জাতীয়

বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশলী অনুপমের ১০০ কোটি টাকার কমিশন বাণিজ্য

উলট-পালট করে দে মা, লুটে-পুটে খাই—বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপমের বেলায় যেন এই কথাটি প্রযোজ্য। স্বৈরচার আওয়ামী লীগের সময়ে সাবেক জেলা পরিষদ সদস্য মোজাম্মেল হক বাহাদুরের সঙ্গে মিলে মিশে লুটপাট করেছিলেন তিনি। ৫ আগস্টের পর দেশের সব কিছু পাল্টালেও চরিত্র পাল্টায়নি অনুপম দে। এবার তিনি বিএনপি নামধারী কতিপয় নেতা ও বান্দরবান পার্বত্য জেলা পরিষদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে আতাত করে লুটপাট অব্যাহত রেখেছেন। সর্বশেষ তিনি ৪০ কোটি টাকার টেন্ডার ভাগাভাগি করে আখের গুছিয়েছেন। এ নিয়ে জেলা জুড়ে চলছে তোলপাড়। তবে তিনি নির্ভার। দৈনিক সাঙ্গুকে তিনি বলেন, লিখেন লিখেন বেশি করে লিখেন আমি যাতে তাড়াতাড়ি বান্দরবান থেকে চলে যেতে পারি।

অভিযোগ রয়েছে, আওয়ামী লীগের আঁচলে বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের যত কাজের টেন্ডার হয়েছে, সবই স্থানীয় জনস্বাস্থ্যের মাফিয়া হিসাবে পরিচিত মোজাম্মেল হক বাহাদুরের পেটে গেছে। আর তার অন্যতম সহযোগী ছিলেন নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে।

অনুসন্ধানে জানা গেছে, গোপনে আপস-রফার মাধ্যমেই এই টেন্ডার জমা দেওয়া হয় এবং বাকিদের কোনো শিডিউলই কিনতে দেওয়া হয় না। তবে যাদের শিডিউল কিনতে দেওয়া হয় না, তাদের একটা পার্সেন্টেজ যে কাজটি পাবে সে বণ্টন করে দিয়ে থাকে। বান্দরবান জনস্বাস্থ্যে দীর্ঘদিন ধরেই এই চর্চাটা চলে আসছে। এছাড়া জনস্বাস্থ্যের প্রত্যেক প্রকল্প থেকে নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দেকে ২০ শতাংশ করে টাকা দেওয়ার অসংখ্য অভিযোগও রয়েছে। সে হিসেবে শুধু মাত্র বান্দরবানে জনস্বাস্থ্য অধিদপ্তরে ৫০০ কোটি টাকার উন্নয়ন কাজের ১০০ কোটি টাকাই গেছে অনুপম দে’র পেটে।

সর্বশেষ গত ২১ আগস্ট জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর সারাদেশে নিরাপদ পানি সরবরাহ প্রকল্পের আওতায় বান্দরবানে নানা উন্নয়ন কাজ বাস্তবায়নের জন্য একটি বড় টেন্ডার আহ্বান করে। টেন্ডারের নম্বর ৪৬.০৩.০৩০০.০০০.৯৯.০০১.২৪-১৮৬। এতে ৪টি টেস্ট টিউবওয়েল, ২টি প্রোডাকশন ওয়েল, ২টি পাম্প হাউস, ২টি আরসিসি ওভারহেড ওয়াটার ট্যাংক, মেকানিক্যাল ওয়ার্কস, পাইপলাইন নেটওয়ার্ক এবং বিভিন্ন ভবন নির্মাণকাজসহ মোট ১২টি কাজ অন্তর্ভুক্ত করা হয়। এ প্রকল্পের আনুমানিক ব্যয় ধরা হয়েছে প্রায় ৪০ কোটি টাকা।

অভিযোগ রয়েছে, বান্দরবান জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তরের নির্বাহী প্রকৌশলী অনুপম দে কয়েকজন ঠিকাদারের সঙ্গে আঁতাত করে এসব কাজ ভাগাভাগি করে দেন। প্রতিটি কাজের বিপরীতে তিনি ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা ঘুষ নেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। স্থানীয় ঠিকাদার মো. সরওয়ার অভিযোগ করেন, এখানে নামে মাত্র টেন্ডার আহ্বান করা হয়। নির্বাহী প্রকৌশলী আগে থেকেই তার পছন্দের ঠিকাদারদের গোপন কোড ও দর জানিয়ে দেন। ফলে অন্য ঠিকাদাররা কোনোভাবেই কাজ পান না। তার দাবি, গত তিন বছরে নির্বাহী প্রকৌশলী প্রায় ৩০০ কোটি টাকার টেন্ডার জালিয়াতি করে ব্যক্তিগত স্বার্থ হাসিল করেছেন।

এবারের টেন্ডার ভাগাভাগির তালিকায় শরীফ নিজাম, মোহাম্মদ কামাল, মোহাম্মদ মোস্তফা, মোহাম্মদ রবিউল, নুরুসহ কয়েকজন ঠিকাদারের নাম এসেছে। স্থানীয়ভাবে তারা আওয়ামী লীগের দোসর ও সাবেক মন্ত্রী বীর বাহাদুরের ঘনিষ্ঠ হিসেবে পরিচিত। তবে নাম প্রকাশ না করার শর্তে এক ঠিকাদার জানান, বান্দরবানে টেন্ডার ভাগাভাগিতে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি উভয় দলের নেতারাই একাকার হয়ে যায়। এবারের টেন্ডারেও জেলা বিএনপির কয়েকজন নেতার সংশ্লিষ্টতার অভিযোগ পাওয়া গেছে।

এদিকে জনস্বাস্থ্যে গত তিন বছরে প্রায় তিনশ কোটি টাকার কাজ চললেও খোদ জেলা সদরের বান্দরবান পৌর শহরে পানিসংকট কাটছে না। চাহিদার এক-তৃতীয়াংশ পানিও পাচ্ছে না পৌরবাসী। তাছাড়া সরবরাহ দেওয়া পানি ঘোলা ও দুর্গন্ধযুক্ত বলে অভিযোগ করেছে বাসিন্দারা।

পৌরসভায় প্রায় এক লক্ষ জনসংখ্যা অনুযায়ী প্রতিজনের গড়ে ১০০ গ্যালন করে প্রায় ১ লাখ গ্যালন পানির চাহিদা রয়েছে। বর্তমানে ক্যাচিংঘাটা পানি পরিশোধন ও সরবরাহ কেন্দ্র থেকে ২৮–৩০ লাখ গ্যালন পানি গ্রাহককে পালাক্রমে সরবরাহ দেওয়া হচ্ছে।

পৌরবাসী জানান, তিন-চার দিন পর এক ঘণ্টা করে একবার পানি সরবরাহ দেওয়া হলেও প্রায় আধা ঘণ্টা পর্যন্ত আসে ঘোলা ও ময়লাযুক্ত পানি।

বনরূপা পাড়া এলাকায় প্রায় ২১ দিন ধরে পানি সরবরাহ করা হচ্ছে না বলে জানিয়েছেন এলাকার বাসিন্দা শিমুল দাশ। তার মতো মো. শিপনসহ অসংখ্য মানুষের একই অভিযোগ—পানি নেই, পানি পাচ্ছি না।

উজানিপাড়ার গৃহবধূ রূপনা দাশ বলেন, যে পানি পাওয়া যায়, তা নিরাপদ নয়। এ জন্য পানীয় জলের জন্য যাঁদের বাড়িতে গভীর নলকূপ বা নলকূপ রয়েছে, তাঁদের কাছে ধরনা দিতে হয়।

স্থানীয় লোকজন জানান, জেলা শহরের মধ্যমপাড়া, জাদিপাড়া, কলাপাড়া, আর্মিপাড়া, মেম্বারপাড়া, বনরূপা, কাশেমপাড়া ও বাজার এলাকায় পানির সংকট বেশি। এখানকার বাসিন্দারা আশপাশের গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহ করেন। 

সরেজমিনে দেখা যায়, উজানিপাড়া, মধ্যমপাড়া, জাদিপাড়া ও কলাপাড়ার কয়েকটি স্থানে গভীর নলকূপ থেকে পানি সংগ্রহের জন্য নারীদের ভিড় লেগে আছে। এসব নলকূপে সকাল ও বিকেলে পানি সরবরাহ দেওয়া হয়। কেউ কেউ ঠেলাগাড়িতে বড় বড় ড্রাম নিয়ে পানি নিয়ে যাচ্ছেন।

উজানিপাড়ার বাসিন্দা উচিংপ্রু মারমা বলেন, পানি সরবরাহ লাইনে দৈনন্দিন ব্যবহারের অর্ধেক পানিও পাওয়া যায় না। এ জন্য অন্য সব কাজ বাদ দিয়ে সকালে পানির জন্য এখানে-ওখানে ঘুরতে হয়।

 

 



সম্পর্কিত খবর