ঢাকা

টাঙ্গাইল শহর: অপরিকল্পিত নগরায়নে নাভিশ্বাস নাগরিকদের

১৩৯ বছরের প্রাচীন টাঙ্গাইল পৌরশহর এখন অপরিকল্পিত নগরায়ন, যানজট, জলাবদ্ধতা, গ্যাস সংকট আর নাগরিক সুবিধার অভাবে দিন দিন বসবাসের জন্য অযোগ্য হয়ে পড়ছে।

১৯৬৯ সালের ১ ডিসেম্বর তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের ময়মনসিংহ জেলার একটি মহকুমা থেকে টাঙ্গাইল জেলায় রূপান্তরিত হয়। এর অনেক পূর্বে টাঙ্গাইল মহকুমায় ১৮৮৭ সালের ১ জুলাই প্রতিষ্ঠিত হয় টাঙ্গাইল পৌরসভা। এটি ১৩৯ বছর বয়সী দেশের অন্যতম প্রাচীন পৌরসভা। প্রতিষ্ঠার সময় ওয়ার্ড ছিল ৫টি, বর্তমানে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ১৮টিতে। ২০২২ সালের জনশুমারি অনুযায়ী পৌরসভার মোট জনসংখ্যা ২ লাখ ১২ হাজার ৮৮৭ জন। ২৯ বর্গকিলোমিটার আয়তনের দ্রুত বর্ধনশীল এই পৌর শহরের জনসংখ্যা বাড়লেও সেই তুলনায় রাস্তা, ড্রেনেজ, পার্কিং ও পাবলিক সার্ভিস বাড়েনি।

পৌর শহরের প্রধান সড়ক—ভিক্টোরিয়া রোড, মেইন রোড, জেলা সদর রোড (কবি নজরুল সরণি), ময়মনসিংহ রোড ও বেবিস্ট্যান্ড সড়ক অত্যন্ত সরু। ফলে যানজট এখানকার নিত্যনৈমিত্তিক ঘটনা।

জেলা ট্রাফিক পুলিশের তথ্য অনুযায়ী, শহরে বৈধ সিএনজিচালিত অটোরিকশা ৪ হাজার ২০০টি এবং ব্যাটারিচালিত রিকশা দুই শিфটে ৫ হাজারটি চলাচল করে। এ ছাড়া ব্যাটারিচালিত রিকশার (টেসলা) নির্দিষ্ট কোনো পরিসংখ্যান নেই।

দিনের কর্মব্যস্ত সময়ে এই পরিমাণ সিএনজি, অটোরিকশা ও বাসের চাপে ভিক্টোরিয়া রোড, নিরালা মোড়, মেইন রোড, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, নতুন বাসস্ট্যান্ড এবং পার্কবাজারের মোড়ে প্রতিদিন ঘণ্টার পর ঘণ্টা যানজট লেগে থাকে। এতে পুরো শহর স্থবির হয়ে পড়ে।

জেলার একমাত্র নতুন বাস টার্মিনালটি ১৯৮১ সালের সেই ৬ একর জায়গার মধ্যেই সীমাবদ্ধ রয়েছে। অথচ এর মধ্যে যানবাহনের সংখ্যা বেড়েছে কয়েকগুণ। ফলে যানজটের কারণে পাশের মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও জেনারেল হাসপাতালের রোগী পরিবহনে ব্যবহৃত অ্যাম্বুলেন্স চলাচলও প্রায়ই ব্যাহত হয়।

শহরের প্রাণকেন্দ্র বেবিস্ট্যান্ড, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড, কলেজ মোড়, নতুন বাসস্ট্যান্ড, বেড়াডোমা ও শান্তিকুঞ্জের মোড়ে অপরিকল্পিতভাবে গড়ে উঠেছে সিএনজি স্ট্যান্ড। ফলে প্রতিদিন সকাল-বিকাল শহরের এসব পয়েন্টে যান চলাচল স্থবির হয়ে পড়ছে, যার নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে পুরো শহরে।

পৌরসভার উদ্যোগে শ্যামাবাবুর খাল দখল করে ৭টি মার্কেট নির্মাণের ফলে শহরের একমাত্র বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের প্রাকৃতিক এই খালটি কার্যকারিতা হারিয়েছে। ফলে সামান্য বৃষ্টিতেই শহরে তীব্র জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে। বিশেষ করে শহরের আকুর-টাকুর পাড়া, আদালতপাড়া, থানাপাড়া, সাহাপাড়া, পুরাতন বাসস্ট্যান্ড ও আটপুকুর পাড় সামান্য বৃষ্টিতেই তলিয়ে যায়। শহরের প্রধান ড্রেনগুলো ময়লা-আবর্জনায় বন্ধ রয়েছে। নালা-নর্দমা সংস্কার ও শ্যামাবাবুর খাল উদ্ধারের বিষয়ে নেই কোনো কার্যকর মাস্টারপ্ল্যান।

অন্যদিকে, পৌরসভার রাস্তার অধিকাংশ ফুটপাত হকারদের দখলে থাকায় পথচারীদের বাধ্য হয়ে মূল রাস্তা দিয়েই হাঁটতে হচ্ছে। নতুন মার্কেট ও আবাসিক ভবন গড়ে উঠলেও পার্কিং, খোলা জায়গা কিংবা খেলার মাঠের ব্যবস্থা রাখা হচ্ছে না। ১৩৯ বছরের প্রাচীন এই শহরে নেই কোনো শিশু পার্ক, নেই প্রবীণদের জন্য কোনো বিনোদন কেন্দ্র। অথচ জেলার একমাত্র শিশু পার্কে গড়ে উঠেছে পার্ক বাজার।

নির্দিষ্ট স্থানে ময়লা ফেলার ব্যবস্থা না থাকায় ডাস্টবিনের অভাবে যত্রতত্র ময়লা পড়ে থাকে। গ্রীষ্মকালে তীব্র পানির সংকট দেখা দেয় এবং অনেক এলাকায় এখনো গ্যাস লাইন পৌঁছায়নি।

টাঙ্গাইল মেডিকেল কলেজ ও ২৫০ শয্যার জেনারেল হাসপাতালে রোগীর চাপের তুলনায় চিকিৎসক ও অবকাঠামো অপ্রতুল। স্কুল-কলেজের ক্ষেত্রেও একই চিত্র দেখা যায়।

ব্যাংকার জাহাঙ্গীর আলম বলেন, "টাঙ্গাইল এখন আর আগের টাঙ্গাইল নেই। রাস্তায় বের হলেই ধুলা আর যানজট। বাচ্চাদের নিয়ে একটু হাঁটার জায়গা নেই। শিশুদের জন্য এই শহর আর নিরাপদ নয়।"

ব্যবসায়ী মো. রফিক বলেন, "পৌরসভা ট্যাক্স বাড়ালেও সেবা বাড়াচ্ছে না। ড্রেন পরিষ্কার হয় না, রাস্তা ভাঙা থাকে মাসের পর মাস, দেওয়া হয় না মশার ওষুধও। গ্রীষ্মকালে তিন মাস সাপ্লাইয়ের পানি পাওয়া যায় না।" পৌরসভার নাগরিক সেবা অত্যন্ত সীমিত, যা অত্যন্ত দুঃখজনক।

বেবিস্ট্যান্ড সিএনজি ও অটোরিকশা শ্রমিক সমিতির আহ্বায়ক হাদিউজ্জামান সোহেল বলেন, "কনস্ট্রাকশন কোম্পানি এনডিএ বেবিস্ট্যান্ডের বেশ কিছু জায়গা দখল করে আছে। সেই জায়গাটি উদ্ধার করে সিএনজি পার্কিংয়ের ব্যবস্থা করলে টাঙ্গাইল-নাগরপুর আঞ্চলিক সড়কে যানজট কমবে। কচুয়াডাঙ্গা-এয়ারপোর্ট রোডে কিছু অটোরিকশা শিফট করলে মূল সড়কের ওপর চাপ কমবে।"

টাঙ্গাইল পৌরসভার নগর পরিকল্পনাবিদ শহিদুল ইসলাম জানান, একটি পরিকল্পিত নগরে ২০ শতাংশ জায়গা রাস্তার জন্য বরাদ্দ থাকে। ৪০ শতাংশ বসতি ও ১০ শতাংশ জায়গায় খেলার মাঠ তথা বিনোদনকেন্দ্র থাকতে হয়, কিন্তু টাঙ্গাইল পৌরসভায় এর কিছুই নেই। তিনি আরও জানান, শহরের যানজট নিরসনে অটোরিকশা দুই শিফটে চালানোর পরিকল্পনা রয়েছে। অবৈধ দখল উচ্ছেদে অভিযান চলছে এবং শহরের জন্য নতুন মাস্টারপ্ল্যানের কাজও হাতে নেওয়া হয়েছে।

টাঙ্গাইলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার (ডিএসবি) কাজী শাহনেওয়াজ বলেন, "শহরে ধারণক্ষমতার অতিরিক্ত যানবাহন চলছে। প্রশাসন ও পৌরসভা সমন্বয় করে কাজ করলে পরিস্থিতির উন্নতি হবে।"

টাঙ্গাইল সচেতন নাগরিক ফোরামের সভাপতি অকিবুর রহমান ইকবাল বলেন, "দ্রুত টাঙ্গাইলের জন্য একটি পূর্ণাঙ্গ নগর পরিকল্পনা প্রয়োজন। নতুন বাস টার্মিনাল ও ট্রাক টার্মিনাল শহরের বাইরে স্থানান্তর, ড্রেনেজ ব্যবস্থার মাস্টারপ্ল্যান বাস্তবায়ন প্রয়োজন। ফুটপাত ও পার্কিং জোন নির্ধারণ এবং খেলার মাঠ ও শিশু পার্ক পুনরুদ্ধার অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।" টাঙ্গাইলকে বাসযোগ্য করতে হলে দ্রুত এই বিষয়গুলো বাস্তবায়ন করতে হবে।

টাঙ্গাইল জেলা শহর হিসেবে দ্রুত প্রসার ঘটছে। তবে পরিকল্পনা ছাড়া এই অপরিকল্পিত বৃদ্ধি শহরটিকে বসবাসের অনুপযোগী করে তুলছে। বিশেষজ্ঞদের ধারণা, এখনই সঠিক পরিকল্পনা গ্রহণ ও তার কঠোর বাস্তবায়ন না হলে আগামী ৫ থেকে ১০ বছরে টাঙ্গাইলবাসীর দুর্ভোগ আরও বহুগুণ বেড়ে যাবে।

 


সম্পর্কিত খবর