ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নিয়েছিল পাকিস্তান। যদিও শান্তি আলোচনা সফল হয়নি। তবে পাকিস্তানের এই উদ্যোগে দেশটি এখন বিশ্ব কূটনীতির কেন্দ্রে অবস্থান করছে। সারা বিশ্বের মানুষের চোখ এখন পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় শান্তি আলোচনার দিকে। পাকিস্তানের মতো একটি দেশ কীভাবে এই অসম্ভবকে সম্ভব করেছে, আর এর নেপথ্যেই বা কারা রয়েছে, তা নিয়ে বিশ্বে জল্পনা-কল্পনা চলছে। আর পাকিস্তানের এই ভূমিকায় প্রতিবেশী দেশ ভারত অনেকটাই যেন চাপের মুখে পড়েছে।
যেভাবে কেন্দ্রবিন্দুতে পাকিস্তান
মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গে পাকিস্তানের সেনাবাহিনী প্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের একটি গভীর সম্পর্ক রয়েছে। গত বছরের জুন মাসে আসিম মুনির ওয়াশিংটন সফর করেছিলেন।
সেই সফরের মধ্য দিয়ে তাদের দু’জনের মধ্যে সখ্য তৈরি হয়। সে সময় হোয়াইট হাউসে প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প তার সম্মানে ভোজের আয়োজন করেছিলেন। সেই সফরে ভারত ও পাকিস্তানের মধ্যে যে উত্তেজনা দেখা দিয়েছিল, তা প্রশমনে ট্রাম্পের অবদানকে সম্মান জানিয়ে জেনারেল মুনির তাকে শান্তি পুরস্কারের জন্য মনোনয়ন দেওয়ার আহ্বানও জানিয়েছিলেন। এবার সেই সম্পর্কের সূত্র ধরেই আসিম মুনির ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে যুদ্ধ বন্ধে শান্তি আলোচনার উদ্যোগ নেন। উভয় পক্ষের মধ্যে আলোচনা করে সফলও হন। আর তার ফলশ্রুতিতেই ইসলামাবাদে শান্তি আলোচনায় বসে যুক্তরাষ্ট্র-ইরান। এভাবেই আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসে পাকিস্তান।
লাহোরভিত্তিক প্রতিরক্ষা বিশ্লেষক এজাজ হায়দার বলেছেন, পাকিস্তান মুসলিম ব্লকের একমাত্র দেশ যা ইরান এবং উপসাগরীয় দেশগুলোর সঙ্গে কার্যকর সম্পর্ক বজায় রাখে, যার ফলে তারা সবার সঙ্গেই যোগাযোগ রাখতে পারে। এ কারণেই পাকিস্তান ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যস্থতা করতে পেরেছে।
পিছিয়ে পড়ল কাতার
অতীতে মধ্যপ্রাচ্যের যেকোনো সংকটে কাতারকে মধ্যস্থতার ভূমিকায় দেখা গেছে। ইসরায়েল-হামাস সংঘাত, মার্কিন-তালেবান আলোচনা, পাকিস্তান-আফগানিস্তান শান্তি আলোচনায় মুখ্য ভূমিকা পালন করে এসেছে দেশটি। তবে এবার দৃশ্যপট ভিন্ন। এবার ইরান-যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনায় ভূমিকা নিতে পারেনি কাতার। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র মাজেদ আল-আনসারি আগেই খুব স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন, কাতার এবার কোনো ধরনের মধ্যস্থতায় জড়িত নেই। তবে কেন নেই, সে ব্যাখ্যা তিনি দেননি।
চাপের মুখে ভারত
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে সংঘাত নিরসনে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারীর ভূমিকা নিয়ে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে চলে আসায় চাপের মুখে পড়েছে ভারত। চিরপ্রতিদ্বন্দ্বী পাকিস্তানের এই ভূমিকায় ভারত এখন অস্বস্তিতে। এ ঘটনার মধ্য দিয়ে পাকিস্তান বিশ্ব দরবারে প্রতিষ্ঠা করতে সক্ষম হয়েছে যে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে এখন ভারতের চেয়ে পাকিস্তানই বেশি ঘনিষ্ঠ মিত্র। ফলে এই অঞ্চলের ভূ-রাজনীতিতে পাকিস্তানের প্রভাব বাড়ারও আশঙ্কা করছে ভারত।
এদিকে মধ্যস্থতাকারী হিসেবে পাকিস্তানকে বেছে নেওয়ার খবর প্রকাশের পর থেকে ভারতের নরেন্দ্র মোদির সরকার নিজ দেশেই সমালোচিত হচ্ছে। ভারতের বিরোধী দল কংগ্রেস দেশটির সরকারের সমালোচনা করে এটিকে ভারতীয় কূটনীতির জন্য একটি ‘লজ্জাজনক’ ঘটনা বলে বর্ণনা করছে। তবে এ বিষয়ে ভারতের পররাষ্ট্রমন্ত্রী এস জয়শঙ্কর পাকিস্তানের ভূমিকাকে ‘দালালি’ বলে নাকচ করে দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘আমরা কী ধরনের মধ্যস্থতা করতে পারি, তা জানাতে অন্য দেশগুলোর কাছে আমাদের দৌড়াদৌড়ি করতে হয় না’।
নেপথ্যে চীন?
ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনার আগে পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার চীন সফর করেন। সে সময় পাকিস্তানের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ইসহাক দার বেইজিংয়ে শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে বৈঠকে বসেন। পাকিস্তানের সঙ্গে ইরান ও চীনের সম্পর্ক খুব গভীর। মধ্যপ্রাচ্যে সংঘাত নিরসনে চীনের সমর্থন চান ইসহাক দার। ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রের মধ্যে শান্তি আলোচনায় পাকিস্তানের মধ্যস্থতার নেপথ্যে ভূমিকায় চীন ছিল বলে অনেক বিশ্লেষক মনে করেন।
পাকিস্তানের পার্লামেন্টের উচ্চকক্ষের প্রতিরক্ষা ও পররাষ্ট্র বিষয়ক কমিটির প্রধান মুশাহিদ হোসেন সৈয়দ বলেন, ‘পাকিস্তান ও চীন ঘনিষ্ঠ অংশীদার এবং প্রতিবেশী হিসেবে যুদ্ধের অবসানে প্রথম দিন থেকেই নিবিড়ভাবে সমন্বয় করে আসছে। যেহেতু ইরান ট্রাম্প ও নেতানিয়াহুকে বিশ্বাস করে না, তাই চূড়ান্ত শান্তি চুক্তিতে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে প্রধান জামিনদার হিসেবে চীনের ভূমিকা অপরিহার্য।’
এ বিষয়ে জানতে চাইলে আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিশ্লেষক অধ্যাপক পারভেজ করিম আব্বাসী বাংলানিউজকে বলেন, ‘ইরান ও যুক্তরাষ্ট্রকে এক টেবিলে আলোচনায় বসিয়ে পাকিস্তান একটি ডিপ্লোম্যাটিক ব্রেক থ্রো করেছে। এটা সম্ভব হয়েছে, পাকিস্তানের সঙ্গে ইরানের গভীর সম্পর্ক থাকায়। আবার পাকিস্তানের সঙ্গে চীনের সম্পর্কও গভীর। আর মনে রাখতে হবে ইরান থেকেই তেল নেয় চীন। অন্যদিকে মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বলেছেন, পাকিস্তানের জেনারেল আসিম মুনির ও প্রধানমন্ত্রী শেহবাজ শরীফের সঙ্গে তার গভীর সম্পর্ক আছে। এই সব মিলিয়েই পাকিস্তান দুই দেশকে এক টেবিলে আনতে সক্ষম হয়েছে।’