হাতে নিয়েছি। তিনি বলেন, আশা করি, অচিরেই এটি আলোর মুখ দেখবে। এখন আমরা খসড়া প্রণয়নের পর্যায়ে আছি। রামরুকে বলব, এ প্রক্রিয়ায় আমাদের সঙ্গে থাকলে আমরা দ্রুত জনপরামর্শ শেষ করতে পারব। হয়তো এই সংসদ অধিবেশনে পারব না, তবে পরের অধিবেশনে আনতে পারি কি না, সেই চিন্তা করছি।
প্রবাসীদের সম্পত্তি ও আর্থিক বিরোধের উদাহরণ দিয়ে আইনমন্ত্রী বলেন, বিদেশে উপার্জিত অর্থ দেশে পাঠানোর পর পরিবারের সদস্যদের কাছে সেই অর্থ ফেরত চাইতে গিয়ে কিংবা সম্পত্তি কেনার পর বিরোধ তৈরি হলে প্রবাসীরা আইনি জটিলতায় পড়েন। এসব মামলা বছরের পর বছর চলতে থাকে। বিদেশে বসে তাদের আইনজীবীদের পেছনে অর্থ ব্যয় করতে হয়। অনেক ক্ষেত্রে মামলার নিষ্পত্তি না হওয়ায় প্রবাসীর মৃত্যুর পর তার উত্তরাধিকারীদেরও মামলা চালিয়ে যেতে হয়।
তিনি বলেন, দেশের অভ্যন্তরীণ শ্রমিকদের জন্য শ্রম আইন ও বিশেষ শ্রম আদালত রয়েছে। কিন্তু প্রবাসীদের বিভিন্ন আইনি সংকট দ্রুত সমাধানে এ ধরনের বিশেষায়িত আদালত প্রতিষ্ঠার প্রয়োজন রয়েছে।
প্রবাসীদের ২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তা
প্রবাসীদের আইনি সহায়তায় সরকারের নেওয়া উদ্যোগের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, প্রবাসী বাংলাদেশিরা দেশে তাদের আইনি বিষয়ে সহযোগিতা চাইলে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের মাধ্যমে ২৪ ঘণ্টা আইনি সহায়তা দেওয়ার কর্মসূচি চালু করা হয়েছে। এ জন্য একটি হটলাইনও রয়েছে।
রামরুকে আইনগত সহায়তা অধিদপ্তরের সঙ্গে সংযোগ স্থাপনের আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, এর মাধ্যমে প্রবাসীরা প্রাথমিক আইনি পরামর্শ পাবেন। অধিদপ্তরে কয়েকজন আইনগত সহায়তা কর্মকর্তা নিয়োগ দেওয়া হয়েছে, যাদের মধ্যে যুগ্ম জেলা জজ পর্যায়ের কর্মকর্তাও রয়েছেন। তারা আইনি সহায়তার পাশাপাশি মধ্যস্থতার মাধ্যমে বিরোধ নিষ্পত্তির চেষ্টা করছেন, যাতে প্রবাসীরা হয়রানির শিকার কম হন।
আমিরাতে পাঁচ হাজার ভিসা বাতিল
প্রবাসী শ্রমিকদের সংকটের অন্যতম কারণ হিসেবে অসাধু ব্যবসায়ী ও রিক্রুটিং এজেন্সির কথা উল্লেখ করেন আইনমন্ত্রী। তিনি বলেন, সংযুক্ত আরব আমিরাতে অনেক বাংলাদেশির ভিসা বাতিল হয়েছে, আবার অনেকের ভিসার মেয়াদ বাড়ানো হচ্ছে না। ইতোমধ্যে পাঁচ হাজার ভিসা বাতিল হয়েছে। আরো অনেকের ভিসা ঝুলে আছে।
এর কারণ ব্যাখ্যা করে তিনি বলেন, কিছু রিক্রুটিং এজেন্সির মাধ্যমে বিদেশে যাওয়া কর্মীদের ক্ষেত্রে এমন নথি জমা দেওয়া হচ্ছে, যেগুলোর সত্যতা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ব্যবহার করে সহজেই যাচাই করা সম্ভব। কোনো কোনো ক্ষেত্রে এমন প্রতিষ্ঠানের সনদ জমা দেওয়া হয়েছে, যার অস্তিত্ব নেই। ফলে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ আইনগত ব্যবস্থা নিচ্ছে।
আইনমন্ত্রী বলেন, অসাধু ব্যবসায়ীদের বিরুদ্ধে সোচ্চার হওয়ার সময় এসেছে। তাদের অনিয়মের কারণে প্রবাসী শ্রমিকেরা ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন। এ ধরনের সমস্যা মোকাবেলায় সংশ্লিষ্ট সবাইকে এগিয়ে আসতে হবে।
প্রবাসী শ্রমিকেরাই অর্থনীতির অন্যতম মেরুদণ্ড
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রগতিতে প্রবাসী শ্রমিকদের অবদানের কথা তুলে ধরে আইনমন্ত্রী বলেন, তৈরি পোশাক, কৃষি, চিংড়ি, পাট ও পাটজাত পণ্য এবং চা রপ্তানি দেশের অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখছে। তবে শ্রম রপ্তানিও বাংলাদেশের অর্থনীতির অন্যতম প্রধান ভিত্তি। বিদেশে কঠোর পরিশ্রমের মাধ্যমে শ্রমিকেরা যে আয় করেন, তা দেশের অর্থনীতিকে এগিয়ে নিতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রাখছে। পাশাপাশি বুদ্ধিবৃত্তিক অভিবাসনও বিকশিত হচ্ছে।
সম্প্রতি দুবাই সফরের অভিজ্ঞতা তুলে ধরে তিনি বলেন, প্রবাসী শ্রমিকদের অনেককে অমানবিক পরিশ্রম করতে হয়।
একজন শ্রমিকের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে আইনমন্ত্রী বলেন, শ্রমিকদের সকালে বাথরুমে যেতে দীর্ঘ লাইনে দাঁড়াতে হয়। এরপর কর্মস্থলে যাওয়ার জন্য দুই ঘণ্টা আগে রওনা দিতে হয়। সারা দিন কাজ শেষে আবার দুই ঘণ্টা যাতায়াত করে রাত ৮টা বা ৯টার দিকে বাসায় ফিরতে হয়। ফিরে পরিবারের সঙ্গে কথা বলার পাশাপাশি রান্নার কাজও করতে হয়। এত পরিশ্রমের পরও বাংলাদেশি শ্রমিকরা অনেক ক্ষেত্রে অন্য দেশের শ্রমিকদের তুলনায় কম মজুরি পান বলে উল্লেখ করেন তিনি।
বিভিন্ন দেশে শ্রমের মূল্য নির্ধারণে বাংলাদেশি শ্রমিকদের সঙ্গে বিদ্যমান বৈষম্য দূর করার প্রয়োজনীয়তার কথা তুলে ধরে প্রবাসীকল্যাণ প্রতিমন্ত্রীকে বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে দেখার আহ্বান জানান আইনমন্ত্রী।
রামরুর ৩০ বছরের ভূমিকার প্রশংসা
রামরুর ৩০ বছর পূর্তি উপলক্ষে প্রতিষ্ঠানটির ভূমিকার প্রশংসা করে আইনমন্ত্রী বলেন, বাংলাদেশে অভিবাসীদের কল্যাণ, অধিকার ও ভবিষ্যৎ নিয়ে কাজ করার দূরদর্শিতা তিন দশক আগে রামরুই দেখিয়েছিল। এখনো প্রতিষ্ঠানটি এ খাতে সঠিক দিকনির্দেশনা দিয়ে যাচ্ছে।
তিনি বলেন, গত ৩০ বছরে রামরুর বিরুদ্ধে শ্রমিকদের স্বার্থবিরোধী কর্মকাণ্ড, শ্রমিকদের নামে অর্থ সংগ্রহ করে তহবিল তছরুপ কিংবা শ্রমিককল্যাণ নীতি নির্ধারণে অসচ্ছতার অভিযোগ ওঠেনি। প্রতিষ্ঠানটি স্বচ্ছতার সঙ্গে নিজেদের চিন্তা ও সুপারিশ তুলে ধরার চেষ্টা করেছে। রাষ্ট্রীয় সীমাবদ্ধতার কারণে সব সুপারিশ গ্রহণ করা সম্ভব না হলেও রামরুর ইতিবাচক উদ্যোগের সঙ্গে সরকার থাকবে।
আইনমন্ত্রী বলেন, আগামী দিনেও শ্রমিকদের অধিকার রক্ষায় রামরু যেসব ভালো পদক্ষেপ নেবে, সেসব উদ্যোগের পাশে থাকবে সরকার। প্রতিষ্ঠানটির ৩০ বছরের যাত্রা আগামী ১০০ বছরে রূপান্তরিত হোক এবং পরবর্তী প্রজন্মের হাত ধরে এগিয়ে যাক—এমন প্রত্যাশাও ব্যক্ত করেন তিনি। একই সঙ্গে এমন একটি বাংলাদেশের প্রত্যাশা জানান আইনমন্ত্রী, যেখানে বাংলাদেশের শ্রমিকেরা দেশে ফিরে আসতে পারবেন এবং বাংলাদেশও অন্য দেশ থেকে অভিবাসী শ্রমিক গ্রহণের মতো পরিস্থিতি তৈরি করতে পারবে।