মাদকের বিরুদ্ধে সরকারের 'জিরো টলারেন্স' নীতি থাকা সত্ত্বেও প্রশাসনের নজরদারির অভাবে কক্সবাজার শহরের নুনিয়াছড়া এলাকা এখন ইয়াবার ডিপোতে পরিণত হয়েছে বলে অভিযোগ করেছে সচেতন মহল। নুনিয়াছড়া ঘাট, ৬ নং ঘাট, মাঝের ঘাট ও চৌফলদন্ডী ঘাটকে ব্যবহার করে সাগর পথে নিয়মিত মাদক পাচার হচ্ছে। স্থানীয়দের দাবি, এই পাচারের মূল মাধ্যম হিসেবে ব্যবহৃত হচ্ছে পর্যটকবাহী জাহাজ, যা সরাসরি সেন্টমার্টিন থেকে কোনো ধরনের চেকপোস্ট ছাড়াই শহরে প্রবেশ করছে।
২০২০ সালের ৩০ জানুয়ারি কক্সবাজার শহর থেকে সেন্টমার্টিন রুটে সরাসরি জাহাজ চলাচল শুরু হওয়ার পর থেকেই এই পথে মাদক পাচারের ঝুঁকি তৈরি হয়। এর এক বছর পর, ২০২১ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি, কক্সবাজারের গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) এক অভিযানে একযোগে ১৪ লাখ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট এবং ১ কোটি ৭০ লাখ ৬৮ হাজার ৫০০ টাকা উদ্ধার করে, যা ছিল এযাবৎকালের সবচেয়ে বড় চালান।
এ ঘটনার পর স্থানীয় সচেতন মহল জাহাজ চলাচলের পথে নজরদারি বাড়ানোর দাবি জানায়। নুনিয়ারছড়ার বাসিন্দা ও তৎকালীন জেলা ছাত্রলীগের সিনিয়র সহসভাপতি মঈন উদ্দীন ফেসবুকে লেখেন, টেকনাফ থেকে সড়কপথে অনেক চেকপোস্ট থাকলেও 'কর্ণফুলী' জাহাজে সেন্টমার্টিন হয়ে কক্সবাজার শহরে ঢুকতে কোনো চেকপোস্ট নেই, তাই এই জাহাজে তল্লাশি চেকপোস্ট বসানো হোক। জাহাজ কর্তৃপক্ষও প্রশাসনকে সার্বিক সহযোগিতার আশ্বাস দেয়। তবে অনেকের অভিযোগ রয়েছে যে, পরবর্তীতে জাহাজের একজন পরিচালক ও মঈন উদ্দীন যৌথভাবে ইয়াবা ব্যবসার সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়েন।
পরিবেশবাদী ও স্থানীয় নাগরিক সমাজের পক্ষ থেকে দাবি করা হয়েছে, সেন্টমার্টিন ও কক্সবাজার বিআইডব্লিউটিএ জেটিতে সিসিটিভি ক্যামেরা স্থাপন এবং জাহাজে লাগেজ স্ক্যানার মেশিনসহ যাত্রী ওঠানামায় কোস্টগার্ড ও পুলিশের যৌথ চেকপোস্ট বসানো হোক।
এলাকাবাসী উত্তর নুনিয়াছড়াসহ পুরো নুনিয়াছড়াকেই ইয়াবার ডিপো হিসেবে আখ্যায়িত করেছেন। ইয়াবা কারবারী আমেনার ঘর ভাঙচুর করলেও স্থানীয়দের অভিযোগ, এর আড়ালে গডফাদাররা জড়িত ছিল এবং তারা নিজেদের আড়াল করতেই এই ঘটনা ঘটায়। ইয়াবার ছোট কারবারিরা (চুনোপুঁটি) ধরা পড়লেও মূল হোতারা এখনো অধরা বলে দাবি করেছেন তাঁরা। স্থানীয়রা নুনিয়াছড়া ও চৌফলদন্ডী ঘাটকে বিশেষ নজরদারিতে আনার আবেদন জানিয়েছেন।
ইয়াবা নির্মূলে জেলা প্রশাসন গত ১৪ জুলাই ২০২৫ তারিখে একটি টাস্ক ফোর্স গঠন করেছে। টাস্ক ফোর্স গঠনের পর থেকে ২৭ অক্টোবর ২০২৫ তারিখ পর্যন্ত সাড়ে তিন মাসে ৭৬ লাখ ৭৮ হাজার ১১২ পিস ইয়াবা ট্যাবলেট, ৮৭ কেজি ৭২৯ গ্রাম গাঁজা, ১ কেজি ৬০৪ গ্রাম ক্রিস্টাল মেথ আইসসহ বিভিন্ন মাদক উদ্ধার করা হয়েছে। এই সময়ে ৯২৫ জন মাদক কারবারিকে আটক করে ৬৬৯টি মামলা রুজু করা হয়।
টাস্ক ফোর্সের মাধ্যমে সর্বোচ্চ তৎপরতা দেখিয়েছে জেলা পুলিশ। জেলা পুলিশ ৩৬৯ জন ইয়াবা কারবারী আটক ও ২৭৪টি মামলা রুজু করেছে। জেলা পুলিশ সুপার মোঃ সাইফ উদ্দিন শাহীন বলেন, "মাদকের ব্যাপারে জেলা পুলিশ সর্বদা 'জিরো টলারেন্স' নীতি নিয়ে কাজ করে আসছে। অভিযুক্ত এলাকাগুলোর ওপর নজরদারি বাড়ানো হচ্ছে এবং সকল মাদক কারবারিকে আইনের আওতায় আনা হবে।"
কোস্ট গার্ড চট্টগ্রাম পূর্ব জোনের মিডিয়া কর্মকর্তা লেফটেন্যান্ট শাকিব মেহবুব জানান, কোস্ট গার্ড নাফ নদী সীমান্ত এলাকাসহ সমুদ্র পথে অবৈধ অনুপ্রবেশ, মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান রোধে সর্বোচ্চ সতর্ক অবস্থানে রয়েছে এবং সেন্টমার্টিনে জেটি ঘাটসহ সকল অঞ্চলে গোয়েন্দা নজরদারি ও টহল চলমান আছে।
ট্যুরিস্ট পুলিশ কক্সবাজার রিজিয়নের অতিরিক্ত ডিআইজি মোঃ আপেল মাহমুদ জানিয়েছেন, আগামী ১ নভেম্বর থেকে পর্যটন কেন্দ্রে মাদক নির্মূলে জাহাজেও ট্যুরিস্ট পুলিশ দায়িত্বে থাকবে।
অন্যদিকে, স্থানীয় ১নং ওয়ার্ড কাউন্সিলর মিজানুর রহমান মিজানের বিরুদ্ধে দীর্ঘদিন ধরে ইয়াবা কারবার ও কারবারিদের কাছ থেকে নিয়মিত টাকা নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। যদিও তিনি প্রকাশ্যে ইয়াবার বিরুদ্ধে অবস্থান নেন, কিন্তু এ যাবৎ একজন মাদক কারবারিকে ধরিয়ে দিতে পারেননি বলে অভিযোগ এলাকাবাসীর।