খুলনা

৪২ বছরেও পাকা ভবন হয়নি মাদ্রাসায়, মেঘ দেখলেই ছুটির ঘণ্টা বাজান দপ্তরি

যশোরের সীমান্তবর্তী উপজেলা শার্শা। এ উপজেলার ৬ নম্বর গোগা ইউনিয়নের পাঁচ ভুলাট গ্রামে অবস্থিত পাঁচ ভুলাট দাখিল মাদ্রাসা। মাদ্রাসাটি খুলনা বিভাগে দাখিল পরীক্ষার ফলাফলে অনন্য। কিন্তু এটি স্থাপিত হওয়ার ৪২ বছর পার হলেও আজ অবধি সরকারি কোনো ভবন পায়নি।

 

জানা যায়, মাদ্রাসার টিনশেড দুটি ঘরের টিনে জং ধরে হাজারো ছিদ্রের সৃষ্টি হয়েছে। দরজা-জানালা নেই বললেই চলে। বৃষ্টি হলে শ্রেণিকক্ষে পানি জমে। জরাজীর্ণ এসব ঘরে বছরের পর বছর ঝুঁকি নিয়ে ক্লাস করছে পাঁচ শতাধিক শিক্ষার্থী। আকাশে মেঘ দেখলেই শিক্ষার্থীদের বই-খাতা ও পোশাক ভিজে যাওয়ার ভয়ে ছুটির ঘণ্টা বাজিয়ে দেন দপ্তরি। তেমনি গ্রীষ্মকালে প্রচণ্ড গরমে অতিষ্ঠ হয়ে খুব ভোরেই ক্লাস নিতে হয় এখানে। চরম কষ্ট ও দুর্ভোগ নিয়ে লেখাপড়া করছে শিক্ষার্থীরা।

 

মাদ্রাসাটিতে ইবতেদায়ি (প্রথম শ্রেণি) থেকে দাখিল (দশম শ্রেণি) পর্যন্ত পড়ানো হয়। ১৯৮৪ সালে স্থাপিত হওয়ার পর প্রায় তিন যুগ আগে এটি এমপিওভুক্ত হয়। এই মাদ্রাসায় ২৬ জন শিক্ষক-কর্মচারী থাকার কথা থাকলেও আছেন মাত্র ১৯ জন। ইতিমধ্যে এনটিআরসিএ-তে (NTRCA) শিক্ষক নিয়োগের চাহিদাপত্র পাঠিয়েছে মাদ্রাসা পরিচালনা পর্ষদ। বর্তমানে ইবতেদায়ি ও দাখিল শাখা মিলিয়ে শিক্ষার্থী রয়েছে ৫৯২ জন। প্রতি বছর এখান থেকে দাখিল পরীক্ষায় শতভাগ শিক্ষার্থী পাস করে। এই মাদ্রাসা থেকে উত্তীর্ণ হয়ে অনেকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়সহ দেশের বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয় ও কলেজে অধ্যয়ন করছেন। অনেকে শিক্ষা জীবন শেষ করে কর্মজীবনেও সফল হয়েছেন।

2-2704

শিক্ষক ও শিক্ষার্থীরা জানান, ৪২ বছরেও মাদ্রাসার পাকা ভবন নির্মাণ হয়নি। ভবন নির্মাণের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরে কয়েকবার আবেদন করলেও কোনো ফল মেলেনি। কর্তৃপক্ষের উদাসীনতা ও স্থানীয় জনপ্রতিনিধিদের যথাযথ উদ্যোগের অভাবে প্রতিষ্ঠানের এই দশা। বর্তমানে এলাকায় জনসাধারণের চাঁদায় নির্মিত ছোট একটি হলুদ ভবন রয়েছে, যা শুধু দাপ্তরিক কাগজপত্র রাখার কাজে ব্যবহৃত হয়।

 

পাঁচ ভুলাট গ্রামের প্রবীণ শিক্ষানুরাগী আব্দুল মজিদ সর্দার জানান, ভবন না থাকায় এখানে দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষা ব্যবস্থা ব্যাহত হচ্ছে। সপ্তম শ্রেণির ছাত্র মারুফ হাসান ও অষ্টম শ্রেণির ছাত্রী তাসলিমা খাতুন জানায়, ভাঙাচোরা জরাজীর্ণ টিনশেড ঘরে ক্লাস করতে তাদের অনেক কষ্ট হয়। গরমে অনেক শিক্ষার্থী অসুস্থ হয়ে পড়ার ঘটনাও ঘটেছে। তারা জরুরি ভিত্তিতে একটি পাকা ভবন নির্মাণের দাবি জানায়।

 

দাখিল পরীক্ষার্থী জাহাঙ্গীর হোসেন ও হাসনাইন জানান, ঘরগুলোর বেড়া ও জানালা নেই। টিনের চাল ফুটো হয়ে যাওয়ায় বৃষ্টিতে সব ভিজে যায়। যে কোনো সময় ঘরগুলো ভেঙে পড়ার আতঙ্কে থাকতে হয় তাদের।

 

মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট মো. আইয়ুব আলী জানান, ১৯ জন শিক্ষক-কর্মচারীকে একটি ছোট কক্ষে গাদাগাদি করে বসতে হয়। অনেকে বারান্দায় বিছানা পেতে বসেন। আকাশে মেঘ দেখলেই নিরাপত্তার স্বার্থে মাদ্রাসা ছুটি দিতে হয়। এতে পাঠদান ও দাপ্তরিক কার্যক্রম মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নতুন ভবনের জন্য সংসদ সদস্য ও শিক্ষা দপ্তরে আবেদন করা হয়েছে। শ্রেণিকক্ষ সংকটের কারণে অভিভাবকরা এখন সন্তানদের এখানে ভর্তি করাতে চান না।

 

শার্শা উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা অফিসের একাডেমিক সুপারভাইজার এম নূরুজ্জামান বলেন, উপজেলার প্রতিটি মাদ্রাসায় পর্যায়ক্রমে পাকা ভবন হবে। বর্তমানে মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের নতুন ভবন নির্মাণের তালিকা চাওয়া হয়েছে। মাদ্রাসা শিক্ষা অধিদপ্তর থেকে নতুন ভবনের ঘোষণা এলে ওই মাদ্রাসার বিষয়টি বিবেচনা করা হবে।

 

উপজেলা মাধ্যমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এস. এম. সুলতান মাহমুদ জানান, মাদ্রাসাটির টিনশেড ঘরটি বর্তমানে ব্যবহার উপযোগী নয়। আমরা বিষয়টি অবগত আছি এবং প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার চেষ্টা করছি।



সম্পর্কিত খবর