রাজনীতি

যেভাবে রাজনীতিতে সাফল্যের শীর্ষে মির্জা ফখরুল

বাংলাদেশের রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট সবসময়ই পরিবর্তনশীল, উত্তাল এবং চরম অনিশ্চয়তায় ভরপুর। ক্ষমতার রদবদল, রাজপথের রক্তক্ষয়ী সংঘাত, কারাবাস আর আইনি জটিলতার ধোঁয়াশায় আচ্ছন্ন এই রাজকীয় অথচ ঝুঁকিপূর্ণ ময়দানে যারা দীর্ঘ পথ পাড়ি দিয়ে জাতীয় পর্যায়ে নিজেদের এক সুদৃঢ় ও অপ্রতিদ্বন্দ্বী অবস্থান তৈরি করতে পেরেছেন, তাদের মিছিলে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর এক উজ্জ্বল ও ব্যতিক্রমী নাম।

 

 

ছাত্ররাজনীতির অগ্নিঝরা দিনগুলো থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের শান্ত ক্লাসরুম, সরকারি প্রশাসনিক পদপদবি, স্থানীয় সরকার জনপ্রতিনিধি, কৃষক আন্দোলনের নেতৃত্ব, জাতীয় সংসদ, সরকারের গুরুত্বপূর্ণ মন্ত্রিত্ব এবং সবশেষে দেশের অন্যতম প্রধান রাজনৈতিক দল বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলের (বিএনপি) শীর্ষ কাণ্ডারি-তার দীর্ঘ জীবনের প্রতিটি অধ্যায় যেন সমকালীন বাংলাদেশের রাজনীতি ও ইতিহাসের এক একটি জীবন্ত ও উত্তাল উপাখ্যান।

নিরাপদ ও সম্মানজনক সরকারি বিসিএস ক্যাডারের চাকরি ছুড়ে ফেলে দিয়ে অনিশ্চিত রাজনীতির খেয়ায় ভাসার দুঃসাহস সবাই দেখাতে পারেন না।

 

 

তবে মির্জা ফখরুল সেই বিরল ব্যক্তিদের একজন, যার উত্থান কোনো আকস্মিক রাজনৈতিক শূন্যতা কিংবা রকেট গতিতে ঘটা কোনো অলৌকিক কাহিনীর ফসল নয়। বরং এটি কয়েক দশকের নিরবচ্ছিন্ন সাংগঠনিক মেধা, চরম সংকটকালে প্রজ্ঞার পরিচয়, তৃণমূলের কাদামাটিতে হেঁটে চলার অভিজ্ঞতা এবং বারবার ধসে পড়া ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে দলকে পুনর্গঠন করার এক আত্মনিবেদিত ইতিহাস।

পারিবারিক ঐতিহ্য ও স্বাধিকার আন্দোলনের রক্তিম দিনগুলো

১৯৪৮ সালের ২৬ জানুয়ারি, দেশের উত্তরের সীমান্ত ঘেঁষা প্রান্তিক জেলা ঠাকুরগাঁওয়ের এক আভিজাত্যপূর্ণ ও রাজনৈতিকভাবে সচেতন পরিবারে জন্ম নেন মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর। তার ধমনিতে বহমান ছিল রাজনীতির রাজকীয় রক্ত।

 

তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন ছিলেন একজন সুপরিচিত প্রথিতযশা আইনজীবী এবং বর্ষীয়ান রাজনীতিবিদ, যিনি ঠাকুরগাঁও অঞ্চল থেকে একাধিকবার জাতীয় সংসদের সদস্য নির্বাচিত হয়েছিলেন। শৈশব থেকেই পরিবারের অন্দরে জাতীয় ও আন্তর্জাতিক রাজনীতির যে গভীর চর্চা তিনি প্রত্যক্ষ করেছিলেন, তা-ই তার অন্তরে দেশের ভবিষ্যৎ রাজনীতি নিয়ে গভীর অনুভূতির জন্ম দেয়।

পারিবারিক আবহের পরিক্রমা পেরিয়ে মির্জা ফখরুল যখন ষাটের দশকের মধ্যভাগে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অর্থনীতি বিভাগে ভর্তি হন, তখন পুরো পূর্ব পাকিস্তান বঙ্গবন্ধুর ছয় দফা ও স্বাধিকার আন্দোলনের উত্তাপে ফুটছিল। প্রখর মেধাবী এই তরুণ সেই উত্তাল সময়ে দেশের মূল রাজনৈতিক স্রোতে নিজেকে যুক্ত করতে দ্বিধা করেননি। তিনি তদানীন্তন প্রগতিশীল ছাত্রসংগঠন 'পূর্ব পাকিস্তান ছাত্র ইউনিয়ন'-এর সঙ্গে নিবিড়ভাবে যুক্ত হন। মেধা, সাংগঠনিক কৌশল এবং মার্জিত আচরণের কারণে অতি দ্রুত তিনি সহপাঠীদের মন জয় করেন এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহ্যবাহী সলিমুল্লাহ মুসলিম (এসএম) হল শাখার সাধারণ সম্পাদক নির্বাচিত হন।

 

পরবর্তীতে ১৯৬৯ সালের ঐতিহাসিক গণঅভ্যুত্থানের অগ্নিঝরা দিনগুলোতে তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্র ইউনিয়ন শাখার সভাপতির মতো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ ও ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব সাহসিকতার সাথে পালন করেন। রাজপথের মিছিলে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে ছাত্রাবস্থাতেই তাকে পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠীর রোষানলে পড়ে কারাবরণ করতে হয়েছিল। জীবনের প্রথম এই কারাবাস ও নিপীড়নই মূলত তাকে ভবিষ্যতের কণ্টকাকীর্ণ রাজনীতির জন্য এক দৃঢ়চেতা লড়াকু ব্যক্তিত্বে রূপান্তর করে।

 

ক্লাসরুমের শিক্ষকতা থেকে সিভিল সার্ভিস: আলো ছড়ানোর দিনগুলো

১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে বিজয়ের পর সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে তরুণ মির্জা ফখরুলের সামনে খুলে গিয়েছিল সম্ভাবনার একাধিক দুয়ার। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে সম্মান ও স্নাতকোত্তর ডিগ্রি শেষ করে তিনি বাংলাদেশ সিভিল সার্ভিসের (বিসিএস) শিক্ষা ক্যাডারে প্রথম শ্রেণির গেজেটেড কর্মকর্তা হিসেবে যোগদান করেন। ১৯৭২ সালে তিনি দেশের অন্যতম সেরা বিদ্যাপীঠ ঢাকা কলেজে অর্থনীতি বিভাগের প্রভাষক হিসেবে পেশাগত জীবন শুরু করেন।

 

একজন শিক্ষক হিসেবে তিনি শিক্ষার্থীদের কাছে ছিলেন অত্যন্ত স্নেহশীল, প্রজ্ঞাবান ও আদর্শ চরিত্র। ক্লাসরুমে অর্থনীতির জটিল তত্ত্বগুলোকে সহজ ভাষায় উপস্থাপন করার অসাধারণ পারদর্শিতা তাকে দ্রুতই শিক্ষার্থী ও সহকর্মীদের মাঝে জনপ্রিয় করে তোলে। পরবর্তীতে তিনি দেশের বিভিন্ন সরকারি কলেজে দীর্ঘ সময় সফলতার সঙ্গে শিক্ষাদান করেন। শিক্ষকতার পাশাপাশি তার প্রশাসনিক প্রজ্ঞা, রাষ্ট্রীয় পলিসি বোঝার ক্ষমতা এবং নীতিনির্ধারণী দূরদর্শিতা বহুগুণে বৃদ্ধি পায়।

 

রাজকীয় চাকরির মোহ ত্যাগ ও অনিশ্চিত রাজনীতির সোনালী ভোরে পদার্পণ

অত্যন্ত নিরাপদ, সম্মানজনক এবং নিশ্চিত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের এক বিসিএস ক্যাডারের সরকারি চাকরি যখন তার সামনে উন্মুক্ত ছিল, তখন আশির দশকের শেষভাগে দেশের এক চরম রাজনৈতিক ক্রান্তিলগ্নে তিনি নেন এক যুগান্তকারী সিদ্ধান্ত। এরশাদবিরোধী স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন তখন তুঙ্গে। দেশের এই চরম সংকটময় মুহূর্তে কেবল একটি নির্দিষ্ট ক্লাসরুম বা টেবিল-চেয়ারের মধ্যে নিজেকে বন্দি রাখতে তার সচেতন বিবেক সাড়া দেয়নি। ১৯৮৮ সালে তিনি সরকারি চাকরির সমস্ত মায়াজাল ও মোহ ত্যাগ করে আনুষ্ঠানিকভাবে বিসিএস থেকে ইস্তফা দেন এবং যোগ দেন সক্রিয় রাজনীতিতে।

 

রাজনীতির মূলধারায় প্রবেশ করেই তিনি শুরুতেই কোনো বড় পদের লোভ করেননি। তিনি ফিরে যান নিজের শেকড় ঠাকুরগাঁওয়ে। ১৯৮৮ সালে অনুষ্ঠিত স্থানীয় সরকার নির্বাচনে তিনি বিপুল জনসমর্থন নিয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভার চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। একজন প্রাক্তন শিক্ষক ও ভদ্রলোক হিসেবে তার এই জয়ে ঠাকুরগাঁওয়ের তৃণমূল মানুষের সঙ্গে তাঁর আত্মিক বন্ধন তৈরি হয়। পৌর চেয়ারম্যান হিসেবে তিনি এলাকার রাস্তাঘাট, পয়ঃনিষ্কাশন এবং সাধারণ মানুষের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করতে রাতদিন পরিশ্রম করেন, যা তাঁকে স্থানীয়ভাবে একজন বিশ্বস্ত জননেতা হিসেবে প্রতিষ্ঠা করে।

 

জাতীয় দল বিএনপির পতাকাতলে ও কৃষক দলের দূরদর্শী নেতৃত্ব

পৌরসভার সফল মেয়াদ শেষে ১৯৯২ সালে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর আনুষ্ঠানিকভাবে বীর উত্তম শহীদ রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমানের আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে বাংলাদেশ জাতীয়তাবাদী দলে (বিএনপি) যোগ দেন। তার মতো একজন শিক্ষাবিদ, প্রশাসনিক অভিজ্ঞতাসম্পন্ন এবং পরিচ্ছন্ন ভাবমূর্তির নেতাকে পেয়ে বিএনপি তাদের সাংগঠনিক কাঠামোকে নতুন রূপ দেওয়ার সুযোগ পায়। অতি দ্রুতই তিনি ঠাকুরগাঁও জেলা বিএনপির সভাপতি নির্বাচিত হন এবং তৃণমূল পর্যায় থেকে দলকে সুসংগঠিত করার কাজে হাত দেন।

 

পরবর্তীতে কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব তাঁর মেধা ও সাংগঠনিক সক্ষমতা বিচার করে তাকে বিএনপির অন্যতম মূল অঙ্গসংগঠন 'জাতীয়তাবাদী কৃষক দল'-এর কেন্দ্রীয় সাধারণ সম্পাদকের গুরুদায়িত্ব অর্পণ করে। বাংলাদেশের কৃষিপ্রধান দেশের অর্থনীতি এবং কৃষকদের অধিকার রক্ষায় তিনি দেশজুড়ে বিস্তৃত আন্দোলন গড়ে তোলেন। দেশের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে ছুটে গিয়ে কৃষকদের সংগঠিত করা এবং তাদের ন্যায্য দাবির সপক্ষে জাতীয় পর্যায়ে আওয়াজ তোলার মাধ্যমে তিনি জাতীয় রাজনীতির একজন গুরুত্বপূর্ণ নীতিনির্ধারক হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেন।

 

সংসদ সদস্য, মন্ত্রিত্ব এবং জাতীয় রাজনীতিতে সাফল্যের শীর্ষারোহণ

২০০১ সালের অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচন ছিল মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের রাজনৈতিক জীবনের অন্যতম বড় টার্নিং পয়েন্ট। ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে বিপুল ভোটের ব্যবধানে বিজয়ী হয়ে তিনি প্রথমবার জাতীয় সংসদের সদস্য হিসেবে শপথ নেন। তার এই সংসদীয় সফলতা কেবল ঠাকুরগাঁওয়েই সীমাবদ্ধ ছিল না, বরং জাতীয় রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দুতে তার অবস্থানকে শক্ত করে তোলে।

 

সংসদ সদস্য নির্বাচিত হওয়ার পর তত্কালীন বিএনপি সরকারে তাকে 'কৃষি প্রতিমন্ত্রী' হিসেবে দায়িত্ব দেওয়া হয়। নিজের মূল বিষয় অর্থনীতি এবং কৃষক দলের দীর্ঘ কাজের অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগিয়ে তিনি দেশের কৃষি খাতে অভূতপূর্ব সংস্কার আনেন। পরবর্তীতে তাঁকে 'বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটন মন্ত্রণালয়'-এর প্রতিমন্ত্রীর দায়িত্বও দেওয়া হয়। প্রতিটি দপ্তরে দায়িত্ব পালনের সময় তার সততা, স্বচ্ছতা এবং প্রশাসনিক দক্ষতা সর্বমহলে প্রশংসিত হয়। তাঁর বিরুদ্ধে কোনো ধরনের দুর্নীতির দাগ কাটতে পারেনি রাজনৈতিক প্রতিপক্ষও।

 



সম্পর্কিত খবর