জাতীয়

বনাঞ্চল ধ্বংস ও ঘুষ বাণিজ্যের অভিযোগ পার্বত্য চট্টগ্রাম বন বিভাগের কর্মকর্তা আবু সুফিয়ান বিতর্কে

পার্বত্য চট্টগ্রাম অঞ্চলের বনাঞ্চল ধ্বংস, ঘুষ বাণিজ্য ও ভুয়া জোত পারমিট ইস্যুর মাধ্যমে কোটি কোটি টাকার বনসম্পদ লুটপাটের অভিযোগ উঠেছে বন বিভাগের এক কর্মকর্তার বিরুদ্ধে। অভিযুক্তের নাম আবু সুফিয়ান, যিনি বর্তমানে খাগড়াছড়ির বীজ ও বীজতলা রেঞ্জের দায়িত্বে রয়েছেন।

অভিযোগ সূত্রে জানা গেছে, আবু সুফিয়ান নিজেকে মুক্তিযোদ্ধার সন্তান পরিচয়ে ও তৎকালীন রাজনৈতিক প্রভাব খাটিয়ে বিভিন্ন সময়ে ঘুষ ও তদবিরের মাধ্যমে গুরুত্বপূর্ণ পদে বদলি ও পদোন্নতি লাভ করেছেন।

অভিযোগ অনুযায়ী, ২০১৯ সালে রাঙামাটি সার্কেল থেকে বদলি হয়ে আবু সুফিয়ান পার্বত্য চট্টগ্রাম দফিন বন বিভাগের চন্দ্রঘোনা চেক স্টেশনে যোগ দেন। অভিযোগ রয়েছে, তিনি তৎকালীন বনমন্ত্রীর ছেলে জুলমুনের মাধ্যমে ২০ লক্ষ টাকা ঘুষ প্রদান করে এ পোস্টিং নিশ্চিত করেন।

পরবর্তীতে ডিএফওকে রাজনৈতিক চাপের মুখে ফেলে চন্দ্রঘোনা থেকে ঘাঘড়া স্টেশনে বদলি নেন, যা বন বিভাগের বদলি নীতিমালার পরিপন্থী বলে জানা যায়।

 

 

 

এরপর শুভলং রেঞ্জে রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে দায়িত্ব নিয়ে আবু সুফিয়ান বনাঞ্চল ধ্বংসের এক নতুন অধ্যায় শুরু করেন বলে অভিযোগ উঠেছে।

স্থানীয় সূত্র জানায়, তিনি ভুয়া জোত পারমিট ইস্যুর মাধ্যমে সংরক্ষিত বনাঞ্চল থেকে বিপুল পরিমাণ সেগুন কাঠ পাচার করেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রকৃত মালিকদের জমির পরিবর্তে সংরক্ষিত বনের গাছ কেটে এনে তথাকথিত ‘জোত পারমিটে’ দেখানো হতো, যেন সেই কাঠ বৈধভাবে কাটা হয়েছে। এই কৌশলে তিনি কোটি কোটি টাকার কাঠ পাচার করে অবৈধ সম্পদ অর্জন করেছেন বলে অভিযোগকারীরা জানিয়েছেন।

পরবর্তীতে তিনি ১৫ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে কাপ্তাই রেঞ্জে বদলি হন। কাপ্তাই রেঞ্জে দায়িত্ব গ্রহণের পর আবু সুফিয়ান স্থানীয় কাঠ ব্যবসায়ী ও আওয়ামীপন্থী একটি চক্রের সঙ্গে যোগসাজশে কাপ্তাই সদর, রামপাহাড় ও শুকনাছড়ি বিটের সংরক্ষিত সেগুন গাছ কেটে পাচার করেছেন বলে স্থানীয়দের দাবি।

সরেজমিনে পরিদর্শন করলে সংরক্ষিত বনাঞ্চলে নির্বিচারে গাছ কাটার চিহ্ন পাওয়া যায় বলে সূত্র জানিয়েছে।

২০২৪ সালের মে মাসে আবু সুফিয়ান রাঙামাটি বন সংরক্ষককে ১০ লক্ষ টাকা ঘুষ দিয়ে ‘অশ্রেণীভুক্ত বনাঞ্চল ও বনীকরণ বিভাগে’ বদলি হন।

পরবর্তীতে ডিএফও-কে আরও ২০ লক্ষ টাকা প্রদান করে খাগড়াছড়ির বীজ ও বীজতলা রেঞ্জের রেঞ্জ কর্মকর্তা হিসেবে যোগ দেন।

বর্তমানে তিনি ‘পুনঃকাটিং জোত’-এর নামে এক প্রকার ঘুষ বাণিজ্য চালাচ্ছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, সাধারণ মানুষ ডিসি অফিস থেকে জোতের কাগজ নিয়ে এলে, জমিতে গাছ না থাকলেও তিনি ১০-১৫ হাজার ‘ভুয়া গাছ’ দেখিয়ে মোটা অঙ্কের টাকা নিয়ে পারমিট ইস্যু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, প্রতি ঘনফুট কাঠের বিপরীতে ডিএফও ৩৫ টাকা হারে কমিশন নেন, যাচাই-বাছাই ছাড়াই পারমিট অনুমোদন করেন।

অভিযোগকারীরা জানান, পার্বত্য চট্টগ্রামের সংরক্ষিত বনাঞ্চলের একাধিক অংশে সেগুন গাছের নির্বিচার কাটাকাটির প্রমাণ সরেজমিন তদন্তেই মিলবে। তারা বলেন, “আবু সুফিয়ান নিজেকে মাঝে মাঝে ‘পাগল’ দাবি করে নিজের কর্মকাণ্ড আড়াল করেন, অথচ তার পেছনে কোটি টাকার পোস্টিং বাণিজ্য ও কাঠ পাচার সিন্ডিকেট সক্রিয়।”

তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, শুভলং, কাপ্তাই ও বীজতলা রেঞ্জের ইস্যুকৃত জোত পারমিটসমূহ পর্যালোচনা করলে প্রকৃত চিত্র স্পষ্ট হয়ে উঠবে।

এ ব্যাপারে বনবিভাগের উচ্চপর্যায়ের কর্মকর্তাদের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে কেউ প্রকাশ্যে মুখ খুলতে চাননি। এক সিনিয়র কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন,

এ ধরনের অভিযোগ নতুন নয়। পার্বত্য অঞ্চলে কিছু কর্মকর্তা রাজনৈতিক ছত্রছায়ায় থেকে অবৈধ পারমিট বাণিজ্য চালাচ্ছেন। তবে প্রমাণসহ অভিযোগ এলে বিভাগীয় তদন্ত শুরু করা সম্ভব।”

বন ধ্বংসকারীরা বছরের পর বছর পার পেয়ে যাচ্ছে। তাদের পেছনে রাজনীতি ও অর্থের জোর আছে। একবার সত্যিকারের তদন্ত শুরু হলে, বন বিভাগের ভেতরের দালালচক্রের মুখোশ খুলে যাবে।”

তারা অবিলম্বে একটি স্বাধীন তদন্ত কমিটি গঠন করে আবু সুফিয়ানের সকল পোস্টিং এলাকা— চন্দ্রঘোনা, শুভলং, কাপ্তাই ও বীজতলা রেঞ্জে মাঠ পর্যায়ে সরেজমিন তদন্ত করার দাবি জানান।

এই বিষয়ে জানতে আবু সুফিয়ানকে ফোন করা হলে তার ফোনটি বন্ধ পাওয়া যায়।

 



সম্পর্কিত খবর