চুক্তি সই হওয়ার দীর্ঘ আঠারো বছর পর প্রথমবারের মতো পররাষ্ট্র সচিব পর্যায়ের বৈঠকে বসতে যাচ্ছে বাংলাদেশ ও কুয়েত। ২০০৬ সালে এই পর্যায়ের বৈঠক আয়োজনের বিষয়ে চুক্তি সই হলেও এবারই প্রথম ‘ফরেন অফিস কনসালটেশন’ (এফওসি) অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে, যা দুই দেশের সম্পর্কের ক্ষেত্রে তাৎপর্যপূর্ণ অগ্রগতি হিসেবে দেখা হচ্ছে।
রোববার (১৯ অক্টোবর) ঢাকার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় এই গুরুত্বপূর্ণ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হবে। বাংলাদেশের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (পূর্ব ও পশ্চিম) ড. মো. নজরুল ইসলাম। অন্যদিকে, কুয়েতের পক্ষে নেতৃত্ব দেবেন দেশটির এশিয়াবিষয়ক সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী রাষ্ট্রদূত সামি ঈসা জোহর হায়াত।
আলোচনায় যেসব বিষয় গুরুত্ব পাবে:
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, বৈঠকে মূলত রাজনৈতিক সম্পর্ক জোরদার, ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানো, শ্রমবাজার সম্প্রসারণ, তথ্যপ্রযুক্তি ও ডিজিটাল অর্থনীতিতে সহযোগিতা, অবকাঠামো এবং কৃষিখাতে পারস্পরিক সহযোগিতা—এই বিষয়গুলো গুরুত্ব পাবে।
এছাড়াও ঢাকার পূর্বাচলে ইমাম প্রশিক্ষণ কেন্দ্র স্থাপনে কুয়েতের সহযোগিতা, দুই দেশের মধ্যে সরাসরি ফ্লাইট চালুর উদ্যোগ এবং হালাল পণ্যের অ্যাক্রিডিটেড সনদ প্রদানে সহযোগিতা নিয়েও আলোচনা হবে। কূটনৈতিক সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ কুয়েত থেকে সার আমদানির আগ্রহ প্রকাশ করবে। একই সঙ্গে শ্রমবাজার ও সামরিক সহযোগিতা নিয়েও আলোচনার সম্ভাবনা রয়েছে।
পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব ড. মো. নজরুল ইসলাম এ প্রসঙ্গে বলেন, "এ বৈঠকের মাধ্যমে দুই দেশের ভ্রাতৃত্বপূর্ণ সম্পর্ক আরও জোরদার হবে। আলোচনায় বিশেষ গুরুত্ব পাবে ব্যবসা-বাণিজ্য ও বিনিয়োগ বাড়ানোর বিষয়টি। আমরা চাই, কুয়েত থেকে বিনিয়োগ আসুক, পাশাপাশি দেশটিতে আমাদের রপ্তানিও বাড়ুক।"
তিনি আরও জানান, মধ্যপ্রাচ্যে বাংলাদেশের কৃষিপ্রযুক্তি ব্যাপকভাবে সফল এবং কুয়েতের কাছেও তারা এই বিষয়গুলো তুলে ধরবেন।
শ্রমবাজার ও সামরিক সহযোগিতা:
বর্তমানে কুয়েতে প্রায় তিন লাখ বাংলাদেশি কর্মী কাজ করেন। দীর্ঘদিন ধরে বাংলাদেশ থেকে খুব বেশি কর্মী নিচ্ছে না দেশটি। নজরুল ইসলাম জানান, কুয়েতের অর্থনীতি আকারে বড় না হলেও দেশটি জিসিসি সদস্য এবং আর্থিকভাবে সমৃদ্ধ। তারা সেখানে কর্মসংস্থানের নতুন খাত ও সম্ভাবনা খুঁজে দেখতে চান, তাই আরও বাংলাদেশি শ্রমিক নেওয়ার বিষয়টিও আলোচনায় গুরুত্ব পাবে।
সামরিক সহযোগিতা প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের ঊর্ধ্বতন এক কর্মকর্তা জানান, জাতিসংঘ শান্তিরক্ষা মিশনের বাইরে দ্বিপক্ষীয় চুক্তিতে কুয়েতে বাংলাদেশের একটি সামরিক কন্টিনজেন্ট কাজ করছে। পাঁচ হাজারেরও বেশি সদস্যের এই দলে প্রকৌশলী, চিকিৎসকসহ বিভিন্ন বিষয়ে দক্ষ কর্মীরা সরাসরি কুয়েত সরকারের অধীনে দায়িত্ব পালন করেন। ইরাক-কুয়েত যুদ্ধের পর ‘অপারেশন কুয়েত পুনর্গঠন (ওকেবি)’ প্রকল্পের মাধ্যমে এই সহযোগিতার সূত্রপাত হয়, যা দুই দেশের প্রতিরক্ষা সহযোগিতাকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
সফরসূচি ও উচ্চপর্যায়ের সাক্ষাৎ:
সফরসূচি অনুযায়ী, কুয়েতের সহকারী পররাষ্ট্রমন্ত্রী শনিবার দিনগত রাতে ঢাকায় পৌঁছে একদিনের সংক্ষিপ্ত সফরে রোববার (১৯ অক্টোবর) বৈঠকে যোগ দেবেন। এরপর তিনি পররাষ্ট্রসচিব আসাদ আলম সিয়াম, সেনাপ্রধান জেনারেল ওয়াকার-উজ-জামান এবং সশস্ত্র বাহিনী বিভাগের প্রিন্সিপাল স্টাফ অফিসার (পিএসও) ** লেফটেন্যান্ট জেনারেল এস এম কামরুল হাসান**-এর সঙ্গে সাক্ষাৎ করবেন।
উল্লেখ্য, এর আগে ২০১০ সালের ফেব্রুয়ারিতে কুয়েতে তিনদিনের রাষ্ট্রীয় সফর করেন সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং ২০১৬ সালের মে মাসে কুয়েতের প্রধানমন্ত্রী জাবের আল মুবারক আল হামাদ আল সাবাহ তিনদিনের সফরে ঢাকায় এসেছিলেন।