চলনবিল বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলের বৃহত্তম অভ্যন্তরীণ জলাভূমি বাস্তুতন্ত্র এবং দেশের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ হাইড্রোলজিক্যাল ও পরিবেশগত ভূদৃশ্য। ছয়টি জেলা জুড়ে বিস্তৃত এবং ৪৭টি নদী ও পানিপথের সঙ্গে সংযুক্ত এই জলাভূমি ঐতিহাসিকভাবে একটি গতিশীল বন্যাপ্লাবিত সমভূমি ব্যবস্থা হিসেবে মৎস্যসম্পদ, কৃষি, জীববৈচিত্র্য, নৌপরিবহন এবং লাখ লাখ মানুষের জীবিকা ধারণ করে আসছে।
কিন্তু গত কয়েক দশক ধরে পলি জমা, হাইড্রোলজিক্যাল বিভক্তি, অপরিকল্পিত বাঁধ নির্মাণ, অবকাঠামোগত উন্নয়ন, জলাভূমি দখল এবং অতিরিক্ত ভূগর্ভস্থ পানি উত্তোলনের ফলে এই বাস্তুতন্ত্র মারাত্মক অবক্ষয়ের শিকার হয়েছে। নদী-বিলের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ায় জলাবদ্ধতা, মৎস্যসম্পদের হ্রাস, জীববৈচিত্র্য অবক্ষয় এবং জলবায়ু ঝুঁকি বাড়ছে। মৌসুমি বন্যা ও শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকট এখন এ অঞ্চলের পরিবেশগত স্থায়িত্ব ও আর্থসামাজিক সহনশীলতা—উভয়কেই হুমকির মুখে ফেলেছে।
এই চ্যালেঞ্জগুলোর প্রেক্ষিতে চলনবিল পুনরুদ্ধার উদ্যোগ গ্রহণ করা হয়েছে। এটি একটি সমন্বিত, জলবায়ু-সহনশীল পুনরুদ্ধার ও ব্যবস্থাপনা অবকাঠামোগত প্রণয়নের লক্ষ্যে পরিচালিত হচ্ছে। প্রকল্পটির উদ্দেশ্য হলো হাইড্রোলজিক্যাল কার্যকারিতা পুনরুদ্ধার করা, বাস্তুতন্ত্রের সেবা শক্তিশালী করা, পানি নিরাপত্তা উন্নত করা এবং বাংলাদেশ ডেল্টা প্ল্যান ২১০০ ও জাতীয় জলবায়ু অভিযোজন অগ্রাধিকারের সঙ্গে সংগতিপূর্ণ টেকসই ও প্রকৃতিভিত্তিক অবকাঠামোর মাধ্যমে জীবিকার উন্নয়ন ঘটানো।
চলনবিল পুনরুদ্ধারের লক্ষ্যে এই এলাকার ভূমি ও পানি সম্পদের সমন্বিত ব্যবস্থাপনা ও জীবনযাত্রার মানের সম্ভাব্যতা যাচাই সমীক্ষা উপলক্ষে বৃহস্পতিবার নওগাঁর রাণীনগর উপজেলায় দিনব্যাপী মতবিনিময় সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বাংলাদেশ হাওর ও জলাভূমি উন্নয়ন অধিদপ্তর, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সমীক্ষা যাচাই প্রকল্পটি বাস্তবায়ন করছে। এছাড়া সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্টাল অ্যান্ড জিওগ্রাফিক ইনফরমেশন সার্ভিসেস (সিইজিআইএস) পাবলিক ট্রাস্ট, পানিসম্পদ মন্ত্রণালয় সমীক্ষা সম্পাদন করছে।
এদিন উপজেলা পরিষদ সভাকক্ষে মতবিনিময় সভায় উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসানের সভাপতিত্বে প্রকল্প সম্পর্কে বিস্তারিত তুলে ধরেন সঞ্জীব শাওন সরকার। এ সময় চলনবিলকে বাঁচাতে এর সঙ্গে যুক্ত নওগাঁর রাণীনগর উপজেলার রক্তদহ বিল, আত্রাই উপজেলার একাধিক নদী ও বিল পুনর্খননের নানা প্রস্তাব তুলে ধরা হয়। এছাড়া চলনবিলকে বাঁচাতে কতগুলো নদীর অবৈধ দখল উচ্ছেদ করতে হবে এবং এর আশেপাশের কোন জেলার কী পরিমাণ নদী, বিল ও অন্যান্য জলাভূমি পুনর্খনন করতে হবে, সেই তথ্যও তুলে ধরা হয়। চলনবিল রক্ষায় গৃহীত পদক্ষেপগুলো সঠিকভাবে বাস্তবায়ন করলে অত্র অঞ্চলের পরিবেশগত পরিবর্তন এবং সাধারণ মানুষ কতটুকু উপকৃত হতে পারবেন, সে বিষয়েও প্রামাণ্যচিত্র প্রদর্শন করা হয়।
সভায় প্রকল্প পরিচালক তানভিরুল হক ও প্রকল্প লিডার তানভির আহমেদ প্রকল্প সম্পর্কে আলোচনা করেন। এ সময় চলনবিল রক্ষায় করণীয় বিষয়ে নিজেদের মতামত তুলে ধরেন উপজেলা প্রশাসনের বিভিন্ন দপ্তরের কর্মকর্তা, গণমাধ্যমকর্মী, জনপ্রতিনিধি, রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দ, মৎস্যচাষী, মৎস্যজীবী ও বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার ব্যক্তিবর্গ।
সভার সভাপতি রাণীনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মো. রাকিবুল হাসান বলেন, চলনবিলের অন্যতম একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হচ্ছে উপজেলার রক্তদহ বিল। এই বিলটি পুনর্খনন করা গেলে দুই শতাধিক একর একফসলি জমি তিন ফসলি জমিতে পরিণত হবে। রক্তদহ বিলের চারপাশের প্রায় ২৩টি গ্রামের মানুষের জীবিকায় আমূল পরিবর্তন আসবে এবং পাল্টে যাবে এই অঞ্চলের অর্থনৈতিক দৃশ্যপট।
তিনি আরও বলেন, রক্তদহ বিলের আউটলেট ও ইনলেট খালগুলো পুনর্খননের ফলে খুব সহজেই চলনবিলে পানি চলাচল করতে পারবে। তাই চলনবিলকে বাঁচাতে হলে এর সঙ্গে সম্পৃক্ত নদী, খাল ও বিলগুলো ধারাবাহিক ও টেকসই পরিকল্পনার মাধ্যমে সঠিকভাবে সংস্কার করার কোনো বিকল্প নেই। রক্তদহ বিল পুনর্খননে জেলা প্রশাসন, বরেন্দ্র বহুমুখী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, মৎস্য অধিদপ্তর ও কৃষি বিভাগের সমন্বয়ে একটি টেকসই প্রকল্প প্রস্তাব ইতোমধ্যে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রেরণ করা হয়েছে। দ্রুত প্রকল্প অনুমোদন সাপেক্ষে ধারাবাহিকভাবে রক্তদহ বিল ও তার সঙ্গে যুক্ত খালগুলো পুনর্খননের উদ্যোগ সরকার গ্রহণ করবে বলে তিনি আশা প্রকাশ করেন।