আদিবাসী সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব কারাম পূজা পালিত হয়েছে। বংশপরম্পরায় যুগ যুগ ধরে প্রতিবছরের ন্যায় এবারও প্রায় ৩ থেকে ৪ হাজার মানুষের সমাগমে অত্যন্ত জাঁকজমকপূর্ণভাবে নালুয়া চা-বাগানের অধিবাসী, চা-শ্রমিক ও বাগানবাসীরা ঐতিহ্যবাহী এ কারাম উৎসব পালন করেছেন।
শনিবার (১২ সেপ্টেম্বর) দিনব্যাপী হবিগঞ্জের চুনারুঘাট উপজেলার নালুয়া চা-বাগানের ফুটবল খেলার মাঠে ঐতিহ্যবাহী কারাম উৎসব পালন করেন আদিবাসী সম্প্রদায়ের মানুষেরা। নালুয়া চা-বাগান অধিবাসীবৃন্দের আয়োজনে ও সর্বস্তরের মানুষের সার্বিক সহযোগিতায় সিলেট, মৌলভীবাজার, সাতগাঁও, সুরমা, দেউন্দী, লালচান্দ, চান্দপুর, চণ্ডীছড়া, চাকলা ও আমু-নালুয়া চা-বাগানসহ বিভিন্ন বাগান থেকে আগত ওরাওঁ, মুণ্ডা, ঝরা, খাড়িয়া, বাড়াইক, তাঁতী, কর্মকার, ভূমিজ, তুরিয়া, মহালী ও সাঁওতাল সম্প্রদায়সহ অন্যান্য সম্প্রদায়ের ১৪-১৫টি নৃত্যদল অংশে নেয়। কারাম উৎসবে দলগুলো নেচে-গেয়ে মাতিয়ে নিজেদের ভাষা, সংস্কৃতি ও ঐতিহ্য তুলে ধরে।
কারাম মূলত একটি গাছের পূজা। বিভিন্ন জাতিগোষ্ঠীর মানুষের কাছে এটি একটি পবিত্র গাছ এবং মঙ্গলের প্রতীক। পূজার সময় ধর্মা ও কর্মা নামে দুই ভাইয়ের জীবনী তুলে ধরা হয়। লোকবিশ্বাস অনুযায়ী, ধর্ম পালন করায় ধর্মা সকল বিপদের হাত থেকে রক্ষা পান; অন্যদিকে কর্মা ধর্ম পালন না করায় ক্ষতিগ্রস্ত হন। কারামডাল অস্থায়ী মণ্ডপে পুঁতে রেখে পূজা-অর্চনা, নাচ-গান ও কিচ্ছা বলার মধ্য দিয়ে প্রতিবছর কারাম উৎসব পালিত হয়। এ সময় পুরো এলাকা সকল সম্প্রদায়ের মানুষের মিলনমেলায় পরিণত হয়। পূজা শেষে পরদিন কারামডাল উঠিয়ে গ্রামের তরুণ-তরুণীসহ সব বয়সের নারী-পুরুষ নেচে-গেয়ে বাড়ি বাড়ি ঘুরে পুকুরে বিসর্জন দেন। কারাম উৎসবের জন্য পুরো বছর অধীর আগ্রহে অপেক্ষায় থাকেন তারা। এ উৎসবে সাংস্কৃতিক দলগুলো তাদের নাচ-গান পরিবেশন করে।
নালুয়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক বাবু হরেন্দ্র উরাং, আমুরোড হাইস্কুল অ্যান্ড কলেজের সিনিয়র শিক্ষক রামেশ্বর ভৌমিক ও দেবরাম মুণ্ডার যৌথ সঞ্চালনায় প্রথম অধিবেশনে সভাপতিত্ব করেন নালুয়া চা-বাগানের ৯ নম্বর ওয়ার্ড মেম্বার রতন মুণ্ডা। দ্বিতীয় অধিবেশনে সঞ্চালনায় ছিলেন আকাশ মুণ্ডা ও জয়দেব ভৌমিক। বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন ডুলনা প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক প্রবীর ঝরা, নিপেন মুণ্ডা ও নালুয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক দুর্জয় তাঁতী।
নেচে-গেয়ে কারাম উৎসবের শুভ উদ্বোধন করেন এবং অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন হবিগঞ্জের জেলা প্রশাসক ড. জি. এম. সরফরাজ। বিশেষ অতিথি ছিলেন জেলা প্রশাসক কার্যালয়ের (গোপনীয় শাখা ও জেএম শাখা) সহকারী কমিশনার পৃথীন্দ্র চাকমা, উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি) মো. তৌফিক আনোয়ার, আহম্মদাবাদ ইউপি চেয়ারম্যান মো. জাকির হোসেন পলাশ, নালুয়া চা-বাগানের ব্যবস্থাপক তারিফ আহমেদ, সহকারী ব্যবস্থাপক অরূপ চাকমা, সাব্বির আহমেদ, আব্দুর রউফ, আসফাক নাসের তৌকির, বাংলাদেশ চা-শ্রমিক ইউনিয়নের সম্পাদক নৃপেন পাল, সাবেক মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান খায়রুন আক্তার, সিলেট মহানগর হাসপাতালের পরিচালক মাসুদ আহমেদ, দেবদাস উরাং, কপিল উরাং, নটবর রুদ্রপাল, মাখন গোস্বামী, বিপন মুণ্ডা, গ্রাম আদালত প্রকল্পের মদন পাহান, মো. দুলু আহমেদ, শিক্ষক কমল ভৌমিজ, মতি তাঁতী, নূরজিৎ তাঁতীসহ ২ নম্বর আহম্মদাবাদ ইউনিয়নের সম্ভাব্য চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীরা।
রাতে এসএসসি পরীক্ষায় উত্তীর্ণ শিক্ষার্থীদের মাঝে সম্মাননা স্মারক প্রদান করা হয়। উৎসব শেষে ১৪ থেকে ১৫টি নৃত্যদলকে কারাম উৎসব উদযাপন কমিটি ও মহানগর হাসপাতালের পরিচালক মাসুদ আহমেদের পক্ষ থেকে পুরস্কৃত করা হয়। প্রথম স্থান অধিকারী দলকে ৫ হাজার, দ্বিতীয় স্থান অধিকারীকে সাড়ে ৪ হাজার, তৃতীয় স্থান অধিকারীকে ৪ হাজার এবং অংশগ্রহণকারী প্রতিটি দলকে ৩ হাজার টাকা করে পুরস্কার দেওয়া হয়। অনুষ্ঠানের সভাপতি স্থানীয় মেম্বার রতন মুণ্ডা উপস্থিত সকলকে ধন্যবাদ জানিয়ে অনুষ্ঠানের সমাপ্তি ঘোষণা করেন।