পঞ্চগড়ের দেবীগঞ্জ উপজেলার সোনাহার বাজারের একটি এমপিওভুক্ত বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষকের বিরুদ্ধে টিআর (টেকাবাটা) প্রকল্পের বরাদ্দের টাকা আত্মসাতের অভিযোগ উঠেছে। বিদ্যালয়ের সাইকেল গ্যারেজ নির্মাণে অনিয়ম ও আর্থিক কেলেঙ্কারির এই অভিযোগ উঠেছে তাঁর বিরুদ্ধে। অভিযোগের বিষয়ে তথ্য সংগ্রহ করতে বিদ্যালয়ে গিয়ে গ্যারেজ নির্মাণ ও প্রকল্পের ব্যয় সংক্রান্ত বিভিন্ন অসঙ্গতির তথ্য পাওয়া যায়।
অভিযুক্ত রফিকুল আলম সোনাহার উচ্চ বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কর্মরত। দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয় সূত্রে জানা যায়, ২০২৫-২০২৬ অর্থবছরে বিদ্যালয়টির সাইকেল গ্যারেজ নির্মাণের জন্য টিআর প্রকল্পে ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দ দেওয়া হয়। বরাদ্দের টাকায় একটি প্রজেক্টরও কেনা হয়েছে, যার বাজারমূল্য ৩৫ হাজার ৯০০ টাকা।
সরেজমিন বিদ্যালয়ে গিয়ে প্রকল্পের কাজে অর্থ ব্যয়ের বিভিন্ন অসঙ্গতি দেখা যায়। টিনশেড গ্যারেজে এখনো পুরোনো কাঠ ও পুরোনো টিন দৃশ্যমান রয়েছে। বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা জানায়, আগে থেকেই তাদের সাইকেল গ্যারেজ ছিল। এবার সেটি কেবল কিছুটা সংস্কার করা হয়েছে। মেঝে পাকাকরণ, কয়েকটি টিন ও কিছু কাঠ পরিবর্তন করা হয়েছে।
বিদ্যালয়টির সহকারী শিক্ষক রুবেল প্রামাণিক বলেন, "গ্যারেজের মূল কাঠামো আগে থেকেই ছিল। নতুন করে পিলার দেওয়া হয়েছে, মেঝে পাকা করা হয়েছে, দক্ষিণ দিকে একটি হাফ দেওয়াল এবং পূর্ব দিকে ছোট একটি বারান্দা করা হয়েছে।"
অভিযোগ উঠেছে, প্রধান শিক্ষক গ্যারেজ নির্মাণে নিজের মর্জিমাফিক ভাউচার তৈরি করে উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দিয়েছেন। প্রকল্প কমিটির অন্যান্য সদস্য নামকাওয়াস্তে যুক্ত ছিলেন বলেও অভিযোগ রয়েছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক প্রকল্প কমিটির এক সদস্য জানান, বিদ্যালয়ের পুরোনো ইট ভেঙে খোয়া তৈরি করা হয়েছে এবং সেই খোয়া দিয়েই মেঝে পাকা করা হয়েছে।
এদিকে, খোয়া, বালু ও পিলার ক্রয় বাবদ সোনাহার বটতলী এলাকার 'এম এস স্যানিটারি' নামের একটি প্রতিষ্ঠানের ভাউচার জমা দেওয়া হয়েছে। সেখানে খোয়া বাবদ ১০ হাজার ৮০০ টাকা ব্যয় দেখানো হয়। অথচ প্রতিষ্ঠানটির মালিক ও কর্মচারীর দেওয়া তথ্য সম্পূর্ণ ভিন্ন। প্রতিষ্ঠানটির মালিক মশিয়ার রহমান বলেন, "কিছুদিন আগে ওই স্কুল থেকে একজন ফোন করে বিভিন্ন জিনিসের দাম জানতে চেয়েছিলেন, কিন্তু পরে আর কেউ আসেননি।" একই কথা জানান প্রতিষ্ঠানটির কর্মচারী জিয়াও।
দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তার কার্যালয়ে জমা দেওয়া এমএস স্যানিটারির ১১৬২ নম্বর ভাউচারটি যাচাই করে দেখা যায়, সেটি প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলমের নিজ হাতে লেখা। ভাউচারটির সত্যতা যাচাইয়ে ওই প্রতিষ্ঠানে গেলে সেখানে মূল ভাউচারের কার্বন কপির জায়গায় পাতা ফাঁকা পাওয়া যায়।
অন্যদিকে, প্রকল্পের ১ লাখ ২০ হাজার টাকা বরাদ্দের বিপরীতে জমা দেওয়া ১০টি ভাউচার বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, ব্যয় করা অর্থের মোট পরিমাণ ৯৪ হাজার ১৬১ টাকা। সেই হিসাবে ২৫ হাজার ৮৩৯ টাকা অব্যয়িত রয়েছে। এরপরও বরাদ্দের ঘাটতি দেখিয়ে প্রজেক্টর কেনার জন্য বিদ্যালয় তহবিল থেকে প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলম আরও ১২ হাজার টাকা নেন।
বিষয়টি নিশ্চিত করেছেন বিদ্যালয়টির সহকারী প্রধান শিক্ষক অশোক কুমার রায়। তিনি বলেন, "বরাদ্দ ঘাটতি পড়ায় প্রজেক্টর ক্রয়ের জন্য বিদ্যালয় তহবিল থেকে ১২ হাজার টাকা প্রধান শিক্ষককে দেওয়া হয়েছে।"
অভিযোগ রয়েছে, প্রকল্পের কাজে বিদ্যালয় তহবিল থেকে অর্থ গ্রহণ, খোয়া না কেনা এবং বরাদ্দের অব্যয়িত অর্থ মিলে প্রায় ৪৭ হাজার টাকা লোপাট করেছেন প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলম।
এ বিষয়ে জানতে প্রকল্প কমিটির সভাপতি ও বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক রফিকুল আলমকে মুঠোফোনে কল দেওয়া হলে তিনি সাক্ষাতে কথা বলবেন বলে জানান। দেবীগঞ্জ উপজেলা প্রকল্প বাস্তবায়ন কর্মকর্তা (ভারপ্রাপ্ত) ওয়ালিফ মন্ডল জানান, "বরাদ্দটি আগের ছিল, বরাদ্দের এ বিষয়ে আমি জানি না।"
উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ইন্দ্রজীৎ সাহা বলেন, "প্রকল্প ও বিদ্যালয় তহবিলের অর্থ কেলেঙ্কারির কোনো সুযোগ নেই। বিষয়টি আমাদের নজরে এসেছে, প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে।"