ভারতের প্রধান নির্বাচন কমিশনার (সিইসি) জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবিতে টানা তৃতীয় দিনের মতো দিল্লিতে রাজপথে নেমেছে বিরোধী জোট। ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ (এসআইআর) নিয়ে আপত্তি এবং নির্বাচন কমিশনের নিরপেক্ষতা নিয়ে প্রশ্ন তুলে বৃহস্পতিবার রাজঘাটে অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ বিরোধী জোটের সংসদ সদস্যরা।
বৃহস্পতিবার (৮ অক্টোবর) কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের মধ্যাহ্নভোজের পর বাসে করে রাজঘাটের দিকে রওনা হন বিরোধী নেতারা। সেখানে পৌঁছে তারা মহাত্মা গান্ধীর সমাধিস্থলের সামনে নীরব অবস্থান কর্মসূচি পালন করেন।
পরে কয়েক ঘণ্টা পর তারা সেখান থেকে চলে যান।
এর আগে মঙ্গলবার সংসদ ভবন থেকে নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের দিকে মিছিলের চেষ্টা করেন বিরোধী নেতারা।
পুলিশ তাদের আটকে দিলে আকশবাণী ভবনের কাছে অবস্থান নেন তারা। বুধবার যন্তর মন্তরের দিকে যাওয়ার চেষ্টার সময়ও পুলিশ ব্যারিকেড দিয়ে তাদের পথ আটকে দেয়।
ওই দিন রাহুল গান্ধী ও প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ একাধিক বিরোধী সাংসদকে আটক করা হয়।
বুধবারের বিক্ষোভে প্রিয়াঙ্কা গান্ধীসহ কয়েকজন নারী সাংসদ রাস্তায় বসে অবস্থান নেন। পুলিশ তাদের সরিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করলে পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ওঠে। বিরোধীদের অভিযোগ, শান্তিপূর্ণ গণতান্ত্রিক আন্দোলনের অধিকারও খর্ব করা হচ্ছে। অন্যদিকে দিল্লি পুলিশ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি এবং নির্ধারিত বিধিনিষেধের কথা তুলে ধরে নিজেদের অবস্থানকে যৌক্তিক বলে দাবি করেছে।
বিরোধীদের এবারের আন্দোলনের মূল দাবি দুটি—ভোটার তালিকার বিশেষ নিবিড় পুনর্নিরীক্ষণ কার্যক্রম বন্ধ করা এবং সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ বা অপসারণ। বিরোধীদের অভিযোগ, এসআইআরের নামে বিপুলসংখ্যক ভোটারের নাম তালিকা থেকে বাদ পড়ার ঝুঁকি তৈরি হয়েছে। তবে নির্বাচন কমিশন এসব অভিযোগ অস্বীকার করে বলেছে, ভোটার তালিকা হালনাগাদের মাধ্যমে মৃত, স্থানান্তরিত, দ্বৈত ও অযোগ্য ভোটারদের নাম বাদ দেওয়া হচ্ছে।
দিল্লির পাশাপাশি আন্দোলনের প্রভাবও ছড়িয়ে পড়ছে দেশের অন্য শহরে। মুম্বাইয়ের পর বেঙ্গালুরুর ফ্রিডম পার্কেও বিক্ষোভ হয়েছে। সেখানে অভিনেতা প্রকাশ রাজ ও ভিডিও নির্মাতা ধ্রুব রাঠীসহ বিভিন্ন অঙ্গনের ব্যক্তিরা অংশ নেন বলে ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে।
এদিকে ‘ককরোচ জনতা পার্টি’ আগামী ১০ অক্টোবর দিল্লির যন্তর মন্তরে বড় সমাবেশের ডাক দিয়েছে। সিইসি জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ এবং এসআইআর নিয়ে আপত্তিই হবে ওই কর্মসূচির অন্যতম প্রধান বিষয়। কর্মসূচিকে ঘিরে দিল্লিতে নিরাপত্তা আরও জোরদার করা হয়েছে।
জ্ঞানেশ কুমারের নিরাপত্তাও বাড়ানো হয়েছে। তিনি আগে থেকেই জেড-প্লাস নিরাপত্তা পেতেন। চলমান বিক্ষোভের মধ্যে তার বাসভবন ও নির্বাচন কমিশনের কার্যালয়ের আশপাশে অতিরিক্ত নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন করা হয়েছে।
৮ থেকে ১২ অক্টোবর পর্যন্ত দিল্লির আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে ২২১ কোম্পানি কেন্দ্রীয় সশস্ত্র পুলিশ বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। এতে প্রায় ২৩ হাজার সদস্য দায়িত্ব পালন করবেন।
অন্যদিকে রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর সঙ্গে সাক্ষাতের সময় চেয়েছিল বিরোধী জোট। রাষ্ট্রপতি ভবন শুক্রবার (৯ অক্টোবর) বিরোধী জোটের একটি প্রতিনিধি দলের সঙ্গে সাক্ষাতে সম্মতি দিয়েছে বলে সংবাদ সংস্থা ইউএনআই জানিয়েছে। এসআইআর, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রম এবং জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগের দাবি সেখানে তুলে ধরার কথা রয়েছে।
সব মিলিয়ে জ্ঞানেশ কুমারকে ঘিরে বিরোধীদের আন্দোলন এখন নির্বাচন কমিশনের বিতর্ক ছাড়িয়ে ভারতের জাতীয় রাজনীতির গুরুত্বপূর্ণ ইস্যুতে পরিণত হয়েছে। টানা তিন দিনের বিক্ষোভ, একাধিক দফায় বিরোধী নেতাদের আটক, পুলিশের সঙ্গে উত্তেজনা এবং রাজধানীতে বিপুল নিরাপত্তা মোতায়েন পরিস্থিতির গুরুত্ব আরও বাড়িয়েছে।