জাতীয়

শাহজালাল কার্গো ওয়ারহাউসের আগুনে কোটি টাকার পণ্য ছাই, নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন

হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর সংলগ্ন কার্গো ওয়ারহাউসে (আমদানি পণ্য সংরক্ষণাগার) ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় বিপুল পরিমাণ আমদানি পণ্য পুড়ে কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। আগুনের তীব্রতা এতটাই ছিল যে ফায়ার সার্ভিসের ৩৭টি ইউনিটকে সাত ঘণ্টারও বেশি সময় ধরে (শনিবার রাত ৯টা পর্যন্ত) কাজ করতে হয়েছে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে।

 

অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন ক্ষুদ্র আমদানিকারক ও সিএনএফ (ক্লিয়ারিং অ্যান্ড ফরওয়ার্ডিং) এজেন্টরা। আগুন সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণে আসার পরেও পুরো এলাকা ধোঁয়ায় ঢেকে ছিল।

 

ক্ষতিগ্রস্তদের দীর্ঘশ্বাস ও ডকুমেন্ট জটিলতা:

 

ইমুট্রান্স নামক একটি প্রতিষ্ঠানের ম্যানেজার (আমদানি-রপ্তানি শাখার ইনচার্জ) হাসান জানিয়েছেন, আগুনে তাদের চারটি ডকুমেন্টসহ মোট ১৩ হাজার ডলারের (প্রায় ১৪ লাখ টাকা) কনসাইনমেন্ট সম্পূর্ণরূপে পুড়ে গেছে।

 

বড় শিপমেন্ট হওয়ায় পণ্যটির ইনস্যুরেন্স করা ছিল। তবে হাসান বলেন, “ইনভয়েস, প্যাকিং লিস্ট, এয়ারবিলসহ প্রয়োজনীয় সব নথি আগুনে পুড়ে যাওয়ায় ক্ষতিপূরণের (ক্লেইম) প্রক্রিয়া এখন অনেক জটিল হয়ে গেছে।” তিনি উল্লেখ করেন, সাধারণত আন্তর্জাতিক আমদানি-রপ্তানির আইন অনুযায়ী ইনস্যুরেন্স কোম্পানি এই ক্ষতিপূরণ বহন করে, কিন্তু নথিপত্র না থাকায় বায়ারদের সঙ্গে যোগাযোগ করাও কঠিন হয়ে পড়েছে।

 

রয়্যাল ক্লিয়ারিং হাউস জানিয়েছে, তাদের মালামালের অবস্থা নিশ্চিত করা যাচ্ছে না, কারণ সংশ্লিষ্ট সব নথি ও তথ্যসংগ্রহ ব্যবস্থা পুড়ে গেছে।

 

নিরাপত্তা ব্যবস্থায় গুরুতর প্রশ্ন:

 

দেশের সর্বোচ্চ রাজস্ব আদায়কারী এই সংবেদনশীল এলাকায় অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার এমন বেহাল দশা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন উঠেছে। রয়্যাল ক্লিয়ারিং হাউসে কর্মরত নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা জানান, এমন গুরুত্বপূর্ণ স্থানে অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থায় এতটা অবহেলা অগ্রহণযোগ্য।

 

ক্ষতিগ্রস্ত এজেন্ট তৌফিক আহমেদ বলেন, আগুন প্রথমে ছোট ছিল, কিন্তু দ্রুত কেমিক্যালের অংশে ছড়িয়ে পড়লে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যায়। ব্যবসায়ীরা অভিযোগ করেছেন, বিপুল পরিমাণ দাহ্য পণ্য সংরক্ষণের পরও ওয়ারহাউসে জরুরি ফায়ার এক্সটিংগুইশার, হাইড্রেন্ট বা প্রশিক্ষিত কর্মী ছিল না।

 

২০১৩ সালের ঘটনার পুনরাবৃত্তি:

 

ব্যবসায়ী ও পুরোনো কর্মীরা জানিয়েছেন, ২০১৩ সালেও একই কার্গো ভিলেজে অগ্নিকাণ্ড ঘটেছিল। তখন দ্রুত পদক্ষেপ নেওয়ায় ক্ষয়ক্ষতি সীমিত ছিল। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন পুরোনো কর্মচারী বলেন, "তখন সর্বোচ্চ ৩০ মিনিটের মতো আগুন ছিল। কার্যকরী ব্যবস্থা নেওয়ায় এতো ক্ষতি হয়নি। কিন্তু এবার দুদিন লেগে গেল।" তিনি অভিযোগ করেন, আগের ঘটনার পর নিরাপত্তা জোরদারের আশ্বাস দেওয়া হলেও বাস্তবে তা হয়নি।

 

দীর্ঘমেয়াদি প্রভাবের আশঙ্কা:

 

অগ্নিকাণ্ডের কারণে শুধু পণ্য নয়, ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এই খাতে দৈনিক ভিত্তিতে কর্মরত প্রায় ৩০-৪০ হাজার সিএনএফ কর্মীর জীবিকাও। ব্যবসায়ীরা আশঙ্কা করছেন, তদন্ত ও পুনর্গঠন প্রক্রিয়া শেষ না হওয়া পর্যন্ত তাদের কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়বে, যা আন্তর্জাতিক বাণিজ্যে প্রভাব ফেলতে পারে। ক্ষতিগ্রস্ত ব্যবসায়ীরা বর্তমানে ইনস্যুরেন্স কোম্পানির সঙ্গে যোগাযোগের চেষ্টা করছেন, তবে ক্ষতিপূরণের পরিমাণ নিয়ে কেউই নিশ্চিত নন।

 

প্রসঙ্গত, গত শনিবার (১৮ অক্টোবর) দুপুর ২টা ২০ মিনিটে শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের কার্গো ভিলেজে এই ভয়াবহ আগুন লাগে। এই ঘটনায় শতাধিক আমদানি-রপ্তানি পণ্য, গার্মেন্টসের কাঁচামাল ও বিভিন্ন কনসাইনমেন্ট সম্পূর্ণরূপে পুড়ে যায়। ঘটনার পর থেকে বিমানবন্দরের পণ্য পরিবহন কার্যক্রম আংশিকভাবে বন্ধ রয়েছে।



সম্পর্কিত খবর