রাজশাহী

আত্রাইয়ের গ্রামে গ্রামে শোকের মাতম

সৌদি আরবের রিয়াদের খোরদাহ শহরের একটি সোফা কারখানায় আগুনে ১৬ জন নিহতের মধ্যে নওগাঁর আত্রাই উপজেলার বাসিন্দা রয়েছেন ১১ জন। রবিবার বিকেলে এ ঘটনার পর সন্ধ্যায় খবর ছড়িয়ে পড়লে উপজেলার গ্রামে গ্রামে শুরু হয় শোকের মাতম। একসঙ্গে এতগুলো প্রাণ ঝরে যাওয়ায় শোকে স্তব্ধ হয়ে পড়েছে পুরো উপজেলা। ঘটনার খবর পেয়ে রাত থেকেই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা বাড়ি বাড়ি গিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি স্বজনদের খোঁজখবর নিচ্ছেন।

নিহত ব্যক্তিরা হলেন—আত্রাই উপজেলার গণ্ডগোহালী গ্রামের গাফ্ফার প্রামাণিকের দুই ছেলে মোহন ও সুমন, একই গ্রামের সাইদুর রহমানের ছেলে রুবেল ও বজলুর রহমানের ছেলে কলিমউদ্দীন, ডুবাই গ্রামের বাদল তালুকداران ছেলে সোহেল রানা ওরফে সুমন, একই গ্রামের চঞ্চলের ছেলে হাসিবুল হাসান শুভ, মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের আক্কাস প্রামাণিকের ছেলে মিনহাজ প্রামাণিক, পারকাসুন্দা গ্রামের তমেজ সরদারের ছেলে জলিল সরদার, মাধবপুর গ্রামের মজনু সরদারের ছেলে মজিদুল সরদার সজীব, উদনপৈ গ্রামের ময়েন উদ্দীনের ছেলে ফরিদ উদ্দীন এবং সাধনগর গ্রামের আজাহার আলীর ছেলে সাগর আলী। এর আগে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আত্রাইয়ের মোট ১৩ জন নিহতের খবর জানালেও পরে নাম-ঠিকানা যাচাই শেষে ১১ জন নিহতের বিষয় নিশ্চিত করেন।

সোমবার সরেজমিনে গণ্ডগোহালী গ্রামে গিয়ে দেখা যায়, এই গ্রামের মোট চারজন নিহত হয়েছেন। বিভিন্ন এলাকা থেকে আশপাশের মানুষ ও নিহতদের স্বজনেরা ছুটে এসে পরিবারের লোকজনকে সান্ত্বনা দিচ্ছেন। সেখানে বারবার নিহতদের বাবা-মা ও স্বজনেরা কান্নায় ভেঙে পড়ে বিলাপ করছেন।

নিহত রুবেলের বাবা সাইদুর রহমান জানান, রুবেল মাত্র কয়েক মাস আগেই ছুটি শেষে সৌদি আরব ফিরে যান। এর মধ্যে মাত্র ১৪ দিন আগে আয়েশা জান্নাতি নামে তাঁর এক কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। রুবেল তাঁর একমাত্র মেয়েকে শুধু মোবাইলেই দেখেছেন। মেয়েকে বারবার বুকে জড়াতে বাড়ি আসার কথা বলছিলেন। কিছুদিনের মধ্যেই তাঁর বাড়ি আসার কথা ছিল। কিন্তু এরই মধ্যে ছেলেটা চলে গেল; মেয়েকে আর বুকে জড়াতে পারল না।

নিহত মোহন ও সুমনের বাবা গাফ্ফার প্রামাণিক বলেন, "যখন কারখানায় আগুন ধরেছে, তখন ছেলেরা শেষবারের মতো আমাদের সঙ্গে কথা বলতে বারবার ইমো ও হোয়াটসঅ্যাপে ফোন করেছিল। কিন্তু আমাদের এখানে বিদ্যুৎ না থাকায় নেট পাওয়া যায়নি, ফলে সরাসরি কথা হয়নি। তবে ভয়েস মেসেজে তারা আকুতি করে বলেছে—তোমরা আমাদের জন্য দোয়া কোরো, তোমাদের সঙ্গে হয়তো আর কথা হবে না। কারখানায় আগুন ধরেছে, দরজা খোলা যাচ্ছে না; হয়তো আমরা সবাই মারা যাব।" এ কথা বলেই কান্নায় জ্ঞান হারিয়ে ফেলেন বাবা গাফ্ফার।

তিনি আরও বলেন, "আমি আর আমার ছোট ছেলে শারীরিক প্রতিবন্ধী। মোহন আর সুমনের আয়ের ওপর নির্ভর করেই আমাদের সংসার চলত। সংসারে সচ্ছলতা ফেরাতে আট বছর আগে বড় ছেলে মোহনকে সৌদি পাঠিয়েছিলাম। এরপর সুমনকে দুই বছর আগে মোহনের কাছে পাঠাই। তারা বলেছিল গ্রামে নতুন বাড়ি নির্মাণ করতে; বাড়ির কাজ শেষ হলে দুই ভাই একসঙ্গে এসে বিয়ে করবে। সেই লক্ষ্যে গত বুধবার বাড়ি নির্মাণের ভিত্তি স্থাপন করে কাজ শুরু করা হয়। কিন্তু রবিবার সন্ধ্যায় এক খবরে যেন সব স্বপ্ন শেষ হয়ে গেল।"

মধ্যবোয়ালিয়া গ্রামের নিহত মিনহাজের মা পারুল বিবি বলেন, "আট বছর আগে ছেলেকে বিদেশে পাঠাই। সেখানে যাওয়ার পর সড়ক দুর্ঘটনায় পা ভেঙে যায়, ফলে দীর্ঘদিন কাজ করতে পারেনি। কিছুদিন হলো কাজ করা শুরু করেছিল। এরই মধ্যে সব স্বপ্ন পুড়ে ছাই হয়ে গেল।"

ডুবাই গ্রামের নিহত সোহেল রানা ওরফে সুমনের বোন সুবর্ণা আক্তার বলেন, "আমরা এক ভাই, এক বোন। বাবার শেষ সম্বল দেড় বিঘা জমি এবং মায়ের শখের গয়না বিক্রি করে ভাইকে বিদেশে পাঠানো হয়েছে। এর কিছুদিন পরই বাবা মারা যান। দেড় বছর আগে ভাই বিদেশ থেকে এসে বিয়ে করেন। বর্তমানে তাঁর আট মাসের একটি পুত্রসন্তান রয়েছে। এখন কীভাবে সংসার চলবে আর এই সংসার কে দেখাশোনা করবে, তা নিয়ে চরম হতাশায় পড়েছি।"

নিহতদের স্বজনেরা দ্রুত সন্তানদের মরদেহ দেশে ফিরিয়ে আনতে সরকারের কাছে আকুল আবেদন জানিয়েছেন।

আত্রাই উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মনিরুজ্জামান ১১ জন নিহতের খবর নিশ্চিত করে বলেন, "খবর পাওয়ার পরপরই রাত থেকে বাড়ি বাড়ি গিয়ে সান্ত্বনা দেওয়ার পাশাপাশি খোঁজখবর নেওয়া হচ্ছে। আপাতত জেলা ও উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিহতদের প্রতিটি পরিবারকে ২০ হাজার টাকা করে দেওয়া হবে। এ ছাড়া সরকারিভাবে প্রতিটি পরিবারকে আরও ৩ লাখ টাকা করে দেওয়ার চেষ্টা চলছে।"

তিনি আরও জানান, নিহতদের মরদেহ দ্রুত দেশে ফিরিয়ে আনতে এবং অন্যান্য প্রয়োজনে সার্বিক সহযোগিতা করার চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন।

 


সম্পর্কিত খবর