সিলেটি মা। সুনাম ছড়িয়ে আছে দেশে বিদেশে। সন্তানকে যোগ্য নাগরিক হিসেবে গড়ে তুলতে সিলেটি মায়ের জুরি নেই। নিজের সুখ বিসর্জন দিয়ে আগলে রাখেন। বয়সের শেষ প্রান্তে এসেও সন্তানের খোঁজ খবর নিয়ে ব্যস্ত থাকেন। গভীর রাত পর্যন্ত প্রার্থনায় থাকেন সন্তানের মঙ্গল কামনায়।
সিলেট নগরীর দরগাহ মহল্লার মুফতি বাড়ির মা মিনা চৌধুরী। বয়স ৮৪ অতিক্রম করেছে। বাড়ির শেষ সদস্য বাড়ি না ফেরা পর্যন্ত তিনি অপেক্ষায় থাকেন। সবাই বাড়ি ফেরার পর চিন্তামুক্ত হন তিনি। মুফতি বাড়ির মুফতি এএম জালাল উদ্দিনের সহধর্মিণী মিনা চৌধুরী। ৯ সন্তানের জননী। এই ৯ সন্তান হলেন মুফতি শামসুন নাহার, মুফতি মঈন উদ্দিন, মুফতি মসি উদ্দিন, মুফতি রায়হান উদ্দিন, মুফতি নেহাল উদ্দিন, মুফতি কমর উদ্দিন কামু, মুফতি নাইমুন নাহার ও মুফতি বদরুন নাহার। সবাই স্বস্ব অবস্থানে প্রতিষ্ঠিত।
মমতাময়ী মা সম্পর্কে অনেক তথ্য জানিয়েছেন সুযোগ্য সন্তান মুফতি কমর উদ্দিন কামু। মায়ের কাছে তারা সকল ভাই বোন এখনো শিশু। শিশু বেলায় মা যেমনটি আচরণ করতেন, এখনও সেই আচরণ করেন। মনে করেন আমরা সবাই শিশু। শিশুবেলায় যে ধরণের শাসন করেছেন, সেই একই ধরণের শাসন আজো করে থাকেন। ধমক দেন। এর বেশি কিছু নয়। শিশু বেলায়ও ওই একই শাসন ছিল। ধমক। কোনোদিন শরীরে আঘাত করেননি।
মমতাময়ী মায়ের সংসার সামাল দেয়া সম্পর্কে বলতে গিয়ে মুফতি কমর উদ্দিন কামু বলেন, বুঝ হওয়ার পর থেকে দেখেছেন মায়ের সংসার নৈপূণ্যতা। ভোর রাতে মসজিদের মুয়াজ্জিনের আজান শুনে মায়ের ঘুম ভাঙ্গে। আজো অব্যাহত আছে ওই অবস্থা। ঘুম থেকে উঠেই ইবাদত বন্দিগিতে সময় দেন। সকালের নাস্তা তৈরি শেষে আমাদের সকল ভাই বোনকে ডেকে উঠাতেন। নাস্তা শেষে সবাইকে আরবি পড়ার টেবিলে পাঠাতেন মা। আরবি পড়া শেষে স্কুলে যাওয়ার প্রস্তুতি। মা সকলের ঘরে হেটে হেটে তদারকি করতেন। কেউ কিছু হারিয়ে ফেললে খুঁজে দিতেন মা। এক এক করে সবাইকে স্কুলের উদ্দেশ্যে পাঠাতেন প্রিয় মা।
মুফতি কামু জানান, স্কুল ছুটির পর সকলের বাড়িতে ফেরার পালা। বাড়িতে ফিরে দেখতেন মা দাঁড়িয়ে আছেন প্রধান ফটকে। একে একে সবাই বাড়ি ফেরতেন। মা বাড়ির প্রধান ফটকে দাঁড়িয়ে সবাইকে রিসিভ করতেন। সবাই ফেরার পর মা ফিরতেন ঘরে। হাত মুখ ধোয়ার পর সকলের ডাক পড়তো খাবারের টেবিলে। খাবার শেষে সবাইকে নিজ নিজ ঘরে পাঠিয়ে দিতেন মা। যারা ছোট ছিলেন, তাদের চোখের উপরে বালিশ রেখে ঘুম পাড়াতেন। ঘুম থেকে উঠতেই সন্ধ্যা হয়ে যেতো। এ নিয়ে মায়ের সাথে কত যে অভিমান। কারণ মাকে শর্ত দিয়ে ঘুমাতাম। সন্ধ্যার আগে উঠে খেলায় যাওয়ার। কিন্তু খেলায় যাওয়া হয়নি, সময় শেষ হয়ে যাওয়ায়। মান অভিমানের মধ্য দিয়ে সান্ধ্যকালীন নাস্তার টেবিলে ডাক পড়ত। এর পরপরই মা সকলকে আরবি পড়ার টেবিলে নিয়ে বসতেন। সবাইকে তিনি নিজে আরবি শিক্ষা দিতেন। এর পরপরই গৃহশিক্ষক এসে হাজির হতেন। রাত প্রায় ৯ টা পর্যন্ত গৃহশিক্ষকের কাছে শিক্ষা গ্রহণ করতে হতো। এর পর আবার খাবার টেবিলে ডাক। রাতের খাবার শেষে নিজ নিজ শয়ন কক্ষে। বয়সে যারা বড় ছিলেন, তাঁরা রাত ১১ টার মধ্যে নিজ নিজ ঘরে যেতেন। কিন্তু তারপরও মায়ের কাজ শেষ হয় না। তিনি গৃহপরিচারিকা সাথে নিয়ে রাত ১২ টার মধ্যে কাজ শেষ করতেন। সকলের উপর সর্বশেষ নজরদারি শেষে ঘুমাতে যেতেন তিনি। ফজর নামাজ আজান পড়তেই আবার দিনের শুরু হতো মায়ের। আজো ওই অবস্থা রয়েছে।
মুফতি কামু জানান, সকালের নাস্তা, দুপুরের খাবার, রাতের খাবার সবই নিজ হাতে করতেন মা। সহযোগিতা থাকতেন গৃহপরিচারিকা। বাড়ির কোথায় কি হচ্ছে, তা মায়ের চোখকে ফাকি দেয়া কোনোভাবেই সম্ভব নয়। বাড়ির ভেতরে অনেক জায়গা খালি রয়েছে। ওই জায়গায় নিজ হাতে মৌসমি শাক সবজি চাষ করতেন মা। বাড়িতে প্রচুর সুপারি গাছ ছিল। এসব গাছ থেকে সময়মত সুপারি পাড়াতেন মা। বড় বড় সুপারি বাছাই করে আলাদা করতেন। ওইসব সুপারি দিয়ে চারা করতেন। বাকি সুপারি প্রক্রিয়াজাত করে বস্তায় ভরে তুলে রাখতেন।
মুফতি কামু জানান, অভাব ছিল না। তারপরও সঞ্চয়ের অভ্যাস ছিল মায়ের। মায়ের সঞ্চয়ের একটি দিক তুলে ধরে মুফতি কামু বলেন, রান্নার আগে মা চাউলের ডেগ থেকে এক মুঠো চাল তুলে একটি পাত্রে রাখতেন। ওই পাত্রটি রাখা ছিলো শুধুমাত্র মুঠির চাউল রাখার জন্যে। প্রতিদিনই তিনি মুঠির চাউল রাখতেন ওই পাত্রে। মায়ের ওই সঞ্চয় প্রক্রিয়া আজো ভুলার নয় বলে জানালেন মুফতি কামু।
মুফতি কামু জানান, নিত্যদিন মায়ের সংসার সামাল দেয়ার পাশপাশি আত্মীয়স্বজনের খবর রাখতেন। প্রতিদিনই আত্মীয়স্বজন যাতায়াত করেন। তাদের যাবতীয় খোঁজ খবর রাখেন। এছাড়া আশপাশের বাড়ির আত্মীয়স্বজনের বাড়িতে নিয়মিত যাতায়াত করেন পালা করে। মোট কথা আত্মীয়তার বন্ধনকে সব সময় সুদৃঢ় করে রাখেন মমতাময়ী মা। মুফতি কামু বলেন ‘ছোট বেলায় দেখেছি, সন্ধ্যায় বাংলা পড়তে বসার পর মা পাশের বাড়িতে ফুফুর বাড়িতে যেতেন। এটা ছিল নিত্যদিনের ঘটনা।’
মুফতি কামু জানান, ‘শৈশবে দেখেছি কাজের ফাকে মা পুরো বাড়ি ঘুরে বেড়াতেন। মৌসমি শাকসবজির পাশপাশি বাড়িতে নানান ধরণের ফলের গাছ রয়েছে। যার প্রতি তীক্ষè নজর রাখতেন তিনি। গৃহপরিচারিকা সাথে নিয়ে ওইসব গাছের পরিচর্চা করতেন। এখনো করেন। বিশেষ করে রান্নার সময় মা প্রবেশ করেন রান্না ঘরে। রান্নায় দিকনির্দেশনা দেন। মায়ের কাছ থেকে ওই শিক্ষা আমরা ভাই বোনেরা পেয়েছি। যা এখন সবাই কাজে লাগাচ্ছেন।’
৫২ বছর বয়সেও মায়ের ধমক শুনতে হয় বলে জানালেন মুফতি কামু। সকালে ঘর থেকে বের হওয়ার সময় মমতাময়ী মায়ের কাছে বলে যেতে হয় কোথায় যাচ্ছি। রাত যত গভীর হোক না কেন, মা অপেক্ষা করেন। গভীর রাতেও বাড়ি ফিরে দেখি মা অপেক্ষা করছেন। বেশি রাত হয়েছে কেন, তার জন্যে জবাবদীহি করতে হয় মায়ের কাছে। দূরে বা দেশের বাইরে গেলে চিন্তার মাঝে রেখে যেতে হয় মা-কে। যেখানেই থাকি প্রতিদিন মায়ের সাথে কথা বলতে হয়। জানাতে হয় শরীরের অবস্থা।’