গর্জ্জন অনুপাতে বর্ষণ হয়না এমন একটি প্রবচনের সাথে আমরা পরিচিত আছি। শুধু প্রবচনে নয় বাস্তবেও তার দেখা মিলে। গাঢ় অন্দকারে আচ্চন্ন মেঘের ঘনঘটা ,বিজলী চমক সহ দেয়াডাকে মনে হবে যে বৃষ্টির অঝোর ধারাতে দশদিগন্ত সয়লাব হয়ে যাবে। কিন্তু বাতাসের গতিবেগে মেঘ অনেক সময় উড়ে যায়।কিংবা মুষল ধারে বৃষ্টির বদলা ছিটেফোটা বৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের রাজনৈতিক পরিমন্ডলে ইদৃশ আলামত মাঝেমধ্যে স্পস্ট হয়ে উঠে বৈকি।
বাংলাদেশের ভোট ব্যবস্থাকে উপলক্ষ করে আমেরিকার ভিসানীতির প্রয়োগকে এতদ্দেশীয় আকাশচারী মহল এটিকে মহাস্ত্র গণ্যকরে ডুগডুগি বাজাতে শুরু করেছিলেন। যেন কাঙ্খখিত দেবদূত ধরাধামে উপস্তিত হয়ে আরাধ্য সবকিছুকে গুছিয়ে দেবেন। অচলকে টেনে হিচড়ে সচল করে দিবেন।কিন্তু পর্বতের মুষিক প্রসব বলেও একটি কথা আছে। আমেরিকান ভিসানীতির প্রয়োগ হলে ১৮ কোটি মানুষের মধ্যে বড়জোর হাজার দেড়েক মানুষ এই ভিসা খড়গের আওতায় আসতে পারে।তাই আশাহতরা এখন হয়তো জবরদস্ত নীতির অপেক্ষায় আছেন। তাতে মহাভারতের কতপৃস্টা অশুদ্ধ হবে তাতো বলা যাচছে না।
আমাদের দেশে একসময় একটি চুটকি শুনতাম - মস্কোতে বৃষ্টি হলে এদেশে একটি মহল ছাতি টাঙাতেন। অনুরূপ আমেরিকাতে গরম পড়লে এদেশের একটি পক্ষ পাখা হাতে নিয়ে গায়ে বাতাস দিতেন। হ্যা,রাজনৈতিক দল বা রাজনীতির ইন্টারন্যাশনাল কানেকশন থাকতেই পারে। কিন্তু এই কানেকশনের সুবাদে দেশে ক্ষমতার ওলট পালট যে নিশ্চিত হবে সেদিন বোধহয় বাসি হয়েছে বেশ আগেই। বাতাসে চাউর হয়েছে যে বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকার নানান কারণে আমেরিকার বিরাগভাজন হওয়াতে সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করার বিভিন্ন কৌশল অবলম্বন করছে আমেরিকা। এ কারণেই নাকি ভিসানীতির প্রয়োগ। বাতাসে কানপাতলেই শোনা যায়,আরো নাকি হাতিয়ার আছে যার প্রয়োগ নাকি আগামীতে হবে। তারপর নাকি বিএনপিকে ক্ষমতায় টেনে আনা হবে। তাই দলটির নেতা কর্মীরা কোন সময় এ সরকারের পতন ঘটবে সে দিনক্ষণের অপেক্ষায় আছেন। কিন্তু এটি নিঝুঁম রজনীর খোয়াব না দিবাসস্বপ্ন তা নিয়ে বোদ্ধা মহলে খটকা আছে অবশ্যই। যাহা আরাধ্য নহে তাহা কি সাধনাতে সম্ভব? বিএনপি যদি আমেরিকার একান্ত বান্দবই হয়ে থাকে তাহলে তাদের বিরুদ্ধে দায়ের কৃত মামলায় এফ বি আই সাক্ষ্য দিতে কেনো আসে? তারেক রহমানকে কেনোই বা ভিসা দেয়নি? মার্কিন মুরব্বীদের নিকট বিএনপির বিশৃস্ততা বহু আগেই পরীক্ষিত হয়ে গেছে। বিষয়টিকে খোলাসা করতে হলে ফিরে তাকাতে হবে অতীতের দিকে।
২০০১ সনের জাতীয় সংসদ নির্বাচনটি ছিলো বাংলাদেশের জন্য টার্নিং পয়েন্ট এবং নানা কারণে স্মরণীয়। এই নির্বাচনে প্রধান ইস্যু হয়ে উঠেছিল বাংলাদেশের গ্যাস। যে কারণে আমেরিকার তৎকালীন প্রেসিডেন্ট গ্যাস কব্জার লক্ষে ছুটে এসেছিলেন ঢাকায়। কিন্তু তৎকালীন প্রপ্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গ্যাস রফতানির ব্যাপারে অসম্মতি জানালে ক্ষুব্ধ মনোরথ নিয়ে ছুটে গিয়েছিলেন দিল্লীতে। গ্যাস নিয়ে ভারত এবং আমেরিকা একাট্টা হবার পর ডাক পড়েছিল বিএনপির। বিএনপি তখন বলেছিল, ক্ষমতায় যেতে পারলে তারা গ্যাস রফতানি করবে। সাইফুর রহমান বলেছিলেন -মাটির নীচের সম্পদ রেখে কি লাভ? তার চেয়ে বিক্রি করাই বেহতর। বিএনপির এই কমিটমেন্টে তত্তাবধায়ক সরকার কোন রং ধরেছিল সেটি বোদ্ধা মহলের অবগতিতে আছে। এ জন্য তত্তাবধায়ক সরকারকে ভারবাহী অনুগত সরকারের সাথে তূলনা করা হয়। যাই হোক, ত্রহ্যস্পর্শে এবং নানাবিধ ক্যারিশমায় নির্বাচনে এমন রং ধরেছিল যে ভূমিকম্প বিজয়ের মাধ্যমে বিএনপি জোট ক্ষমতায় এসেছিল। কিন্তু ক্ষমতাসীন হবার পর জোট সরকার কি তার পূর্ব প্রতিশ্রæতি রেখেছিল? গ্যাস রফতানিকে ভিন্ন খাতে বাহিত করার জন্য শুরু হয় নতুন খেলা। খেলার নেপথ্য কারিগর কারা ছিলেন সেটি বোধগম্যতার বাইরে ছিলো না।
বাংলাদেশের তেল গ্যাস রক্ষা কমিটী নামে গড়ে উঠেছিল একটি সংগঠন। কথিত বামরা ছিল তার খলোয়ার। গ্যাস রফতানির বিরুদ্ধে শুরু হয়েছিল লং মার্চ। ঢাকা থেকে হবিগঞ্জের বিবিয়ানা অভিমুখে লংমার্চ কালে মাধবপুর থেকে বিবিয়ানা পর্যন্ত রিপোর্টের দায়িত্ব বর্তেছিল আমার উপর। মাধবপুর এবং শায়েস্তাগঞ্জে লং মার্চে অংশগ্রহনকারীদের রাতের খাবার ও থাকার বন্দোবস্ত নিয়ে সংশ্লিষ্ট টিএনও এবং ওসির দৌড়ঝাপ দেখে মনেমনে কিছুটা কৌতুহল জেগেছিল। বিষয় কি? এ প্রশ্নের বায়বীয় জবাব পেয়েছিলাম মৌলভীবাজারে। তেল গ্যাস রক্ষাকমিটীর এক পথ সভা চলছিল কুসুম বাগ এলাকায়। সভা চলাকালে মৌলভীবাজারের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার হন্তদন্ত হয়ে আমার নিকট জানতে চেয়েছিলেন -মঞ্জুরুল আহসান খান কোন জন? আমি ইশারায় দেখিয়ে দিলে তিনি প্রশ্ন করেছিলেম -ঐ মোটা লোকটি নাকি? বলেছিলাম, চিনতে পেরেছেন। এসপি তার নিকট গিয়ে কানে কানে গিয়ে কিছু বলার পর খান সাহেব উঠে গেলেন। এসপি তাকে নিয়ে উঠে গেলেন নিকটবর্তি বাবলী বোর্ডিং এ। দশ মিনিট পরে নেমে আাসলে আমি এসপি সাহেবের পিছু ধরলে তিনি বলেছিলেন উপর মহলের কল। মান্নান স্যার কথা বলবেন। প্রশ্ন করেছিলাম -মেজর মান্নান না ভূইয়া মান্নান? এসপি সাহেব বিরক্তিসহকারে বলেছিলন -এতোকিছু জানার কি প্রয়োজন, শেষের জন। আর আগাতে পারিনি। মনে মনে ভেবেছিলাম , বাম রাজনীতির অটুট বন্ধন তলে তলে বহাল থাকে। তেল গ্যাস রক্ষা কমিটীর আন্দোলন মোটামুটি জমে উঠেছিল। জুজুর ভয় দেখিয়ে জোট সরকার গ্যাস রফতানির কমিটমেন্ট থেকে সটকে পড়েছিল। আমেরিকার পক্ষে এই কূট কৌশল বুঝতে কি কোনো অসুবিধা হয়েছিল? এমতাবস্তায় বিএনপি এবং জামায়াতকে আমেরিকা সমর্থন দেবে সেটি কোনো মাপ জুকে মিলার কথা নয়। আমেরিকা যাকে অবিশ^াস করে তাকে অতি সহজে কাছে টানে না।
আাসন্ন সংসদ নির্বচন কে কেন্দ্র করে আমেরিকার মাতব্বরি মনোভাব প্রচ্ছন্ন হলেও তার নেপথ্য রহস্য কোাথায় নিহিত তা হয়তো একসময় বেরিয়ে আসবে। বিতর্কিত মার্কিন কূটনীতিক পিটার হাসের দৌড়ঝাপ দেখে বিএনপির নেতাকর্মীরা যে লাফালাফি এবং গড্ডালিকা প্রবাহে মেতে উঠেছিলেন, হাসের অবস্তান ত্যাগের পর তারা এখন কি বলবেন? অবস্তা বিবেচনায় মনে হচ্ছে বিদেশীদের প্রেস ক্রিপশনের ধার না ধেরে নির্বাচন তার নিজস্ব গতিতেই অনুষ্ঠিত হবে।
বিএনপি ও তার সহযোগী রাজনৈতিক জোট নির্বাচনে.অংশগ্রহণ করবে কিনা সেটি তাদের নীতিনির্ধারকদের পলিসির ব্যাপার। তবে জয় নিশ্চিত হলে নির্বাচন করব নচেথ নির্বচন বর্জ্জন এ নীতিটা আত্মহননের সমান। একটি গণমুখী রাজনৈতিক দলের প্রাণ স্পন্দন অনভূত হয় নির্বাচনের মাধ্যমে। নির্বাচনতো হারজিতের খলা। যে দলটি পরাজিত হয় সেই দলটিও পরাজয়ের মধ্যে প্রাণশক্তি খুঁজে পায়। এই শক্তি বলেই আবার সম্মুখ পানে আগায় । তার কিঞ্চিত উদাহরণ টানতে হয়। ১৯৭৫সনের তুফানে আওয়ামী লীগ সাংগঠনিকভাবে লন্ডভন্ড হয়ে পড়েছিল। সাংগঠনিক কাঠামো খাড়া করার পর দলে আসলো পরিকল্পিত ভাংগন। মিজান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত হল পৃথক আওয়ামীগ। এই ত্রিশঙকু অবস্তায় আসলো ৭৯ সনের সংসদ নির্বাচন। তখন দলটি নির্বাচনে অংশ নেবে কি না তানিয়ে শুরু হল ধূম্রজাল।. সামরিক আাইন বহাল রেখে নির্বাচনে যেতে একটি পক্ষ আপত্তি আনলো। কিন্তু নীতি নিরধারক মহল রাতদিন বৈঠক করে নির্বাচনে অংশগ্রহনের সিদ্ধান্ত নিলো। তার আগেই দলীয় সভাপতি মালেক উকিল বলেছিলেন ‘ নাথিন উইল গো আনচেলেণ্জড’। সেই নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ৩৯ টি আসন লাভ করেছিল এবং বাকী সবকটি আসনে চরম প্রতিদ্বদিতা করে হেরে গিয়েছিল। বলা বাহুল্য, সেই নির্বাচবটি ছিল আওয়ামী লীগের অস্তিতৃের লড়াই। বাকী ইতিহাসতো সবার নখ দর্পনে। পরবর্তী নির্বাচন সমূহে আসনবৃদ্ধি ঘটতে ঘটতেই ক্ষমতারোহন। অবশ্য আওয়ামী লীগ ও বিএনপির মধ্যে কাঠামোগত তারতম্য আছে। আওয়ামী লীগ গঠিত হয়েছিল জনআর্তি এবং সময়ের চাহিদাকে বুকে ধারণ করে। নিয়মতান্ত্রিক আন্দোলন ও সংগ্রাম ছিলো দলটির আদর্শিক.হাতিয়ার। অন্যদিকে বি এন পি সৃষ্টি হয়েছে ক্ষমতার রসে সিক্ত হয়ে। এখানে সুবিধাভোগী দলছুট এবং রাজনৈতিকভাবে পরাজিতদের সমাহার ঘটেছে। ক্ষমতাচ্যুতির ১৭ বছরে তারা কি জায়গায় আছে? সময় আচ করে অনেকেই সটকে পড়েছে। যারা থিতু আছে তাদের নিকট বিকল্প কোন গন্তব্য নেই। তাদের দিয়ে জনবিস্ফোরণ ঘটানো আর ল্যাংরার পর্বতারোহণ সমান কথা। ধাতে যাহা নাই হাতে তাহা আসবে কিভাবে? আন্দোলনের মানে যদি হয় ভাংচুর গাড়ী পুড়ানো ট্রেনে আগুন ধরানো মানুষ পুড়ানো ও গাছ কাটা হয়, তাহলে রাজনৈতিক অভিধানকে পাল্টাতে হবে। যে আন্দোলনে জনসম্পৃক্ততা নেই বরং আছে ভাড়াটে দুর্বৃত্তদের যোগসাজস সেই কথিত আন্দোলনের খেসারত কোননা কোন ভাবেই দিতে হবে।
তবে হ্যা,বিএনপি আন্দোলনের পার্টি না হলেও ভোটের জন্য শক্ত পার্টি এ কথা নিঃসন্দেহে বলা যায়। এ দেশের এন্টি আওয়ামী তথা ভ্রান্ত বাম এবং ডানপন্থী সহ সৃাধীনতা বিরোধীদের নির্দিস্ট জায়গা হচ্চে বিএনপি। সবটির যোগ সাধনে ভোটের মাঠে দলটি শক্তিশালী।এমতাবস্তায় ভোট বর্জন দলটির জন্য আত্মঘাতের সমান।বর্জ্জন করে কতটুকু অর্জ্জন হয়েছে সে হিসাব মিলিয়ে দেখার কি কেউ আছে? বর্জ্জনের ধারাবাহিকতায় দলীয় স্টেকহোল্ডার দের বড় একটি অংশ দলত্যাগ করে ভিন্নপথ ধরেছে। দলীয় ক্ষয় রোগ কি তবে দলটিকে অস্তিত্ব হীন করে দেবে অনভিজ্ঞ কান্ডারীর কান্ডজ্ঞানহীন জেদের কারণে?
লেখক: সাংবাদিক ও কলামিস্ট