খবর প্রতিদিন

জিঁকিরের পেছনে ফিকিরের ধান্ধা

সখী ভালোবসা কারে কয় ,এই আদলে "গণতন্ত্র কারে কয়"এধরণের একটি গান লিখার খায়েশ ছিল।কিন্তু গণতন্ত্র সম্পর্কে ক্ষীণ ধারণা থাকায় গানটি জগাখিচুরি হয়ে যাবে সেটি নিশ্চিত মনে করেই এ প্রচেষ্টা থেকে বিরত হয়েছি।গণতন্ত্র কারে কয়-এ প্রশ্নের বিস্তৃত ধারণা আমার যেমনি নেই তেমনি টেলিভিশনে নাঁচকীর্তন ওয়ালাদেরও নেই। ডায়েসে গলা ফাঁটিয়ে যারা গণতন্ত্র নিয়ে সোচচার তারাও গণতন্ত্রের শাঁনে নজুল জানে কিনা তা নিয়েও সংশয় আছে।

 

এথেন্সীয় নগর রাজ্যে যে তন্ত্রের অংকুরোদগম হয়েছিল সেই তন্ত্র কিভাবে বিশাল রাজ্যে প্রয়োগ ও বিকশিত হয়েছিল, তার মহিমাই বা কেমন এবং কোথায় তার দুর্বলতা রয়েছে সে গবেষণাতো সাধারণ কেহ করেনি। পত্রপাঠে যা জানা গেছে তারইবা অনুশীলন কতটুকু হচছে? গণতন্ত্র যে ষোলকলায় পূর্ণ একটি শাসনব্যবস্থা তা ই বা বলাযাবে কিভাবে? গণতন্ত্রের পীটস্তান বলে খ্যাত আমেরিকাতেই দাস এবং কালাআদমীদের ভোটাধিকার রহিত ছিল শতবছর আগেও। একই অবস্তা ছিল বৃটেনে। নারীদের সেখানে ভোটাধিকার ছিল না।বৃটিশরাজ এই উপমহাদেশে কায়েম নাহলে এখানেতো রাজতন্ত্রের নিশানই উড্ডীন থাকতো। উপমহাদেশে বৃটিশরাজ গণতন্ত্রের বীজ বপন করলেও সেটি কি পূর্ণাংগ ছিল। ১৯১৯ সনের সংস্কার আইন এবং ১৯৩৫ সনের ভারতশাসন আইনেতো সার্বজনীন ভোটাধিকারের কোনো গ্যারান্টি ছিল না। এলিটশ্রেণী ও লোকাল বোর্ডের ট্যাক্স যারা পরিশোধে সক্ষম ছিলেন কেবল তাদের ভোটাধিকার ছিল। বাকী সবতো ছিল তৃতীয়শ্রেনীর নাগরিক। ঠুঠো জগন্নাথরূপী পার্লামেন্ট থাকলেও সেটি ছিলো ভাইসরয়ের ইছছার পুতুল। স্বাধীন ভারতে এখন গণতন্ত্র থাকলেও সেটিকে গিলে ফেলতে চাছছে ধর্মীয় উগ্রবাদ।

 

তিনটি গণতান্ত্রিক রাস্ট্রের উদাহরণ টানলাম এ কারণে যে কোথাও গণতন্ত্র তার আদর্শিক বৈশিষ্ট নিয়ে পাখা মেলতে পারেনি। তারপরও মানোত্তীর্ন কোন ইজমের আবির্ভাব না হওয়া পর্যন্ত গণতন্ত্রই হচ্ছে উত্তমশাসন ব্যবস্থা। এ কথাটি অতীত ও ববর্তমান রাষ্ট্র বিজ্ঞানীরা যেমনি মানেন তেমনি আম পাবলিকেও মেনে নিতে বাধ্য। দিবারাত্রির ধারাবাহিক রজ্জুবন্ধনের চাইতে ক্ষনিক বন্ধন মুক্তিতে আত্মপ্রসাদ আছে বৈকি!

 

এখন আসা যাক এতদ্দেশীয় গণতন্ত্র প্রসংগে। বৃটিশ শাসনামলে গণতন্ত্রের ট্রায়াল শুরু হলেও ২৩ বছরের শাসনামলে কি পাকিস্তানে গণতন্ত্র ছিল? গণতন্ত্রকে ঘিরে রেখেছিল একনায়কতন্ত্র এবং ষড়যন্ত্র। স্বাধীন বাংলাদেশী আমলে গণতন্ত্রের স্বরূপ কি?  ১৯৭২ সনে খন্ডিত পাকিস্তানে নির্বাচিত সংখ্যা গরিষ্ঠ দলনেতা জুলফিকার আলী ভুট্টু ক্ষমতারোহন করলেও যুদ্ধোত্তর পরিস্থিতি বিবেচনায় সামরিক শাসন জারী রেখেছিলেন। অন্যদিকে স্বাধীন বাংলাদেশে প্রত্যাবর্তন করেই শেখ মুজিব সংসদীয় গণতন্ত্র চালু করলেন। কিন্তু গণতান্ত্রিক আবহ কতদিন ধরে রাখতে পেরেছিলেন? গণতন্ত্রের সুবাদে যখন বহুমুখী ষড়যন্ত্র ও বাদর নাঁচ শুরু হয়েছিল তখন বাধ্য হয়ে একদলীয় শাসন ব্যবস্থায় যেতে হয়েছিল। অতঃপর রক্তাক্ত ও বিয়োগান্তক বিপর্য্যয়ের পরও কি গণতন্ত্র এসেছিল? বরং আট বছরের মাথায় দুইবার সামরিক শাসন জারী হয়েছিল। এখন গণতন্ত্রের নামাবলি গায়ে জড়িয়ে যারা গণতান্ত্রিক জপতপে আকুল তারাই সামরিক শাসনকে জিন্দাবাদ দিয়েছিল। সামরিক শাসকদেরকে আববাহুজুর সম্বোধন করে বন্দনায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠেছিল। এই সুবিধাবাদীদের "গণতান্ত্রিক মতলব "বুঝতে হবে। মুখে শেখ ফরিদ এবং বগলে ইটরেখে তাপস সাজার বাহানার যথেষ্ঠ উপায় আছে এ দেশে। মূলকথা হচ্ছে -এই সমাজব্যবস্থা গণতন্ত্রের জন্য কতটুকু উপযোগী এবং পরিবেশ কতটুকু অনুকূলে সেটি বিবেচনায় না নিলে বজ্র আটুনী ফস্কাগিরোরই জয় হবে।

 

বর্তমান প্রেক্ষাপটে দেশে কতটুকু গণতন্ত্র আছে সে গবেষণার ভার যথাযথ গবেষকদের উপর ছেড়ে দেয়া উচিত। বর্তমান সরকারকে বিনাভোটের সরকার বলে একপক্ষ আওয়াজ তুলেছেন।তাদেরকেতো পাল্টা প্রশ্ন  করা যেতে পারে - খন্দকার মোস্তাক ,জিয়াউর রহমান,এরশাদ এবং ফখরুদ্দিনরা কোন ভোটে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন?

 

শেখ হাসিনাতো ২০০৮ সনের একটি গ্রহনযোগ্য নির্বাচনের ভিত্তিতে ক্ষমতাসীন হয়েছিলেন। পরবর্তিতে ভোট বয়কট ও তান্ডবপন্থা অবলম্বন করে নির্বাচনী চ্যালেঞ্জগ্রহণ না করার দায়তো শেখ হাসিনা নিতে পারেন না। গণতন্ত্র তো অংশগ্রহন মূলক সিস্টেম। তাতে কেউ যদি না আসে তাতে দায়ভার অপরের উপর বর্তায় না। এখানে বিতর্কে জড়ানোর অবকাশ নেই।

 

গণতন্ত্র নাকি এ দেশ থেকে উধাও হয়েছে স্বৈরতন্ত্র ও ফ্যাসিবাদের দাপটে! গণতন্ত্রের অন্যতম বৈশিষ্ঠ হচ্ছে মিডিয়ার অবাধ প্রবাহ।এ দেশের মিডিয়াতো বিতর্কিত। মিডিয়া চরিত্রের উলংগ প্রকাশ ঘটেছিল ১৯৭৪ সনে কুড়িগ্রামের বাসন্তীকে জালপরিয়ে লাইমলাইটে টেনে আনার মাধ্যমে। সে সময়ে বাজারকে অঅস্থিতিশীল করার পেছনেও মিডিয়ার ভূমিকা ছিল প্রণিধানযোগ্য।

 

বর্তমানে মিডিয়া কতটকু অবাধ না বাধাগ্রস্থ তা নিয়েও প্রশ্ন আসতে পারে। জবাবে বলা যায়, প্রচার এবং অপ প্রচারের বহুমাত্রিকতায় মিডিয়া এখন ফ্রীস্টাইল। প্রিন্ট মিডিয়া এবং ইলেকট্রনিক মিডিয়ার এখন বহুমাত্রিকতার যুগ। নিজ নিজ নীতির আলোকে সবাই ইচ্ছামাফিক সংবাদ পরিবেশন করছে। কোনো কোনো মিডিয়া হাউজতো মরা গাং এ জোয়ার তোলার কোসেস অবলম্বন করেও অন্তর জ্বালায় দগ্ধ হচছে। অজ্ঞাত কূলশীলদেরকে ডেকে এনে বুদ্ধিজীবি সাজিয়ে জাতিকে নসিহত দিতে ব্যাকুল রয়েছে কোনো কোনো মিডিয়া হাউজ। তাতেতো বাঁধ সাধছেনা কেহ। বিদেশী জু জুর অলীক আস্ফালনকে ফলাও করে সামাজিক সংশয়ের আবহ সৃস্টি করলেও দায়বদ্ধতার প্রশ্ন আসছেনা। তারপরও কি বলা যাবে যে মিডিয়ার স্বাধীনতা নেই?

 

এখন আসা যাক বাকস্বাধীনতা প্রসংগে। বাক স্বাধীনতাতো সাংবিধানিক ও গণতান্ত্রিক. অধিকার। এই অধিকার বলে শেখ হাসিনা ও তার সরকারের বিরুদ্ধে গত১৫ বছরে যতটুকু সমালোচনা সহ অপপ্রচারণা হয়েছে অতীতের অন্যসব সরকারের বিরুদ্ধে তার সিকি ভাগও কেউ করতে পারেনি। জিয়ার প্রাথমিক শাসনামলে কি রাও শব্দ করা গেছে? এখনতো যা ইচ্ছা তাই সমালোচনা এবং অবান্তর অপ প্রচারণাও চলছে। তবে বাকস্বাধীনতার নামে প্রলাপ বা কুস্রী গালাগাল যদি জায়েজ হয় তাহলে সেটি গণতন্ত্র না ইতরতন্ত্র তাতো বলা মুশকিল। সব কিছুর একটি সীমা রেখা আছে। পাগলের পাগলামীকে স্বাভাবিক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখাহয়। সেই দুর্বলতার সুযোগে যদি গাছের মগডালে উঠে পাগল পথচারীদের উপর পচছাব ছিটাতে শুরু করে তাহলে তাকে বেঁধে পাগলাগারদে পাঠানো ছাড়া কি গত্যন্তর আছে? গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে খেমটা নাঁচ কোনো দেশের কোনো সরকারই ছাড় দেবেনা।

 

 

গণতান্ত্রিক দেশে সাধারণ নির্বাচন হচ্ছে রাজনৈতিক দলের ওজনের মাপকাঠি। কোনো দলের কতটুকু জনপ্রিয়তা আছে সেটির হিসাব মিলে ভোটের মানদণ্ডে। রাজনৈতিক  দল হিসাবে বি এন পি ভোটের পাল্লায় উঠতে নারাজ। ইচ্ছা পূরণের সরকার ক্ষমতায় নেই এই অজুহাতে নির্বাচন বর্জন নাকি ২০০৮ সনের নির্বাচনের ভরাডুবিকে ধারণায় রেখে নির্বাচনে আসছেনা সে রহস্য এক সময় বেরিয়ে আসবে। তবে রাজনৈতিক আবর্তন বিবর্তনে দলীয় জন প্রিয়তা বাড়তে পারে আবার কমতেও পারে। তারতো একটি মাপজোকের প্রয়োজন ছিল সময়ের দাবী অনুসারে। কিন্তু কথায় বলে -বান্ধা ঝাপির  মূল্য লাখটাকা। ঝাপির মুখ খুলে দিলে তাতে কি আছে তার মাপজোঁক হয়ে যাবে। তারচে ঝাপির মুখ বন্ধ তথা নির্বাচন বর্জ্জনই বেহতর। মাঝখানে যারা টেলিভিশনের বাক্সে

 ঢুকে জাতিকে বেকুব গণ্যকরে বয়ান ও গদাই লস্করি করছেন তারাতো নিশি কোকিল মাত্র। বুদ্ধিবাজের জিকিরের পেছনে ফিকিরের ধান্ধাটাই বড়।



সম্পর্কিত খবর