খবর প্রতিদিন

৭১‘র স্মৃতিচারণে আসাদ উদ্দিন



১৯৭১ সাল। আসাদ উদ্দিন আহমদ সপ্তম শ্রেণির ছাত্র। এখন তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সহসভাপতি। এর আগে তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন। ২৬ মার্চ প্রতিদিনের ন্যায় ঘুম থেকে উঠেছেন। ওইসময় তাঁরা বসবাস করতেন সিলেট নগরীর মিরবক্সটুলায়। এখনো আছেন ওই বাসায়। ঘুম থেকে উঠে দেখতে পেলেন বড় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ বাসায় এসে সবাইকে বলছেন, কেউ যেন বাসার বাইরে না যান। কারণ কার্ফ্যউি জারি করেছে পাকিস্তানি জান্তারা। গুলি করে মানুষ হত্যা করছে। পুরো বাড়ি থমকে যায়। থেমে থেমে গুলির শব্দ কানে ভেসে আসছিল। যা আতঙ্ককে আরো বাড়িয়ে দেয়।

আসাদ উদ্দিন আহমদ ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি চারণ করছিলেন দৈনিক বায়ান্নের কাছে।

আসাদ উদ্দিন জানাচ্ছিলেন, স্পষ্ট মনে আছে। বড় ভাই মাসুক উদ্দিন আহমদ প্রতিদিন প্রাত:ভ্রমণে বের হতেন। ২৬ মার্চ সকালেও তিনি প্রাত:ভ্রমণে গিয়েছিলেন। কিন্তু বাসা থেকে বের হয়েই তিনি বুঝতে পেরেছিলেন কার্ফ্যউি জারি করা হয়েছে। কয়েক মূহূর্তের মধ্যে দেখতে পেলেন নয়াসড়ক মোড়ে এডভোকেট হাফিজ সাহেবকে গুলি করে হত্যা করা হয়েছে। ওই দৃশ্য দেখে মাসুক ভাই বাসায় ফিরে আসেন। বাসায় ফিরেই সকর্ততা জারি করেন।
আসাদ উদ্দিন জানান, আতঙ্কের মধ্যে বাসার সবাই সময় কাটাচ্ছিলেন। আমার (আসাদ) সমবয়সী কয়েকজন উকিঁঝুকি দিয়ে বাইরের দৃশ্য দেখার চেষ্টা করছিলাম। এতে বিপদের সম্মুখিন হতে হয়। পাকিস্তানি হায়েনাদের গাড়ি থেকে আমাদের দিকে অস্ত্র তাক করা হয়। অস্ত্র তাক করতেই আমরা মাথা নীচু করে ফেলি। কিন্তু পাকিস্তানি হায়েনাদের অস্ত্রের গুলি বন্ধ হয়নি। তারা গুলি চালায় আমাদের টার্গেট করে। গুলি চলে যায় মাথার উপর দিয়ে। ওই সময় পাশের বাসার ব্যাংকার মান্নান সাহেব ঠিক আমাদের পেছন বরাবর দাঁড়িয়েছিলেন। গুলি লাগে ব্যাংকার মান্নানের বুকে। মাটিতে লুটিয়ে পড়েন তিনি। হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। সেখানেই মৃত্যু ঘটে ব্যাংকার মান্নানের। এর পর থেকে ওই বাড়িতে আতঙ্ক জাঁকিয়ে বসে। বাড়ির সবাই বাড়ির ভেতরেই অনেকটা আত্মগোপন অবস্থায় দিন কাটাতে থাকেন।

তিনি জানান, দিনদিন পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করছিল। ওই অবস্থায় মিরবক্সটুলার বাসাটি নিরাপদ মনে হচ্ছিল না। বাসা পরিবর্তন করে মিরাবাজারের আত্মীয়র বাসায় গিয়ে উঠেন এপ্রিল মাসে। কিন্তু পরিস্থিতি আরো খারাপ আকার ধারণ করে। ওই অবস্থায় মে মাসে গ্রামের বাড়ি জকিগঞ্জ উপজেলার বীরশ্রী ইউনিয়নের পিয়াইপুর গ্রামে চলে যান আসাদ উদ্দিনের পুরো পরিবার। শহরে থেকে যান বড় তিন ভাই। এই তিন ভাই শহরে অবস্থানের সময় অনেকটা আত্মগোপনে ছিলেন। পরে বড় তিন ভাই মুক্তিযুদ্ধে অংশ গ্রহণ করেন। এই তিন ভাই হলেন বীর মুক্তিযোদ্ধা আতাউর রহমান আতা। তিনি বর্তমানে আমেরিকায় বসবাস করছেন। মেজ ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ। তিনি সিলেট মহানগর আওয়ামী লীগের সভাপতি। তৃতীয় ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা বদর উদ্দিন আহমদ। তিনি যুক্তরাজ্যে বসবাস করেন।
আসাদ উদ্দিন জানান, পরিস্কার মনে আছে ২৮ অথবা ২৯ মার্চ দুপুরে চৌহাট্টার বর্তমান আরএন টাওয়ারের সামনে নেপালি এক দুধওয়ালাকে গুলি করে পাকিস্তানি হায়েনারা। ওই নেপালি চৌহাট্টার গীরি ভবনের পেছনে একটি ম্যাসে বসবাস করতেন। দুধ বিক্রি করে জীবীকা নির্বাহ করতেন। ওই নেপালিকে পরবর্তীতে করিমগঞ্জের একটি হাসপাতালে ভর্তি অবস্থায় দেখেছেন।
আসাদ উদ্দিন আহমদ জানান, গ্রামের বাড়িতে যাওয়ার পর মাঝে মধ্যে ভারতে করিমগঞ্জে যেতেন। করিমগঞ্জ শহরে তাঁর মায়ের এক খালা বসবাস করতেন। নৌকায় করে কুশিয়ারা নদী পাড়ি দিলেই করিমগঞ্জ। সেসময় ভারতের সীমান্তও খোলা ছিল। এজন্যে সহজেই আমরা যাতায়াত করতে পারতাম।

তিনি জানান, সারোপার এলাকায় প্রতিদিন প্রচন্ড গোলাগুলি হতো। ওই শব্দ ভেসে আসতো আমাদের কানে। একদিন ওই গোলাগুলির শব্দ আর শুনতে পেলাম না। বুঝতে পারলাম কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে। ২১ নভেম্বর জকিগঞ্জ হানাদার মুক্ত হয়। বাংলাদেশের পতাকা উড়িয়ে দেয়া হয় জকিগঞ্জ সদরে। ওই পতাকা দেখতে জকিগঞ্জ সদরে ছুটে গিয়েছিলেন আসাদ উদ্দিন। প্রাণভরে দেখেছিলেন পতাকা। তিনি জানান, ওইসময় তার মেজো ভাই বীর মুক্তিযোদ্ধা মাসুক উদ্দিন আহমদ মুক্তিযুদ্ধে জকিগঞ্জের বেসামরিক উপ প্রশাসক ছিলেন।       

 
 


সম্পর্কিত খবর