জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের বটতলায় খাবার দোকান বন্ধ রাখার সুযোগ নিয়ে দোকানের বরাদ্দ বাতিল করে পুনরায় বরাদ্দ দেওয়ার মাধ্যমে মোটা অঙ্কের টাকা ভাগবাটোয়ারা করার অভিযোগ উঠেছে শাখা ছাত্রলীগের আ ফ ম কামালউদ্দীন হলের কয়েক নেতার বিরুদ্ধে।
অভিযোগ রয়েছে, তৎকালীন হল প্রশাসনও টাকার ভাগ-বাটোয়ারায় জড়িত ছিল। দীর্ঘদিন চেষ্টা করেও কোনো ক্ষতিপূরণ তো পাননি, উল্টো ভয় দেখিয়ে ক্যাম্পাস ছাড়া করা হয়েছে- এমনই অভিযোগ ভুক্তভোগী পরিবারের। এ ঘটনায় সর্বস্ব খুইয়ে দিশেহারা হয়ে পড়েছে পরিবারটি।
ভুক্তভোগীর নাম মো. হুমায়ুন কবির। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের আ ফ ম কামালউদ্দীন হলের ১০নং দোকানের মালিক ছিলেন।
অপরদিকে অভিযুক্তরা হলেন- শাখা ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফরহাদ হোসেন, সহ-সভাপতি আবু ওয়ালিদ, সহ-সভাপতি তানভীর ইসলাম, সহ-সভাপতি রাকিবুল ইসলাম অপু এবং হল অফিস সহকারী আনিস। এছাড়া তৎকালীন হল প্রভোস্ট আ স ম ফিরোজ উল হাসান ও ওয়ার্ডেন ইখতিয়ার উদ্দীন ভুইয়ার জোগ সাজশে ছাত্রলীগ নেতারা দোকান বিক্রি করেছেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
জানা যায়, ২০১৮ সালে সাড়ে সাত লক্ষ টাকার বিনিময়ে পূর্বের মালিক থেকে দোকানটি কিনে নেন হুমায়ুন কবির। এরপর দোকানের মেরামত কাজে আরও প্রায় দশ লক্ষ টাকা খরচ করেন তিনি। তবে কোভিডের জন্য দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ রাখার পর বিশ্ববিদ্যালয় চালু হলে দোকান চালাতে হিমশিম খাচ্ছিলেন হুমায়ুন। সেজন্য প্রায়ই দোকান বন্ধ রাখতেন তিনি। এসময় দোকান বন্ধ রাখায় একাধিকবার হল থেকে তাকে নোটিশ দেওয়া হয়। এরপরও পুরোদমে দোকান চালু করতে না পারায় বরাদ্দ বাতিল করে নতুন মালিককে বরাদ্দ দেয় হল প্রশাসন। এসময় হল প্রশাসনের সাথে যোগসাজশ করে দোকান বরাদ্দ পাইয়ে দেওয়ার বিনিময়ে মোটা অঙ্কের টাকা হাতিয়ে নেন আ ফ ম কামালউদ্দীন হল ছাত্রলীগের কয়েক নেতা।
দোকানের মালিক হুমায়ুনের স্ত্রী বলেন, ‘এই দোকানটি ছিল আমাদের একমাত্র অবলম্বন। করোনার সময় ঋণগ্রস্ত হয়ে পড়ায় আমরা দোকান চালু করতে পারছিলাম না। আমরা চেয়েছিলাম পুনরায় সংস্কার করে দোকান চালু করবো। এসময় ছাত্রলীগ আমাদের কাছে ৫০ হাজার টাকা চাঁদা চায়। সেসময় আমার স্বামীও বাইক দুর্ঘটনায় আহত হন। এসব কারণে তিনি দোকানটি বেশ কিছুদিন বন্ধ রাখেন। পরবর্তীতে হল প্রশাসন আমাদের বরাদ্দ বাতিল করে নতুন মালিককে বরাদ্দ দেয়। আমরা দোকানটির পিছনে প্রায় সতেরো লক্ষ টাকা খরচ করেছিলাম। দোকানের ক্ষতিপূরণ চেয়ে স্যারদের সাথে দেখা করলে ইখতিয়ার স্যার নতুন মালিকের সাতে কথা বলে আমাকে ৫০ হাজার টাকা দিতে চান। এই কথা শুনে আমি কোনো টাকা না নিয়েই চলে আসি। এরপর ফিরোজ স্যারের কাছে গেলে তিনি আমাকে ‘এসব নিয়ে বাড়াবাড়ি করলে বিপদে পড়বেন’ বলে ক্যাম্পাসে আসতে নিষেধ করে দেন। পরে শুনেছি ছাত্রলীগ নেতারা আমাদের দোকানটি অনেক টাকায় বিক্রি করেছে, যার কোনো টাকাই আমরা পাইনি।’
হল সূত্রে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়ম অনুযায়ী হল প্রশাসন যেকোনো সময় দোকানের বরাদ্দ বাতিল করতে পারে। হুমায়ুন কবির দীর্ঘদিন দোকান বন্ধ রাখায় কয়েকবার নোটিশ দেওয়া হয়। এসময় তিনি দোকান সংস্কারের সময় চাইলে হল প্রশাসন তাকে ১ মাসের সময় দেয়। এরপরও কিছুদিন পরপরই দোকান বন্ধ রাখায় তার বরাদ্দ বাতিল করে নিয়ম অনুযায়ী মৌখিক সাক্ষাৎকার নিয়ে প্রতি স্কয়ার ফিট দেড় টাকা মাসিক ফি বাবদ বর্তমান মালিক রিপন মিয়াকে দোকানটি বরাদ্দ দেওয়া হয়। এসময় হল কোষাগারে ৫ হাজার টাকা এবং বরাদ্দ ফি বাবদ ৫ হাজার টাকা মোট ১০ হাজার টাকা ব্যাংকে জমা দেয় রিপন মিয়া।
তবে বটতলার একাধিক দোকানদারের সাথে কথা বলে জানা যায়, বিশ্ববিদ্যালয়ে দোকান বরাদ্দ ফি নামমাত্র টাকা হলেও দোকান কেনা-বেচা হয় মোটা অঙ্কের টাকায়। মালিকদের মাঝে কেনা-বেচা হলেও মধ্যস্ততাকারী হিসেবে হলের পলিটিক্যাল নেতারা টাকার একটি অংশ বাগিয়ে নিতেন। তবে ১০ নং দোকানটি বিক্রির ক্ষেত্রে পূর্বের দোকানদার কোনো টাকাই পাননি। রিপনের দেওয়া টাকার পুরোটাই ছাত্রলীগ নেতা, হল অফিসের কর্মচারী আর হল প্রশাসনের দায়িত্বে থাকা শিক্ষকেরা ভাগ বাটোয়ারা করে নিয়েছেন।
এ বিষয়ে দোকানের বর্তমান মালিক রিপন বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে ব্যবসা করতে হলে ছাত্রলীগকে সবাই কম-বেশি টাকা দিতো। আর দোকান কেনাবেচার সময়ও আমাকে টাকা দিতে হয়েছে। কিন্তু কত টাকা দিয়েছি বলতে চাই না। তবে আমি সকল নিয়ম মেনেই দোকানটি কিনেছি। ইখতিয়ার স্যার আমায় দোকানের সাবেক মালিক হুমায়ুনকে ৫০ হাজার টাকা দিতে বলেছিলেন। তারা যেকোনো সময় চাইলেই আমি টাকাটি দিয়ে দিবো।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক দোকানের সাবেক এক কর্মচারী বলেন, হুমায়ুন ভাই অসুস্থ থাকার সুযোগে ছাত্রলীগ নেতারা হল অফিসের আনিসের সাথে যোগসাজশ করে ৮ লক্ষ টাকার বিনিময়ে দোকানটি বিক্রি করে দেয়। এই টাকা ফরহাদ, ওয়ালিদ, তানভীর, অপু, হল অফিসের আনিস এবং হলের বাকি নেতারা ভাগ করে নেন। এছাড়া জিনিসপত্র এবং দোকান বিক্রির টাকা চাইলে হুমায়ুনের স্ত্রীকে ক্যাম্পাসে না আসার হুমকি দেন হল প্রভোস্ট আ স ম ফিরোজ উল হাসান।
এ বিষয়ে ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ফরহাদ হোসেন বলেন, হল প্রশাসন দোকান বরাদ্দ দিয়েছে। আমরা কোনো টাকা-পয়সা নিইনি। দলের দুঃসময় চলছে, এখন সবকিছুর দোষ আমাদের দেওয়া হচ্ছে।
এ বিষয়ে সরকার ও রাজনীতি বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ইখতিয়ার উদ্দীন ভুঁইয়া বলেন, হলের সকল নিয়ম মেনে দোকান বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। এক্ষেত্রে দোকানের মালিক না এসে তার স্ত্রী ক্ষতিপূরণ চাইতে আসায় আমি তার স্বামীকে নিয়ে আসতে বলেছি। কিন্তু তিনি সেটি করেননি। তারপরও আমি তার জিনিসপত্র নিয়ে যেতে বলেছি আর নগদ ৫০ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণের ব্যবস্থা করে দিতে চেয়েছি। আমার বিরুদ্ধে এসব অভিযোগের কোনো ভিত্তি নেই।
হুমকি দেওয়ার অভিযোগ অস্বীকার করে সাবেক প্রভোস্ট আ স ম ফিরোজ উল হাসান বলেন, আমার কাছে হুমায়ুনের স্ত্রী এসেছিল। আমি তখন ইখতিয়ার স্যারকে ফোন করে বিষয়টি সমাধান করে দিতে বলি। দোকানের বিষয়গুলো সেই দেখভাল করতেন। ছাত্রলীগ কোনো টাকা নিয়েছে কিনা সেটিও আমার জানা নেই। আর এ বিষয়ে কাউকে হুমকি দেওয়ার তো প্রশ্নই আসে না।
বায়ান্ন/প্রতিনিধি/একে